আগুন ওদেরকে একেবারেই নি:স্ব করে গেল
ঢাকা : কেউ পোশাক শ্রমিক, নৈশ প্রহরী, গাড়ির চালক; কেউবা শিক্ষার্থী- মধ্য বাড্ডার পুষ্কনির পাড়ে সবার স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে কয়েক ঘণ্টার আগুনে।
সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে এই অগ্নিকাণ্ডে একটি মেসবাড়ি, কয়েকটি দোকান এবং ঝিলের ওপর খুঁটি পুঁতে গড়ে তোলা শতাধিক টংঘর ভস্মীভূত হয়েছে।
পুড়ে যাওয়া মেসবাড়িতে চাচার সঙ্গে থাকতেন বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থী আলম তাজ। ঘরের অন্য সব জিনিসপত্রের সঙ্গে তার বইপত্রও পুড়ে গেছে।
গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর থেকে ২০১০ সালে ঢাকায় এসে এই মেসে ওঠেন তাজ; ভর্তি হন বাড্ডা হাই স্কুলে। তাজের চাচা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি সুপার শপ ‘স্বপ্নে’ বিক্রয়কর্মী হিসাবে খণ্ডকালীন কাজ করেন।
বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মেসের পেছনে ঝিলপাড়ের টং ঘরগুলোতে আগুন দেখে ফায়ার ব্রিগেডে খবর দিতে ছুটে যান তাজ। কিন্তু ফায়ার ব্রিগেড এসে পানি দেওয়া শুরু করতে এক ঘণ্টা লেগে যায়।
“বাসা থেকে কিছুই বের করতে পারিনি। মনে করেছিলাম, ফাঁকা রাস্তায় ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি এসে পানি দিলে নিভে যাবে। আমাদের মেস পর্যন্ত আগুন আসবে না। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।”
গ্রামে টানাটানির সংসার ছেড়ে ঢাকায় এসে এখন পুরোপুরি চাচার উপর নির্ভরশীল তাজ। তিনি বলেন, “সরকার সহায়তা না করলে আমারা অনেকেই আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।”
মধ্য বাড্ডা এলাকায় প্রগতি সরণীর সিডিসিএল সিএনজি স্টেশন থেকে আনুমানিক পঞ্চাশ গজ গলির ভেতরে ছিল ভাই ভাই বোর্ডিং হাউজ নামের একটি দোতলা টিনের ঘর।তার বাঁ দিকে একটি দোতলা মেসবাড়ি এবং ডান দিকে দোতলা ভবনের নিচতলায় ছিল কয়েকটি দোকান; উপরে বোর্ডিংয়ের বর্ধিতাংশ।
বোর্ডিংয়ের পেছনে ঝিলের ওপর খুঁটির মাচায় পাঁচটি দোতলা কাঠামোতে শতাধিক টিনের ঘরে ছিল দেড় শতাধিক পরিবারের বসবাস। দুই ঘণ্টার আগুনে সবই এখন আশ্রয়হীন।
ওই টংঘরগুলোর একটিতে স্বামী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকতেন চাঁদপুরের শাহনাজ বেগম। তার স্বামী মো. আমীন আগে এলাকায় রিকশা চালাতেন। ঢাকায় আসার পর অসুস্থতার কারণে দারোয়ানের কাজ নেন। আর শাহনাজ কাজ নেন গার্মেন্টেসে।
দুজনের রোজগারের ১৪ হাজার টাকায় চলে যাচ্ছিল শাহনাজের সংসার। এর মধ্যে বড় ছেলে শামীম (১৫) স্টিলের ফার্নিচারের দোকানে কাজও শিখতে শুরু করেছিল।
মাস দুই আগে কারখানা স্থানান্তরের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েন শাহনাজ। সংসারের প্রয়োজনে রোজার মাসে এক বাসায় বুয়ার কাজ নেন। তারপরও দুই ছেলেকে বড় করার যে স্বপ্ন নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রম তিনি চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তা পুড়িয়ে ছারখার করে দিল আগুন।
“মনে বহুত আশা আছিল, পোলায় কাম শিখব, আমি আবার চারকি পামু। আস্তে আস্তে আবার সংসার গোছামু। সব পুইড়া গেল।”
শাহনাজের বারবার মনে পড়ছে পাঁচ বছর আগে ঢাকায় আসার দিনটির কথা। সেদিন তাদের সঙ্গে হাড়ি-পাতিল আর ঘুমানোর জন্য বিছানা অন্তত ছিল।”এহনতো আমার কিছ্ছু নাই। সব পুইড়া গেছে। আমি অহন কি করুম?”
সব হারানোর কষ্টের মধ্যেও দুই ছেলের বেঁচে যাওয়ার মধ্যে স্বান্তনা খুঁজছেন এই নারী।
ছেলেদের কথা জানতে চাইলে চোখের পানি মুছে আকাশের দিকে তাকিয়ে শাহনাজ বলেন, “ওরাতো বিতরেই আছিল। আল্লায় বাঁচাইছে। বাইর হইয়া আসতে পারছে। নয়তো আমারে ওই আগুনেই ঝাঁপ দিতে হইত।”
১২ বছর আগে এই পুষ্কনির পাড়ে এসে সংসার পেতেছিলেন মাইক্রোবাস চালক গিয়াসউদ্দিন রানা। আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি বাসার কাছে ছুটে এসে দাউ দাউ করে জ্বলতে দেখেন সবকিছু।
প্রাথমিকভাবে দুই মেয়ে ও স্ত্রীর কোনো খোঁজ না পেয়ে এই প্রৌঢ়কে হাউ মাউ করে কাঁদতে দেখা যায়। স্বজনদের খোঁজ পাওয়ার পর অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি তার চিন্তায় পেয়ে বসে।
“ঋণ কইরা ফ্রিজ কিনছি। বাকিতে খাট কিনছি। এখনো টাকা দেই নাই। এহন ক্যামনে দিমু? কাইলকা বিভিন্ন জনের কাছ থেইকা পাওনা ৭০ হাজার টাকা তুইল্যা আনছিলাম। আমার খাট, ফ্রিজ, টাকা, ভাণ্ডবাডিসহ সব শ্যাষ।”
এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন- সেই প্রশ্নেরও উত্তর নেই রানার কাছে।
এ আগুনে ঘর হারিয়েছেন এক সময়ের পোশাক শ্রমিক রোজিনা বেগমও। তিন হাজার টাকা ভাড়ায় টংঘরের একটি কক্ষে স্বামীসহ থাকতেন তিনি।
“আগুনের কথা শুইনা লাফ দিয়া ঘর থিকা বাইর হইসি। কিচ্ছু আনতে পারি নাই,” বলে কাঁদতে থাকেন এই নারী।
আগুনে পোড়া ঘরের সামনে বসে কাঁদতে দেখা যায় কাঁচামাল ব্যবসায়ী আহমদ আলী সুমনকে। শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে স্ত্রী কুলসুম বেগম তার পাশে বিহ্বল দাঁড়িয়ে।কাঁদতে কাঁদতে আহমদ আলী বলেন, “ঘুম থেইকা উইঠাই শুনি আগুন লাগছে। তিন পোলারে তাড়াতাড়ি ঘুম থেইকা উঠায়া বউ নিয়া বাড়ি থিকা বাইর হইছি। ঘরে ব্যবসার টেকা পয়সা, জিনিসপত্র সব পুইড়া গেছে।”
অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এসব স্থাপনার মালিক ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ওসমান গণি ও তার পরিবারের সদস্যরা।
ওসমানের ভাতিজা মো. ফরিদ বলেন, “ভাগ্য ভালো এখন ঈদ ছুটি চলছে। তাই ভেতরে থাকা মানুষজন বের হতে পেরেছে। সবাই থাকলে বের হওয়া কঠিন ছিল।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে সংগৃহিত
//ডেস্ক উপকূল বাংলাদেশ/২১০৭২০১৫//
