লক্ষ্মীপুরে পর্যটন সম্ভাবনার হাতছানি
লক্ষ্মীপুর : মানুষ প্রতিনিয়ত অবস্থানরত পরিবেশ-প্রতিকূলতার ব্যস্ত সময় পার করতে সর্বদা খুঁজে সজিব ও প্রাণচাঞ্চল্যকর স্থান। তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও সুযোগ পেলেই সবাই ছুটে যাই সতেজ ও মনোরম পরিবেশে। যেখানে অতিতের ব্যস্ততার কথা ভুলে গিয়ে এক অপার আনন্দের সমাহার গড়ে ওঠে।
মনোরম পরিবেশ আর পর্যটকদের মনমুগ্ধকর হয়ে উঠেছে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট। যেখানে নদীর বুকে জেগে উঠেছে চর, চরের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো মহিষের পাল, ঝাউ গাছের সারিতে মনমুগ্ধ হয়ে উঠে মন। তাই শত ব্যস্ততার মাঝেও ছুটির দিন কিংবা বিশেষ দিনে তরুণ-তরুণী, নবদম্পত্তি ও জেলার সর্বত্র থেকে আসা বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের পদচারণ ঘটে।
এখানে রয়েছে মেঘনা নদীর বিশাল জলস্রোত। যেখানে গড়ে ওঠেছে মেঘনা ও রহমতখালী নদীর সেতুবন্ধন সুইচ গেট। যার ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যদয় আর গোধূলীর অপরুপ দৃশ্য দেখে শীতল হয়ে ওঠে মন। আর অতিতের সকল গ্লানি মুছে দিয়ে যায় প্রাণচাঞ্চল্যকর দক্ষিনা বাতাস। আর এ যেন হাতছানী দিয়ে ডাকছে লক্ষ্মীপুরের অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র।
ছোট-বড় প্রায় সবারই নদী ভ্রমনের প্রবল ইচ্ছা রয়েছে। আর মজুচৌধুরীর হাটের এ মেঘনা নদীতে পালবিহীন ডিঙ্গি নৌকা কিংবা বড় বড় ট্রলারে করে নদীর বুকে পাড়ি দেয়া যায়। যার ফলে মানুষ তার কর্মব্যস্ততার সকল অভিশাপ ভুলে এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান পায়। এসময় মানুষের মন কেড়ে নেয় নদীর বুকের হিমেল বাতাস, আর অপরুপ মেঘনার ঢেউ। এ যেন এক অবিারাম দৃশ্য।
আর এসব পরিবেশে হারিয়ে যেতে কার না মন চায়। তাই প্রতিনিয়ত জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষের ভীড় দেখা যায়। এখানে প্রায় প্রতিদিনই মুখরিত থাকে পর্যটকের পদচারণা।
লক্ষ্মীপুর জেলা শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার পাড়ি দিলেই খোঁজ মেলে মনমুগ্ধকর মজু চৌধুরীর হাটের। যেখানে পাড়ি দিতেই রাস্তার দু’পাশে আকাশমনি ও পাহাড়ি গাছের সমারোহ। এর মধ্যে প্রায়ই দুই কিলোমিটার জুড়ে রাস্তার দু’পাশে রয়েছে ঝাউ গাছের সমারোহে সবুজ-শ্যামল স্নিগ্ধ মনোরম পরিবেশ। এ যেন প্রকৃতির এক অপরুপ সৃষ্টি। যা পর্যটকদের মন কেড়ে নেয়।
মজু চৌধুরীর হাটের এ মনোমুগ্ধকর পরিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, বিশাল জলরাশি সহজেই পর্যটকদের মুগ্ধ করে। যার ফলে প্রতিনিয়তই এখানে জেলা ও জেলার বাইরের দর্শনার্থীদের ভীড় থাকে। এ পরিবেশ যেন প্রতিনিয়িত দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। নদীর দু’পাশে গড়ে ওঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য বাসস্থান। এ যেন মনে হয় পৃথিবীর নতুন সৃষ্টি।
মেঘনার তীরবর্তী এ মজু চৌধুরীর হাট লক্ষ্মীপুর জেলার একমাত্র পর্যটনের জায়গা। নদীর ওপর আধুনিক কারুকার্যে স্থাপিত সুদৃশ্যমান সুইচগেটগুলো পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে। এ অনগ্রসর জেলার জন্য হতে পারে এটিই একমাত্র সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। যেখানে বনভোজন করার জন্য কৃত্রিম পর্যায়ে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা যেতে পারে। যার ফলে এখানে প্রতনিয়িত পর্যটকদের পদচারণ ঘটবে। এতে লক্ষ্মীপুর আর্থিক এবং পর্যটন শিল্পে উন্নতি হতে পারে।
মেঘনা নদী ঘিরে এর আশেপাশে গড়ে ওঠেছে জনবসতি। এখানে অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় হচ্ছে নদী। কেউ মাছ ধরে, কেউ পর্যটকদের নদী ভ্রমনে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এটি লক্ষ্মীপুর জেলার একমাত্র লঞ্চ ও ফেরী ঘাট। যেখানে লক্ষ্মীপুর-ভোলা রুটের হাজার হাজার যাত্রী প্রতিনিয়ত আসা-যাওয়া করে। তাই মজু চৌধুরীর হাটকে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য এলাকার মানুষ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করছে।
নদী ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী রুহুল আমিন বলেন, এ নদী আমাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। যখন এখানে পর্যটকদের ভীড় থাকে তখন মাছ বিক্রি খুব ভালো হয়। দূর থেকে আসা মানুষ তাজা মাছ দেখে কিনে নিয়ে যায়।
নদী ঘাটের জয়নাল মাঝি জানান, অ্যাঁই (আমি) অনেক দিন ধরি (থেকে) নৌকা দিয়ে ইয়ানের (এখানের) লোকগুলারে নদীর এ হাড় (পাড়) তন (থেকে) দূরের চরে লই (নিয়ে) যায়। আবার আঁন্ধার (আঁধার) নামলেই লই (নিয়ে) অ্যায় (আসি)। তবে ঈদ-চাঁন্দে (চাঁদে) নদী ভ্রমনে লোকজনের ভীড় (থাই) থাকে। নৌকা বাইয়াই (বেঁয়ে) অ্যাঁই (আমি) সংসার চালাই।
লঞ্চঘাটের হোটেল ব্যবসায়ীরা জানান, প্রাকৃতিক এ মনোরম পরিবেশই আমাদের ব্যবসার একমাত্র উৎস। এখানে স্থানীয়রা তেমন হোটেলে আসে না। তবে পর্যটকদের আসা-যাওয়াতে আমাদের ব্যবসা ভালো হয়। কৃত্রিম পর্যায়ে মনমুগ্ধকর পরিবেশে গড়ে তুললে পর্যটকদের আসা যাওয়া আরো বাড়বে। এতে আমাদের ব্যবসা আরো ভালো হত। তাই এজন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের প্রতি সু-দৃষ্টি আহবান করি।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) দুলাল হোসেন বলেন, সব সময় কম-বেশি পর্যটকদের আসা-যাওা থাকে। তবে নিরাপত্তার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্য নিয়োগ নেই। থাকলে ভালো হত।
লক্ষ্মীপুর বন বিভাগের সহকারী বন রক্ষক মোঃ আলা উদ্দিন বলেন, নদীর পাড়ের পরিবেশের সৌন্দর্য যেন নষ্ট না হয় সেজন্য প্রতিনিয়ত সঠিকভাবে পরিচর্যা করা হয়। বিভিন্ন সময় ঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া গাছগুলো সময়মত সরিয়ে আনা হয়।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাফিউস সাজ্জাদ বলেন, মজু চৌধুরীর হাটের মেঘনার এ অপরুপ দৃশ্য দেখার জন্য প্রতিনিয়তই বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা আসে। জলবদ্ধতার কারনে যেন পর্যটকদের কোন ক্ষতি না হয়, সেজন্য এখানে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত রেগুলেটর রয়েছে। যা ব্যবহার করে প্রয়োজন মত পানি নিস্কাশন করা যায়।
নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, জেলার পয কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মজু চৌধুরীর হাট। এখানে প্রতিনিয়ত পর্যটকদের ভীড় থাকে। এখানে পুলিশের কোন স্থায়ী ক্যাম্প নেই। বিভিন্ন উৎসবে এখানে পর্যটকদের ভীড় থাকে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য ওই সময়গুলোতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তবে মজু চৌধুরীর হাটে পুলিশের স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের জন্য প্রক্রিয়া চলছে।
//হাসান মাহমুদ শাকিল/ উপকূল বাংলাদেশ/লক্ষ্মীপুর/২০০৬২০১৫//
