বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা ১ কোটি ছেলেমেয়ে!
- ০১:৪৯
- উপকূল আজ, উপকূল সংবাদ, জাতীয়-উপকূল, বাংলাদেশ, সর্বশেষ
- ১৫৮
ঢাকা : বৃষ্টি আর ছুটিতে আজকের ছুটির দিনে দীর্ঘ সময় বিছানায় কাটিয়েছি। ফোনও দেখিনি। এখন দুইটার বেশি বাজে। কী আলাপ হতে পারে ভাবতে ভাবতে ফোন দিলাম। বিয়ে সংক্রান্ত আলাপ।ইংরেজিতে মাস্টার্স করেছে একটি কলেজ থেকে। তারপর গত তিন বছর ধরে চাকরি করছে। মাঝে নিজের আর্থিক উন্নতির জন্য আইডিবির আইটি স্কলারশিপের অধীনে একবছরের একটি কোর্স করেছে। সেই কোর্স শেষে চার হাজার টাকার একটি চাকরির অফারও পেয়েছিল। বলা হয়েছে লেগে থাকলে আর ভালো করতে পারলে বছর দুয়েকের মধ্যে বেতন বেড়ে ২০/২২ হাজার টাকা হতে পারে। তারপর আরো বেশি। লেগে থাকতে তার আপত্তি ছিল না। কিন্তু ভালো করার এই আপেক্ষিক বিষয়টা তাকে ঝুঁকি নিতে দেয়নি। তাছাড়া ঢাকায় একবছর অনেক কষ্ট করে টিকে থেকে কোর্সটা করেছিল শেষ হওয়ার পর অন্তত চলার মতো হাজার দশেক টাকা পাবে বলে। সে ভাবতেই পারেনি ১০ হাজার টাকার চাকরি ছেড়ে কোর্স করার পর তাকে চার হাজার টাকা অফার করা হবে। ফলে ফিরে গেছে পুরনো অফিসে, যেখানে ছিল কোর্সে যোগ দেওয়ার আগে।
তার আগের অফিস এবার তাকে আরেকটু বেশি দায়িত্ব দিয়ে তার বেতন নির্ধারণ করল ১৬ হাজার টাকা। সেই দিয়ে চলছে। অন্তত আগের চেয়ে ভালো। এসব গল্পই আমি জানি। কারণ তার সঙ্গে আমার টুক টাক কথা হয় মাঝে সাঝে।
আমি জানতাম তার পরিবারের দিক থেকে বিয়ের চেষ্টা চলছিল। বিয়েটা সে নিজেও করতে চায়। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না বিয়ে করার। ১৬ হাজার টাকায় মিরপুরে এক রুমের এক বাসা নিয়ে নিজে চলতে পারলেও বউ নিয়ে সংসার করতে পারবে কি না সেনিয়ে চিন্তিত। তার পরিবার অবশ্য সহজ সমাধান খুঁজে বের করেছে। শ্বশুর বাড়ি থেকে ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যবস্থা করা হবে এমন পরিবারে মেয়ে খুঁজছে তারা। পাওয়াও যাচ্ছে। কিন্তু ছেলেটি এভাবে বিয়ে করতে চায় না। সেকারণেই আজকে সে আমাকে ফোন দিয়েছে। একটা সিদ্ধান্ত নিতে চায় সে।
পাত্রী আছে দুইজন। একজনকে তার ভালো লেগেছে। পাত্রী তার বর্তমান অবস্থা মেনে নিয়েছে, তবে বলেছে তাকে দ্রুত নিজের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে। যা তার হাতে নেই। অন্যদিকে, তার পরিবার একজনকে পেয়েছে যাকে বিয়ে করলে ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করার সব ব্যবস্থা তারা নেবেন। আমি সব শুনে বললাম, তুমি তো আর হাটের গরু ছাগল নও। তোমার পরিবারকে সেটা বুঝতে হবে। তারপর খুঁটিনাটি আরো আলাপের পর তার পছন্দের পাত্রীকেই বিয়ের পরামর্শ দিলাম। তবে একথাও বললাম, অন্তত ছয়মাস সময় নাও। মেয়েটিকে আরো বোঝার চেষ্টা করো। তোমাকেও তাকে বুঝতে দাও। একজন ফেসবুক বন্ধু যাকে মাত্র কয়েক বছর ধরে চিনি সীমিত আকারে তার জন্য আমি আর কি করতে পারি!
এই ছেলেটিই একমাত্র ছেলে নয়। এমন আরো কয়েকজনকে আমি চিনি যারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না শুধুমাত্র উপযুক্ত আয়ের অভাবে। কিংবা আয়ের চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেশি হওয়ার কারণে। বিয়ে নিয়ে সমস্যায় আছে মেয়েরাও। চাকরিজীবি মেয়েরা তাও সাহস করে দু’জনের টাকায় সংসার চালাবে ভেবে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও অন্যরা পারছে না। চাকরিজীবি মেয়েদের ক্ষেত্রে আবার উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পাওয়ার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিয়ে নিয়ে সমস্যায় আছে অন্তত ১ কোটি ছেলেমেয়ে। যাদের অন্তত ৩০ লাখ শিক্ষিত ছেলেমেয়ে। যারা কিছু না কিছু আয় করলেও বিয়ে করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। এর বাইরে সরকারি হিসেবে বাংলাদেশে সাড়ে ৫ কোটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর যে প্রায় ৫৫ লাখ বেকার আছে কিংবা বিনে পয়সায় পেটে ভাতে কাজ করে তাদের কথা নাই বা বললাম।
এটা একটা বড় চক্কর। এই চক্করে পড়ে সমাজে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। সমাজে যৌন আচার আচরণে পরিবর্তন আসছে। অনেক ধরনের মনো-সামাজিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিয়ের উপযুক্ত ছেলেমেয়ে আছে এমন পরিবারগুলোতে উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠা বাড়ছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। নিজেদের অক্ষমতায় মানসিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এই ১ কোটি ছেলেমেয়ের জীবনের বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিতে না পারার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার দায়ভার রাষ্ট্র যারা চালায় তারা অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হলো আমাদের রাষ্ট্র এখন এমন একদল মন্ত্রী এমপি চালাচ্ছে যাদের কাছে উন্নয়ন মানে রাস্তাঘাট আর ব্রিজ কালভার্ট বানানো। বিবাহযোগ্য ছেলেমেয়েদের এবং তাদের পরিবারের জীবনে স্বস্তি এনে দেওয়াটা তাদের উন্নয়ন তালিকায় নেই। তাদের উন্নয়ন টানেলে আছে উদরপূর্তির প্রকল্প, যেখানে মানুষের জীবনের গল্প অনুপস্থিত।
আমাদের আরো দুর্ভাগ্য হলো এদেশের সরকার বিরোধী রাজনীতিকরাও উন্নয়ন বুঝতে সরকারে যারা থাকেন তাদের মতোই বোঝেন। জীবনের গল্প বুঝবেন এমন রাজনীতিক ছাড়া এই দেশের সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে না। যারা জীবনের গল্প বোঝেন তাদেরকে রাজনীতিতে যেতে হবে। মন্ত্রী, এমপি হতে হবে। যারা জীবনের গল্প বোঝেন তারাই কেবল আইনের শাসন আনতে পারবেন।
২৪ জুলাই ২০১৫, শুক্রবার।। পল্লবী।। ঢাকা।।
মোহাম্মদ গোলাম নবী ব্লগ থেকে সংগৃহিত
