চরফ্যাসনের দক্ষিণ উপকূলে প্রতিনিয়ত নতুন দুর্যোগ

শিপু ফরাজী ।।
ভোলার চরফ্যাসনের দক্ষিণ উপকূলের সিডর ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো তিন বছরেও ঘরে ফিরতে পারেনি। আর কোনদিন তাদের স্থায়ী ঠিকানায় ফিরতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে দুর্গতদের মনে। সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যদিও বলেছেন, আগামী মাসে বেড়িবাঁধের কাজ শেষ হয়ে যাবে। তখন লোকজন ঘরে ফিরতে পারবে। কিনত্ম তাদের এই কথায় আশ্বসত্ম হতে পারছেনা বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষগুলো।

চরফ্যাসন উপজেলার চর মাদ্রাজ ইউনিয়নে চরনিউটন গ্রামে ভাঙ্গা বেড়িবাঁধের উপর বসে কথা হয় হারম্নন বেপারীর সঙ্গে। এখানে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর, সিডরের আঘাত হানার পরের দিন। তার ঘর বাড়ি ভেসে গেছে। নিজের ভিটায় এখন নিজেই ফিরতে পারেন না। প্রতিদিন জোয়ার ভাটায় দু’বার ভাসায়। গত দু’বছর এই অবস্থার মধ্য দিয়ে পার করেছেন আর দু’টি ঘূর্নিঝড় । হারম্নন বেপারীর সঙ্গে কথা বলার সময় ভিড় করেন এমন আরও অনেকে। সবার এক কথা, বেড়িবাঁধ না হওয়া পর্যনত্ম বাড়ি ঘরে ফেরার কোন সুযোগ নেই। এবছর তারা কোন ফসল ফলাতে পারেনি। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে বেড়িবাঁধ মেরামত না হয় তাহলে আগামী বছরও কোন ফসল ফলানো যাবে না। এর পাশাপাশি সিডরের পর উপকূলে বয়ে যাওয়া বন্যা ও জোয়ারের পানিতে তাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ।

প্রমত্ত মেঘনার কোল ঘেঁষে চরফ্যাসন উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫৫নং পোল্ডারের লোনা পানি থেকে রক্ষার জন্য বেড়িবাঁধ ঘেরা অঞ্চলের মধ্যে চর মাদ্রাজ  ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফখরম্নদ্দিন শাহিন মালতিয়া জানান, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর চরমাদ্রাজ ইউনিয়নের ৫টি গ্রামের ২০ হাজার মানুষ আইলায় ক্ষতিগ্রস’ হয়। এদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার মানুষ বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি এরা। ক্ষতিগ্রস’দের মধ্যে অধিকাংশই মোহাম্মদপুর, চরনিউটন, হামিদপুর গ্রামের বাসিন্দা।

হামিদপুর গ্রামের হাফেজা বেগম (৪০) বলেন, সিডরের পর পর কিছু ত্রাণ পেলেও এখন আর তা পাইনা। এর পর ও দু’টি দুর্যোগ মোকাবেলা করেছে এই মানুষগুলো। বেড়িবাঁধের বাসিন্দা ও মানুষগুলোর অভিযোগ সিডরের পর থেকে সরকার প্রতি মাসে ২০কেজি করে চাল বরাদ্দ দিচ্ছে। তবে তারা হাতে পান ১০-১২ কেজি চাল। এই অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় মেম্বার চাল কম দেওয়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, চাল পরিবহনের খরচ তাদেরকে সরকার দেয়না। এ কারণে তারা প্রতি দু’ই কেজি চাল কম দিয়ে খরচ মেটান।

স্থানীয় সংসদ আব্দুলস্নাহ আল ইসলাম জ্যাকব বলেন, চর মাদ্রাজকে নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষার জন্য টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কাজ শুরম্ন হলেই সিডর, আইলা ও রেশমির আঘাতে ক্ষতিগ্রস’দের দুর্ভোগ কমে যাবে। তবে এলাকার বেশিরভাগ মানুষের মুখে ভিন্ন অভিযোগের সুর। তারা জানান, প্রতি সরকারের আমলেই বেড়িবাঁধ মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা লুট করে নেয় রাজনৈতিক নেতারা। বর্ষার পূর্ব মুহুর্তেই এসব কাজ শুরম্ন হয়। আর বর্ষার মৌসুমে জোয়ারের পানিতে এই বাঁধ ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

শীত আসছে। এর আগের বছরগুলোতে চর মাদ্রাজের সিডর, আইলায় ক্ষতিগ্রস’ মানুষরা বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো কোন রকম ঝুপড়ির মধ্যে বসবাস করছে। কনকনে শীতে তাদের জীবনে নেমে এসেছিল আরেক দুর্যোগ। এবারও সে ধরণের আরেকটি দুর্যোগ অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।

শিপু ফরাজী
প্রতিনিধি, দৈনিক যুগানত্মর, চরফ্যাসন, ভোলা

উপকূল বাংলাদেশ

উপকূল বাংলাদেশ

পাঠকের মন্তব্য