বুনো শাক কুড়িয়ে যাঁর জীবিকা

আবদুল কাদের ঘরামীকুয়াকাটা (পটুয়াখালী) : ফজরের নামাজ পড়ে হালকা কিছু খাবার খেয়ে কুড়েঁর ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়েন। এক হাতে বৃদ্ধ বয়সে চলার বাহক লাঠি অন্য হাতে একটি গামলা। এ গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের দিকে রাস্তার দু’পাশে দৃষ্টি রেখে হাঁটতে থাকেন।  বুনো শাক দেখলেই বসে পড়েন। শাক কুড়িয়ে গামলা ভর্তি করে বাড়ি ফেরেন। ফিরতি পথে আসার সময় কলাগাছের দিকে দৃষ্টি রেখে পথ চলেন। মোচরা দেখলেই কেটে নিয়ে আসেন। সারা দিন গ্রামে গ্রামে বুনো শাক তুলেন বাড়ি আসেন। রাতে স্ত্রী রহিমা বেগম ভাল করে বেছে আটি বেঁধে গুছিয়ে রাখেন। পরের দিন সকালে মৎস্য বন্দর আলীপুর বাজারে বিক্রি করেন। বিক্রি করে যে টাকা আসে তা দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটে।

কারো বাড়ির পুকুর পাড়ে, বাড়ির আঙ্গিনায়, ব্যারের মধ্যে, ডোবায়, বিলের খালে, খোলা ভিটায় শাক তোলেন। কোন কোন বাড়িতে বা কারো কারো জমিতে শাক তুলতে নিষেধ আছে। মাঝে মধ্যে কারো কারো অকথ্য কথা শুনতে হয়। তারপরেও শাক তুলতে হচ্ছে। তা না হলে সংসার চলে না। এভাবেই বুনো শাক তোলার বর্ননা দিলেন কুয়াকাটা ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের পিছনে তুলাতলী গ্রামের কাদের ঘরামী (১০৫)।

গত ১৪ বছর যাবৎ বুনো শাক কুড়িয়ে সংসার চলছে কাদের ঘরামীর। যখন যে শাকের মৌসুম থাকে তখন সে শাক তুলে বিক্রি করেন। এসব শাকের মধ্যে কলমি শাক, হেলেঞ্চা শাক, গোল হেলেঞ্চা শাক, চটা শাক, আগ্রা শাক, কচু শাক, গ্রিমা শাক, কচুর লতি, থানকুনি পাতা, মোচরা ইত্যাদি বিক্রি করে সংসার চলছে তার। কিন্তু দিন দিন বনাঞ্চল কমে যাচ্ছে, ভরাট হয়ে যাচ্ছে পুকুর ডোবা নালা, দিন দিন বাড়ছে বসতি, উজার হচ্ছে বনাঞ্চল। এখন আর আগের মতো বুনো শাক পাওয়া যায় না। তারপরেও যে সমস্ত জমিতে শাক পাওয়া যায় তা ছাগল, ভেড়া, গরু মহিষে খেয়ে ফেলে। তবুও এ পেশা ছাড়তে পারছেন না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ পেশায় টিকে থাকা ছাড়া উপায় নেই। কারণ ১০৫ বছরের বৃদ্ধ কাদের ঘরামী অন্য কি কাজ করবেন?

বর্তমানে শাক কুড়িয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাদের ঘরামী অবসর সময় পেলে বাড়িতে ঝাঁকি জাল বুনেন। স্ত্রী রহিমা বেগম কেওয়াপাতার ওগলা বুনেন। কাদের ঘরামী মাসে ৪০০ টাকা বয়স্ক ভাতা পান। আর কেউ যদি দয়া করে এক’শ দুই’শ টাকা দেয়। এভাবেই চলছে তার সংসার জীবনের সংগ্রাম।

কাদের ঘরামীর চারটি মেয়ে ও একটি ছেলে। মেয়ে সালেহা, আলেয়া, শারমিন, মাজেদা এদের বিবাহ দিয়েছেন অনেক পূর্বে। কিন্তু গত সাত বছর যাবৎ বৃদ্ধ বাবার ঘাঁড়ে চেপে বসেছেন তার মেজো কন্যা আলেয়া বেগম। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় আলেয়া বেগমকে ফেলে নিরুদ্দেশ্যে চলে গেছে স্বামী। আর একমাত্র পুত্র শাহ আলম বিয়ে করে ইউনিয়নের লক্ষ্মীপাড়া গ্রামে শ্বশুড় বাড়িতে থাকে। অপরের মটরসাইকেল ভাড়ায় চালিয়ে চলে শাহ আলমের সংসার। নিজের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিধায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খোঁজ খবর রাখতে পারে না।

বয়সের ভারে ক্লান্ত কাদের ঘরামী’র জানান, তার পূর্বের বসবাস পটুয়াখালীর সদর উপজেলার আউয়ালীপুর ইউনিয়নের আউয়ালীপুর গ্রামে। ১৯৬৫ সালের শেষের দিকে কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের বর্তমান বাসস্থান তুলাতলী গ্রামে আসেন। তার বাবা নুরমোহাম্মাদ ঘরামী তিন কুড়া জমি কবলা করেন। ওই জমিটুকু চাষবাদ করতেন আর জমির মূখসার খাস জমিতে আট সদস্যের পরিবার নিয়ে সুখ শান্তিতে বসবাস করতেন। ১৯৭০ সালে প্রলয়ংকারী জলোচ্ছ্বাসে তার বাবা, মা, ভাই, বোন, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে হারিয়ে একা বেঁচে থাকেন।

পরিবারের সাতজনকে হারিয়ে বন্যা পরবর্তীতে পূর্বের ভিটায় ২য় বিবাহিত স্ত্রী রহিমা বেগমকে নিয়ে কোন মতে ছাপড়া দিয়ে থাকতেন। কিন্তু বন্যায় তার বাবার ক্রয়কৃত জমির দলিল পত্রই হারায়নি হারিয়েছে জমিটুকু। দলিল পত্র না থাকার অজুহাতে বিভিন্ন সময় নামে মাত্র টাকা দিয়ে দলিল করে নিয়েছে একটি প্রভাবশালী মহল। গত কয়েক বছর পূর্বে হারিয়েছেন বসত বাড়ির জমি। প্রভাবশালী মহলের দাবি কাদের ঘরামী তার বসত ভিটার জমিও বিক্রি করেছেন। কাদের ঘরামী জানান, তার আর্থিক সমস্যা দেখা দিলে কিছু টাকা পয়সা দিতো। কিন্তু সেই টাকায় তার বসত ভিটা যাবে বুঝলে টাকা ধরতেন না।

জীবনের পড়ন্ত বেলার বসত বাড়ি হারিয়ে একেবারে দিশেহারা তিনি। কোথায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন। মৃত্যুর পরে কোথায় হবে তার দাফন। বৃদ্ধ স্ত্রী রহিমা বেগম কোথায় থাকবেন। এমন নানা চিন্তায় অস্তির বুড়ো কাদের ঘরামী পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন গ্রামের জুলহাস হোসেন জালাল খান। তিনি দৌড়ঝাঁপ করে ষোল হাজার টাকার বিনিময়ে তিন বছর পূর্বে ১ একর জমি বন্দোবস্ত এনে দিয়েছেন। যেখানে তিনি বর্তমানে বসবাস করছেন। তারমধ্যে ৭০ শতাংশ জমির তার দখলে থাকলেও তার নিয়ে চলছে একটি মামলা। প্রতিবেশী প্রভাবশালী শামসুল হক চেয়ারম্যানের পুত্র জালাল উদ্দিন মামলা করেছে। জালাল উদ্দিন কলাপাড়া উপজেলার যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা। তাই এখানেই কাদের ঘরামী’র ভয় হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বৃদ্ধ জানিয়েছে, জালাল উদ্দিন নাকি ওই জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন দাবি করে মামলা করেছেন। তাদের প্রশ্ন পাঁচশত একর জমির মালিকরা কিভাবে সরকারী জমি বন্দোবস্ত নিয়েছেন? এদিকে মামলার নিস্পত্তি কবে হবে। রায় কি তার পক্ষে আসবে নাকি প্রভাবশালীদের পক্ষে যাবে এনিয়ে ঘরামীর চিন্তার শেষ নেই। আর বাকী ৩০ শতাংশ জমি অন্যত্র। কাগজে থাকলেও সরেজমিনে বুঝ পায়নি। মারা যাওয়ার আগে বুঝ পাবেন কিনা সন্দেহ তার।

//কাজী সাঈদ/উপকূল বাংলাদেশ/কুয়াকাটা-পটুয়াখালী/২৪০৭২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য