ঈদ উৎসবের রঙ যেখানে ধূসর

উপকূলের বিপন্ন এই পরিবারের ঘরে ঈদের আনন্দ প্রবেশ করে নাআজ পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদের আয়োজন ঘিরে বেশ কয়েকদিন ধরেই চারিদিকে চলছিল উৎসবের আমেজ। নানান আয়োজন। শহুরে জীবন এখন বর্ণের ছোঁয়ায় বর্ণিল। সবার মাঝেই ছিল ভিন্ন এক ব্যস্ততা। সবাই আরেকটু এগিয়ে, খানিক বাড়তি আয়োজনের চেষ্টা করেছেন। অর্থের যোগান আছে। বিনিময়ে সবচেয়ে সেরাটা চাই। হাট-বাজারের অলি-গলি সরগরম হতে থাকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে না হতেই। ঈদ সামনে রেখে এইসব আয়োজনের কোন অর্থ খুঁজে পাই না। এই আনন্দ তো আমরা সকলের কাছে পৌঁছাতে পারছি না!

বড় শহরের পিচঢালা সড়কের ফুটপাতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। ভিড় ঠেলে ফুটপাতে একজন পথিকের হাঁটাটাও ছিল কষ্টের। তবুও আমার মত পথিকদের হাঁটতে হয় কিলোমিটারের পর কিলোমিটার। আমি হাঁটি রাতে, দিনে, সন্ধ্যায়, বিকেলে। দেখি আলোকসজ্জা, মানুষের ভিড়, ভিড় ঠেলে পেছনের মানুষটির সামনের আগানোর চেষ্টা। সামনে ঈদ, তাই সবাই ব্যস্ত। অফিস-আদালত, হাট-বাজার, সবখানেই সমান ব্যস্ত মানুষ। এইসব দেখি আর নিজেকেই প্রশ্ন করি, ঈদ ক’জন মানুষের জন্য? এই ঈদের অর্থ কী? ঈদ বাজারে সব মানুষের ‘প্রবেশাধিকার’ নেই। সবাই ‘সুযোগ’ পাচ্ছে না। অর্থ নেই তাই ‘প্রবেশাধিকার’ নেই। একই কারণে নেই ‘সুযোগ’।

উপকূলের হাজারো মানুষকে চিনি, যাঁদের তিনবেলা খাবার যোগাড় অনেক কষ্টের। জীবনটাকে টেনে নিচ্ছেন অনেক কষ্টে। সব সময় হাতে কাজ থাকে না। ধারদেনা করে চলতে হয়। বহু মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দাদনের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছেন। আমি হাজারো মেহনতি মানুষদের চিনি, যাঁরা কঠিন সংগ্রামে জীবনের চাকা ঘুরাচ্ছেন। সারাজীবন কাজ করেও একটাকা সঞ্চয় করতে পারেন নি। আমি অসংখ্য শিশুদের চিনি, যারা লেখাপড়ার বয়সে কাজের মিছিলে। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে শক্ত হয়ে ওঠে ওদের কোমল হাত। সবখানে শুধু ক্ষুধা নিবারণের তাগিদ, বেঁচে থাকার প্রানান্ত চেষ্টা। ঈদ কিংবা কোন পার্বনে এই মানুষেরা প্রস্তুতিহীন। সামান্য পরিমাণ সেমাই-চিনি যোগাড়ের সামর্থ্য যেখানে নেই, সেখানে ঈদের প্রস্তুতি কী করে?

ঈদের দিন কিংবা ঈদের আগের দিনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে গিয়ে আমার ঝুলিতে জমা হয় কষ্টের অভিজ্ঞতা। উপকূলের বিপন্ন দ্বীপ, জেলেগ্রাম, ভাঙণ তীরের জনপদ, বেড়িবাঁধের বসতিতে খোঁজ নিয়ে অনেক হতাশার তথ্য আসে। যে চিত্রটা মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্তের কল্পনার বাইরে। আমি উপকূলের বহু পরিবারকে জানি, যারা ঈদের একদিন আগেও সেমাই কেনার টাকা যোগাতে পারেন না। পূরণ হয়না তাঁদের ছেলেমেয়ে আর নাতি-নাতনিদের নতুন কাপড়ের বায়না। পরিবারের সদস্যদের মুখে তিনবেলা ভাত তুলে দিতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এই প্রান্তিক মানুষকে আনন্দের বার্তা দিতে পারে না ঈদ। তাইতো তাদের মাঝে থাকে না ঈদের কোন প্রস্তুতি। ঈদ মানে যেন তাদের মলিন মুখ।

কয়েকটি জেলেগ্রাম ঘুরে জানতে পারি, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে কারও মাঝেই ঈদের প্রস্তুতি তেমনটা লক্ষ্য করা যায় না। ঈদে আনন্দ-ফুর্তি করা, বন্ধুদের সঙ্গে বেড়ানোর চিন্তা কখনোই করতে পারে না প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যে কিশোরের রঙিন উৎসবে মেতে থাকার কথা, অত্যাধিক খাটুনি আর দারিদ্র্যতার নিষ্পেষণে সে কিশোর ঈদ নিয়ে তেমন কিছুই ভাবতে পারে না। আমি এমন বহু জেলেকে চিনি, যারা ঈদের সঙ্গে অন্যান্য দিনের কোন পার্থক্য খুঁজে পান না। অধিক খাটুনির বিনিময়ে কোনমতে সংসার চালানো এক দক্ষ মাঝির সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, যিনি শত চেষ্টা করেও পরিবারের সদস্যদের ঈদের বায়না মেটাতে পারেন না।

ঈদের দিন উপকূলের প্রান্তিকের বহু মানুষের বাড়িতে হাড়ির খবর নিয়ে দেখেছি, অনেকের চুলোই বন্ধ থাকে। সকালে কেউ কেউ আগেরদিন রান্না করা আলু ভাত খেয়ে এক প্রহর কাটিয়ে দেন। অনেকে আবার দিনের প্রথম প্রহরের অনেকটা পেরিয়ে গেলেও কোন খাবার পাননা। দু’চারটি ঘরে সামান্য সেমাইয়ের আয়োজন থাকে। সেজন্যে আবার দেনার দায় ওঠে মাথায়। কোন ঘরেই ঈদের বিশেষ আয়োজন চোখে পড়ে না। যোগাড় হয়না নতুন কাপড়। বহু গ্রামজুড়ে ঈদের কোন আমেজই চোখে পড়ে না।

ঈদের দিন ভোরে উপকূলের দারিদ্র্যপীড়িত গ্রাম ঘুরে আমার চোখে পড়ে সুনসান নিরবতা। দেখতে পাই অধিকাংশ ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ। দু’একটি খোলা দরজা পেলেও উকি দিয়ে কোন লোকের দেখা মেলেনা। কেউ ঘুমাচ্ছে, কেউবা কাজের সন্ধানে বাইরে বের হয়ে গেছে অনেক আগেই। কেউ আবার গিয়েছে ঈদের নামাজ পড়তে। গ্রামের দোকানদার, যিনি দৈনিক খাবারের রোজগারটা করেন দোকানে বেচাকেনা করে, তিনি ঈদের সকালে দোকান গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ঈদের আনন্দ এইসব মানুষদের ছূঁতে পারেনা। ঈদের ভোরে গোসল সেরে নতুন জামাকাপড় পড়া, এঘরে ও ঘরে স্বজনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের রেওয়াজ থাকলেও আমি উপকূলের অনেক স্থানেই তা পাইনি।

এভাবেই বড় একদল মানুষকে বৃত্তের বাইরে রেখে আমরা উৎসবের ডালি নিয়ে বসি। মেতে উঠি সার্বজনীন পার্বণে। কিন্তু এইসব সার্বজনীন উৎসবকে আমরা কতটা সবার মাঝে বিলিয়ে দিতে পারছি? এ প্রশ্নটা বারবারই ঘুরেফিরে আসে। দেখতে পাই ঈদের আনুষ্ঠানিকতা অনেক বড় হলেও এটা সবার মাঝে বিলিয়ে দেয়ার চেষ্টা আমাদের মাঝে খুবই কম চোখে পড়ে।

ঈদ এলে, ঈদের প্রস্তুতি শুরু হলে আমার মনে পড়ে উপকূলের প্রান্তিক মানুষদের কথা। যাঁদের ঘরে তিনবেলা ঠিকভাবে খাবারের ব্যবস্থা নেই, তারা কীভাবে ঈদ করে? ঈদ যেন তাদের কাছে আক্ষেপের, কষ্টের। দরিদ্র পরিবারে একদিনের জন্য বাড়তি চাপ। তবুও মুসলিম ধর্মীয় রীতির পথ ধরে ঈদ আসে। সঙ্গীতের সুর মুর্ছনা ছড়িয়ে পড়ে ‘রমজানের ওই রোজা শেষে এলো খুশির ঈদ’। ঈদের খুশি ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে। ঈদ পরিণত হোক সার্বজনীন উৎসবে।

// সম্পাদকীয়/উপকূল বাংলাদেশ/১৮০৭২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য