৩৫ বছরেও মেলেনি স্থায়ী আবাস, উচ্ছেদ শঙ্কায় ঘুম নেই
- ১৮:২৪
- প্রধান প্রতিবেদন, বিশেষ প্রতিবেদন, সর্বশেষ
- ২৬৯
মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া।। দুই ছেলে সোহরাব ও আফজাল হোসেনকে নিয়ে বিধবা, বৃদ্ধা মনোয়ারার সংসার। ছেলে ভাড়াটে হোন্ডা চালক। ১১ বছর আগে স্বামী আব্দুল হানিফ পরলোকে পারি দিয়েছেন। তার কবরটি রয়েছে এই বেলাভুমে। চাষের কোন জমি নেই। শুধু বাড়ি-ঘর করার জায়গা রয়েছে। ৫০ শতক বেলাভূমে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা লাগিয়েছেন। করছেন সবজির আবাদ। ৩৫টি বছর গঙ্গামতির এই চরে বসবাস করছেন মনোয়ারা বেগম। সরকারের খাঁস জমিতে তিন যুগ ধরে বাস করলেও আজ পর্যন্ত জমির কোন মালিক হতে পারেন নি। পারেন না এক শতক জমিতে চাষাবাদ করতে। মনষাতলী গ্রামের স্বামীর বাড়িঘর ছেড়ে এই চরে আশ্রয় নিয়েছিলেন মনোয়ারা। জানালেন, নিজের নামে, স্বামীর নামে কয়েকবার খাস জমির বন্দোবস্ত চেয়ে আবেদন করেছেন। এজন্য বহু টাকা খরচ করেছেন, অন্তত ৫০/৬০ হাজার। জমি জোটেনি। ভয়াল সিডরে বুক সমান পানি সাতরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছেন। বাড়িঘর সব লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। দুই বান্ডিল টিন ও ঘর তোলার জন্য পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছিলেন সরকারের পক্ষ থেকে। তা দিয়ে আবার জোড়াতালি দিয়ে ঘরটি ঠিক করেছেন।
একই দৃশ্য সালাহউদ্দিন ও তহমিনা দম্পতির। চার সন্তান নিয়ে ছয় জনের সংসার। চরের বেলাভূমের ছয় বিঘায় আবাদ করেছেন আমনের। ফলনও পেয়েছেন বাম্পার। কিন্তু সোনালী ধানের ক্ষেতে লাল নিশান দেয়া হয়েছিল। ভূমি অফিসের তহশিলদাররা নিশান দিয়েছিলেন বলে জানালেন। খাস কালেকশনের খাতে একর প্রতি তিন থেকে চার শ’ টাকা দিতে হয় ফি বছর। তারপরেই কাটতে হয় ধান। এ দম্পতি সাত বছর আগে চরটিতে আবাস গড়েছেন। অনেক কষ্টে মানুষটি সন্তানদের স্কুলমুখি রেখেছেন। জানালেন, বড় মেয়ে সালমা এ বছর জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তার ভাষায়, ‘সালমারে নিয়াই রুহু টানটান’। মাসে অন্তত সাত হাজার টাকা খরচ হয় শুধু লেখাপড়ার জন্য। কখনও সাগরে জাইল্যা কাম। কখনও কামলা, শ্রমজীবি।
প্রায় ৩৫ বছর এই চরে বাস করছেন মোহাম্মদ তৈয়ব আলী। বৃদ্ধ বাবা ইউনুছ আলী হাওলাদার ও মা তাজিনুর বেগম, দুই ছেলে, দুই মেয়ে নিয়ে তার সংসার। ছেলেরা টমটম চালায়। মা তাজিনুর কয়েক বছর আগে অসুস্থ হয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে গেছেন। এ বছর এক একর জমিতে আমনের আবাদ করেছেন। জমির দখল নিয়ে যেন যুদ্ধ করতে হয়েছে তাকে। জানালেন, এক জোদ্দার হারিচ মেম্বার তার ১৩টি গরু নিয়ে গেছে। মামলা দেয়া হয়েছে। হাজতবাস করতে হয়েছে। তহশিলদাররাও মামলা দিয়ে হাজতে দিয়েছেন। কিন্তু জমির মালিকানা জোটেনি আজও। আশরাফ আলীর বয়স এখন ৪৫ বছর। জানালেন, তার জন্ম এই চরে। বাবা হাসেম সরদার ১০ বছর আগে মারা গেছেন। মা ইহলোক ছেড়েছেন আট বছর আগে। স্ত্রী সুফিয়া বেগম ও দুই ছেলে আর তিন মেয়েকে নিয়ে এ মানুষটির সংসার। জানালেন, তাদেরকে জমি চাষ করতে না দিলেও জোতদাররা অন্তত দুই শ’ একর জমি দখল করে রেখেছেন। তাদের কাছ থেকে আবার একসনা রেখে তরমুজের আবাদ করেন এই তারা। এভাবে গঙ্গামতির এই চরটিতে অন্তত ছয় শ’ পরিবারের বসবাস। যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করছেন এসব মানুষ। ধানসহ রবিশস্যের আবাদ করছেন। কিন্তু বিখ্যাত গান ‘পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই, আমিতো সেই ঘরের মালিক নই- অবস্থা চরবাসীর।’
এভাবে অন্তত ছয় শ’ দরিদ্র পরিবার এই চরটিতে তিন যুগেরও বেশি সময় বসবাস করে আসছে। কিন্তু কারও এক চিলতে জমির মালিকানা জোটেনি। নিজেদের মধ্যে বাটোয়ারার মাধ্যমে চৌহদ্দি দিয়ে রেখেছেন বাড়ির চারদিকে। সেখানে ধানসহ ফলায় রবিশস্য। এজন্য ভূমি অফিসের তহশিলদারকে খাস কালেকশনের নামে টাকা দিতে হয়। ধান পাকলেই তহশিল থেকে ক্ষেতের মধ্যে লাল পতাকা টানিয়ে দেয়া হয়। রবিশস্যের মৌসুমেও এর ব্যত্যয় ঘটেনা। বিশেষ করে তরমুজ আবাদের সময় বিপুল পরিমাণ টাকা দিতে হয় এসব হতদরিদ্র পরিবারের। বেড়িবাঁধের বাইরে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যুর চরম ঝুঁকি নিয়ে মানুষগুলো বসবাস করে আসছেন। কারণ তাদের জীবিকার পথ সাগরে মাছ শিকার করে। মূল পেশা জেলে। কর্মস্থল খুব কাছে হওয়ায় ঝুকি থাকা সত্ত্বেও বসতি গেড়ে আছেন মানুষগুলো। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসকালে এদের আশ্রয়ের জন্য কারিতাস নির্মিত একটি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। যেটিতে মাত্র পাঁচ শ’ মানুষ আশ্রয় নিতে পারলেও আর কোন উপায় নেই। ওই সাইক্লোন শেল্টারটি আবার চরের শিশুদের প্রাথমি শিক্ষা নেয়ার একমাত্র অবলম্বন। ক্লাশ ফোর পর্যন্ত লেখাপড়া করার সুযোগ রয়েছে সেখানে। উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের শিশুশিক্ষা কেন্দ্রটিতে তাদের নিজস্ব শিক্ষক রয়েছে।
গোটা চরটিতে বসবাস করা মানুষের এন্তার অভিযোগ তারা এক একর জমির বেশি চাষাবাদ করতে পারেন না। কিন্তু বাইরের প্রভাবশালী কয়েকটি চক্র অন্তত এক শ’ বিঘা জমি তাদের দখলে রেখেছে। এরা সবাই প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের কথিত নেতা, ভূমিদস্যু। বহুবার এসব খাস জমি বন্দোবস্ত চেয়ে এরা আবেদন করেছেন। দাললসহ, কথিত রাজনৈতিক দলের নেতা ও ভূমি অফিসের লোকজন প্রত্যেকের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। কথিত রয়েছে বসতবাড়ির জমির বন্দোবস্ত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ভোট আদায় করেন কৌশলী প্রার্থীরা। ১৯৯৮ সালে গঙ্গামতি এলাকা পর্যটন পল্লী হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়। এরপরে ওই এলাকার খাস জমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপরে এসব মানুষ থাকে উচ্ছেদ আতঙ্কে। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেন পুনর্বাসন ছাড়া কাউকে উচ্ছেদ করা যাবে না। এতে খানিকটা স্বস্তিতে রয়েছে চরবাসী। কিন্তু দীর্ঘদিন পর্যন্ত এসব মানুষের বসবাসের জন্য আবাসন ব্যারাক করার পরিকল্পনা থাকলেও তার বাস্তবায়ন নেই। ফলে গঙ্গামতির ছয় শ’ দরিদ্র পরিবারের আবাসনের স্থায়ী সমাধান হয়নি। গঙ্গামতির এসব হতদরিদ্র পরিবারের মধ্যে এখন এক ধরনের উচ্ছেদ আতঙ্ক বিরাজ করছে। সরকারের খাস জমি থেকে হয়তো বা তাদেরকে উচ্ছেদ করা হবে এমন শঙ্কায় এদের একেকটি প্রহর কাটছে।
বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ধারায় ব্রিজ পেরিয়ে পর্যটকসহ বিভিন্ন ধরনের ভুমিদস্যুদের পদচারণাও বেড়েছে মনোরম এ সৌন্দর্যমন্ডিত চরটিতে। সূর্যোদয়ের মনোরম সৌন্দর্য অবলোকনদৃশ্য এসব মানুষকে কখনও উদ্বেলিত করে না। লাল কাকড়ার ভোঁ দৌড়ও দেয়না আনন্দ কিংবা উত্তেজানা। তবে জীবিকার টানে সাগরের শোঁ শোঁ শব্দ এসব মানুষকে কেবলই টানছে গহীন সাগরের বুকে, দৃষ্টির বাইরে, বহুদুরে। সকালে কিংবা বিকালে এ নিত্যযাত্রায় সামিল হয় এসব হতদরিদ্র মানুষেরা। সাগরে কোলঘেঁষে সংযুক্ত চরটির মানুষের ধারনা হয়তোবা কেউ এসে কোন সকালে তাদেরকে বলা হবে বসতি ছেড়ে চলে যাও। হবেন গৃহহারা অন্তত দেড় হাজার নারী-পুরুষ-শিশু। এমন শঙ্কায় বিনীদ্র রাত কাটছে এসব মানুষের।
