কেবল ঘূর্ণিঝড় এলেই উপকূলবাসীর তালাশ!

বিপন্ন উপকূলের মানুষকেবল ঘূর্ণিঝড় এলেই উপকূলের মানুষের তালাশ পড়ে! তারা কেমন আছে? কোথায় আছে? আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরেছে কীনা? শুকনো খাবার আছে কীনা? হাজার খোঁজে হাজার মানুষের ছুটাছুটি। কেন্দ্র থেকে মাঠের প্রশানিক কর্তারা ব্যস্ত। মন্ত্রণালয়ে, জেলা প্রশাসনে, উপজেলা প্রশাসনে বৈঠকের পর বৈঠক। জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যম হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কে কার আগে ছুটবে উপকূলে। তবে এটাও নির্ভর করে নিম্নচাপটা কতটা গভীরে পতিত হল, তার ওপর।

ঘূর্ণিঝড়ের মত বিপদ এলে এটাই করা উচিত। সবাই মিলে একযোগে এই বিপদ মোকাবেলায় এগিয়ে আসা উচিত। এটাই অবশ্যই স্বাগত জানাবেন সবাই। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের খবরে সবার এই ছুটাছুটির একটা সামান্যতম অংশও যদি স্বাভাবিক সময়ে থাকতো, তাহলে বোধকরি বিপদ এমনিতেই অনেকটা কমে যেত। এটা একেবারেই সত্যি কথা, প্রাকৃতিক বিপদ কোনভাবেই এড়ানো সম্ভব হয় না। তারপরও বিপদের ঝুঁকি কমিয়ে আনার উদ্যোগ কিন্তু নেওয়া যেতেই পারে।

পূর্ব উপকূলের কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে পশ্চিম উপকূলের সুন্দরবন পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার চিত্র দেখে বলা যায়, উপকূলে রয়েছে নানান সংকট। বিপন্নতার চিত্র দেখে এ প্রশ্ন করাই যায়, উপকূলকে আমরা কতটা টেকসই নিরাপত্তা দিতে পেরেছি? বহু স্থানে নেই বেড়িবাঁধ। এক একটি ঝড়ের তান্ডব বয়ে যায়, আর লন্ডভন্ড হয় বেড়িবাঁধ। কিন্তু সে বাঁধগুলো যথাযথভাবে সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয় না। আবার পর্যাপ্ত পরিমাণে বেড়িবাঁধের অভাব রয়েছে। বেড়িবাঁধের কাজে যে পরিমাণ দুর্ণীতি হয়, তা ব্যাখ্যা করে বলার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে বেড়িবাঁধের বাইরে রয়েছে বহু দ্বীপ-চর। ঘূর্ণিঝড়-জালোচ্ছ্বাসেএইসব অরক্ষিত জনপদের বিপন্নতা কয়েকগুন বেড়ে যায়। মানুষগুলো হয়ে পড়ে অসহায়।

ঘূর্ণিঝড় সিগন্যাল পড়লেই উপকূলের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষদের সরে যাওয়ার ঘোষণা আসে। প্রশ্ন হচ্ছে কোথায় সবে তারা? উপকূলে বহু এলাকা আছে, যেখানে আশ্রয় নেওয়াটাও অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। কাছাকাছি নেই সাইক্লোন শেলটার, স্কুল ভবন কিংবা ঊঁচু কোন নিরাপদ স্থান। তাহলে এরা সরে যাবে কোথায়? এই মানুষগুলো বিপদের সময় যেখানেই সরে যাক না কেন, আবার তাকে এখানেই ফিরতে হবে। বাড়িঘর, গবাদিপশু, কিংবা মাথাগোঁজার এক টুকরো ভিটের টানে এদেরকে আবার ফিরতে হবে শেকড়ের কাছে। তখন কাউকে আর ঘোষণা দিয়ে বলতে হবে না, তোমরা এখন আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়ে বাড়িতে যাও। কিংবা কেউ কখনো খোঁজ নেবে না, নিজের ভিটেয় মানুষগুলো সারাটি মৌসুম কেমন থাকে।

সারাটি মৌসুম উপকূলের মানুষ কেমন থাকেন? এটা এখন একটি বড় প্রশ্ন। যাদের কাছে এটা কোন প্রশ্ন নয়, তাদের কাছে কিছু বলার নেই। তবে যারা উপকূলের মানুষের অবস্থা জানতে চান, তাদেরকে কয়েকছত্র জানাতে চাই। আসলে উপকূলের মানুষ ভালো নেই। এখানকার সংকটের কথা বলে শেষ করা যাবে না। নাগরিক সেবার খুব সামান্যতম এদের ভাগ্যে জুটে। সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের অনেক সেবার নাম এখনও উপকূলের মানুষ জানেন না। চিকিৎসায় ডাক্তার কিংবা ওষুধ-পথ্য জোটানো খুবই কঠিন। বহু ছেলেমেয়ে স্কুলে যেতে পারে না। সামর্থ্য নেই। বাবার কাজের জায়গায় আসতে বাধ্য হয় দশ পেরুনো কিশোর সন্তান। এ এক নির্মম চিত্র।

ঘূর্ণিঝড় এলে তো আমরা মানুষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু এদেরকে স্বাভাবিক কিংবা সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমরা কতটা পালন করছি? প্রাকৃতিক বিপদ এলে যেমনটা তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, তেমনি এদেরকে স্বাভাবিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতেও নিতে হবে উদ্যোগ। প্রশাসনের বড় কর্তা কিংবা গণমাধ্যমের সুনজরে উপকূলের মানুষ এগিয়ে যেতে পারে অনেক দূর। প্রশাসন উপকূলের মানুষের সব ধরণের সংকট নিরসনে উদ্যোগ নিতে পারেন, আর গণমাধ্যম এই কাজের সহায়ক হিসাবে সমস্যাগুলো দেখিয়ে দিতে পারেন।

//সম্পাদকীয়/উপকূল বাংলাদেশ/৩০০৭২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য