ঐতিহ্যের নীল নাচ | দেবদাস মজুমদার

ঐতিহ্যের নীল নাচ : ছবি তুলেছেন দেবদাস মজুমদারচৈত্রদিন শেষ হলেই বাংলার নতুন বছরের আগমনে গ্রাম বাংলায় শুরু হয়ে যায় নানা উৎসব আয়োজন। চৈত্র সংক্রান্তি আর বৈশাখী মেলা আবহমান বাংলার চিরায়ত উৎসব। ৩০ চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবে মেতে ওঠে গ্রাম বাংলার মানুষ। সাধারণত হিন্দু সম্প্রদায় চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবে নানা পূজার আয়োজন করে।

বাংলা সালের পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে আদিকাল ধরে চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব পালন করা হয়। চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবের অন্যতম পুজা হচ্ছে নীল পূজা বা শিবের গাজন। দেশের হিন্দু ধর্মালম্বী সম্প্রদায় পহেলা বৈশাখের ঠিক আগেরদনি পালন করে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব। এদিনেই অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নীল পূজা। নীল উৎসবকে ঘিরে গ্রামে গঞ্জের গৃহস্থের উঠান জুড়ে নীল নাচের আসর বসে। হাটবাজারেও নীল নাচ উপভোগ করছে হাটুরে মানুষ। বাঙালীর চিরায়ত উৎসব ঘিরে গ্রামে গঞ্জে বিশেষ উৎসবের উদ্দীপনা চলে। নীল নাচের দল বর্ণিল দেবদেবীর সাজে নানা বাদ্যযত্রের অনুসঙ্গে নাচ গান করে মানুষের মনোরঞ্জনে ব্যস্তসময় পার করে শেষ চৈত্রে।

প্রতিটি নীল নাচের দলে ১০/১২ জনের রাধা, কৃষ্ণ, শিব, পার্বতি, নারদসহ সাধু পাগল (ভাংরা) সেজে সকাল থেকে মধ্য রাত অবধি নীল নাচ গান পরিবেশন করেন। গ্রাম বাংলার সকল মানুষের কাছে দারুণ উপভোগ্য এই নীল নাচ। চৈত্র সংক্রান্তি মেলার দিনে নীল পূজা শেষে শেষ হয় এ নীল নাচ।

নীল পূজার জন্য নীল নাচের দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল, ডাল আর নগদ অর্থ সংগ্রহ করে। নীল পূজা মূলত হিন্দু ধর্মীয় উৎসব হলেও চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবে মিলে তা সার্বজননীন এক উৎসবে পরিনত হয়।

পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া, মঠবাড়িয়া, কাউখালী ও নাজিরপুরসহ উপকূলীয় এলাকার গ্রামাঞ্চলে  নীল নাচের দলের দেখা মেলে। নীল দল গ্রাম জনপদ,শহর ঘুরে নীল নাচ পরিবশেন করে। এসময় নীল দল নেচে গেয়ে নীল পূজার উৎসবে মানুষকে আমন্ত্রণ জানায়।

এ নীল নাচের দলের দলপতি ঠাকুর বীরেন চক্রবর্তী জানান, পুরো চৈত্র মাস ধরে ১২ সদস্যের নীল দল উপকূলীয় জনপদে নাচ গান করে । মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ভান্ডারিয়ার গৌরিপুর গ্রামে ঐতিহ্যবাহী এ নীল পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

তিনি আরও জানান,অর্ধশত বছর ধরে এখানকার গৌরিপুর গ্রামের হাওলাদার বাড়ির পুকুর ও আশপাশের মাঠ জুড়ে এ নীল পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠান ঘিরে এখানে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসে । এছাড়া মঠবাড়িয়া উপজেলার ঘোষের টিকিকাটা গ্রামের নীলখোলায় মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশ বৈদিক আশ্রম মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীমৎ স্বামী সিদানন্দ স্বরস্বতী ক বলেন, নীল পূজা ও চৈত্র সংক্রান্তি মেলা হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও তা বাঙালীর চিরায়ত উৎসব। এটি আসলে কালের আবর্তের উৎসব। নীল পূজা মানে শিব দেবতার গাজন (শিব পূজা)।

হিন্দু ধর্মের পৌরনিক ধর্ম মতে, দেবতা শিব সমুদ্র মন্থনে বিষপান করে নীল কণ্ঠ ধারন করেছিল। আবার বৈদিক হিন্দু ধর্ম মতে, সূর্য অস্ত গেলে চারিধার গাঢ় অন্ধকার হয়ে আসে। গাঢ় অন্ধকার নীল বর্ণের হয়। এখানে বছরের আয়ূষ্কাল শেষ হওয়ার প্রতীকী হল এই নীল। কালের আবর্ত শেষ হয়ে আসে নতুন ভোর, নতুন কাল। পুরানো কালকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরে সংকট কেটে সুখ ও সমৃদ্ধির আশায় শিবের আরাধনা বা শিবের গাজন অনুষ্ঠিত হয়। চৈত্র শেষে শিবের গাজন উৎসবই হল নীল পূজা।

তবে এবছর হিন্দু ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের নীল উৎসব পালনে কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল) ছিল শেষ চৈত্র। সে হিসাবে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখ। অন্যদিকে বাংলা সালের বর্ষপঞ্জিকা অনুযায়ী মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) চৈত্র সংক্রান্তি আর বুধবার (১৫ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখ।

হিসাবে গড়মিল হলেও দেশের হিন্দু ধর্মালম্বী সম্প্রদায় বাংলা পঞ্জিকা মেনে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পালন করে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব। অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নীল পূজা।

//দেবদাস মজুমদার/উপকূল বাংলাদেশ/পিরোজপুর/১৫০৪২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য