১০ লিটার দুধ উৎপাদনক্ষম ২০ লাখ মহিষ উৎপাদনের উদ্যোগ

চরের মহিষঢাকা: মহিষের দুধ ও মাংস বাড়ানোর লক্ষ্যে এবং সুস্থ সবল বাছুর উৎপাদনে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশের উত্তরাঞ্চল, চরাঞ্চল ও হাওড়াঞ্চলে মুররাহ জাতের মহিষের সিমেনের মাধ্যমে দেশীয় জাতের মহিষের জাতোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম এ খবর দিয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতর জানায়, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ২০ লাখ গাভী মহিষ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মহিষে থেকে ৮-১০ লিটার দুধ পাওয়া যাবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই দেশে উন্নত জাতের ২০ লাখ মহিষ উৎপাদন করা হবে।

স্বল্প পরিসরের ‘মহিষ উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৪১৫টি মহিষের ওপর কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়ায় ২৫টি সুস্থ সবল বাছুর জন্মগ্রহণ করেছে। এদের জন্ম ওজন প্রায় ২৫-৩৫ কেজি। যেখানে দেশীয় বাছুরের জন্ম ওজন মাত্র ৮-১৫ কেজি। প্রাথমিকভাবে এই সাফল্য পাওয়ার ফলে ব্যাপক পরিসরে মহিষের জাত উন্নয়নে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘মহিষ উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৪টি জেলার ৪০টি উপজেলায় ব্যাপকভাবে এ লক্ষ্যে কাজ শুরু হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক অজয় কুমার রায় বলেন, আমরা সবসময় উন্নত জাতের গরু উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু মহিষ উৎপাদনে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই প্রাণীটি আমাদের দেশে অবহেলিত রয়েছে। আমাদের দেশে মহিষের মাংস ও দুধেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ২০ লাখ উন্নত জাতের গাভী মহিষ উৎপাদন করা হবে। যাতে করে প্রতিটি গাভী মহিষ থেকে ৮-১০ কেজি দুধ পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের মহিষ থেকে এক থেকে দেড় কেজি দুধ পাওয়া যায়। কিন্তু কৃত্রিম প্রজননে উৎপাদিত এসব মহিষ থেকে অতিরিক্ত দুধ ও মাংস পাওয়া সম্ভব। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মহিষ আমাদের দেশে আর অবহেলিত থাকবে না। এমনকি আমাদের পাশের দেশেও ৬০-৬৫ ভাগ দুধ উৎপাদিত হয় মহিষ থেকে। আমরাও একইপথে হাঁটতে চাই।

ঢাকার সাভার, জামালপুরের সদর, মাদারগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল, সখিপুর, মধুপুর, ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়, হালুয়াঘাট ও ত্রিশাল উপজেলায় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে মহিষ উৎপাদন করা হবে বলে জানান প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক।

তিনি জানান, ফেনীর সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফুলগাছী, লক্ষীপুরের সদর, রামগতি ও কমলনগর, নোয়খালীর কোম্পানীগঞ্জ, হাতিয়া, সুবর্ণচর, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, মীরসরাই ও সন্দ্বীপেও এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ চলছে।

লক্ষ্য বাস্তবায়নের কাজ চলছে মৌলভীবাজারের রাজনগর, কমলগঞ্জ, বড়লেখা, সিরাজগঞ্জের সদর, উল্লাপাড়া, তাড়াশ, রংপুরের পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুরে, বাগেরহাটের কচুয়া, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, পটুয়াখালীর সদর, গলাচিপা, কলাপাড়া, ভোলার সদর, চরফ্যাশন ও মনপুরায়ও।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে ৩৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে স্বল্প পরিসরে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছিল। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের জুনে। মহিষের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকল্পের পরিসর এবং মেয়াদও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ৩৩ কোটি ৭১ লাখ থেকে প্রকল্পের ব্যয় এখন বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে জুন ২০১৭ সাল পর্যন্ত। এছাড়া, লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া পযর্ন্ত প্রকল্পটি চলমান থাকবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিনা আফরোজ বলেন, মহিষ উন্নয়ন প্রকল্পটি চলমান প্রকল্প। আরও বড় পরিসরে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। সেই লক্ষ্যে সংশোধিত আকারে ব্যাপক পরিসরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।

নানা কারণেই প্রকল্পটি ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। বর্তমানে দেশে দুধের চাহিদা প্রায় একশ’ ৪০ লাখ মেট্রিক টন। অথচ উৎপাদনের পরিমাণ মাত্র ৫১ লাখ মেট্রিক টন। দুধের এ বিশাল চাহিদার অধিক আসে গরু থেকে। অথচ পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের মোট দুধের উৎপাদনের ৬০-৬৫ ভাগ আসে মহিষ থেকে।

দেশে মাংসের চাহিদা পূরণেও মহিষ বিশেষ অবদান রাখতে পারে। বর্তমান বাজারে গরুর মাংসের সঙ্গে মহিষের মাংস মিশিয়ে অথবা মহিষের মাংসকে গরুর মাংস পরিচয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে মহিষের মাংসের স্বাদ, গন্ধ ও অন্যান্য উপকারিতা সম্পর্কে সাধারণ জনগণ অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছে। দেশের সামাজিক অবস্থা ও সার্বিক জলবায়ু মহিষ পালনের জন্য খুবই উপযোগী। কিন্তু কম উৎপাদনশীল গো-খাদ্যের অপর্যাপ্ততা এবং জনসাধারণের মধ্যে মহিষের মাংসের গ্রহণযোগ্যতা কম হওয়ায় এ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং জনগণের মধ্যে মহিষের মাংসের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করতেই প্রকল্পটি ব্যাপক পরিসরে বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দুগ্ধ উৎপাদনকারী মহিষের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি ও নির্বাচিত এলাকায় খামারিদের দেশি মহিষের জেনেটিক উন্নয়ন করা হবে। পাশাপাশি মহিষের রোগসমূহ চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলোর নিয়ন্ত্রণের উপায় উদ্ভাবন করা হবে। স্থায়ীভাবে স্বল্প খরচায় মহিষের সুষম খাদ্য প্রস্তুত প্রণালীর উন্নয়ন করা হবে।

প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রম টাঙ্গাইলে মহিষের বাছুর পালন কেন্দ্র স্থাপন, সাভারে মহিষ-ষাড় পালন কেন্দ্র স্থাপন, বাগেরহাটে মহিষের প্রজনন ও উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করা। এছাড়া, উন্নত মানের মহিষ পরিচর্যার জন্য দুই হাজার ৩৪০ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ২৪ হাজার ডোজ মহিষের হিমায়িত সিমেন সংগ্রহ, ৩০০টি গাভী মহিষ ও ১৫০টি ষাড় মহিষ কেনা হবে।

প্রকল্পের আওতায়, সংশ্লিষ্ট এলাকায় মহিষের আবাসন এলাকার উন্নয়ন করা হবে, নির্মাণ করা হবে বাউন্ডারি ওয়াল, রাস্তা, গেইট ও গার্ড। কেনা হবে উন্নত জাতের ছয়টি বিদেশি মহিষের সিমেন। অত্যাধুনিকভাবে তৈরি করা হবে সিমেন প্রসেসিং রুমও।

দেশে ২০ লাখ গাভী মহিষ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের পরিসর ও মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে বলছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্র।

//ডেস্ক উপকূল বাংলাদেশ/০৭০৫২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য