সবজি সবুজের সমারোহ মাতামুহুরির দু’তীরে

মাতামুহুরির তীরে সবজির সবুজকক্সবাজার : কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মাতামুহুরি নদীর দু’তীর জুড়ে শাক-সবজি চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় কৃষকরা। শীতকালীন শাক-সবজি ছাড়াও বারো মাস জুড়ে সরবরাহ দিতে দু’তীর তোড়জোড় চালিয়ে যাচ্ছে এসব কৃষকরা। প্রতি বছরের মত এবছরও সবজি চাষে রেকর্ড করতে চায় নদীর তীরের কৃষকরা।

সরেজমিন চকরিয়া মাতামুহুরি নদীর দু’তীরের বির্স্তীণ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয় চাষীরা নদীর দু’তীর জুড়ে শত শত একর জমিতে শাক-সবজির চাষ করেছেন। যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই শুধু বীজ তলা আর ছোট ছোট সবুজ সবজির চারা। মুলা, লালশাক, পালংশাক, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, সীম, লাউ, বরবটি, ঢ়েঁড়স, মিষ্টি কুমড়া, তিত করলা, শলগম, মরিচ, বাটি শাক, ফ্রান্সবীনসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারা ভরিয়ে তুলেছেন চরের পর চর।

প্রতি বছর বাম্পার ফলন হওয়ায় সবুজ সবজিতে ভরে গেছে চাষীদের মন। তাই তারা আগাম সবজি চাষেও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক কৃষক। চাষের মাধ্যমে সবজি খেত থেকে তুলে কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও সারাদেশে সরবরাহ করা হয় নদীর দু’তীর থেকে। সবজি ব্যবসায়ীরা ওই স্থান থেকে সবজি তুলনামূলক কম দামেই গাড়িতে করে দেশের বিভিন্ন জায়াগায় সরবরাহ দেয় বলে স্থানীয় কৃষকরা জানান।

সংশ্লিষ্ট চাষী ও দিনমজুররা এসব খেতে এখন পুরোদমে সবজির চারা রোপনের পাশাপাশি বীজ তলাও তৈরি করে যাচ্ছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শত শত পুরুষ, নারী ও শিশু শ্রমিকরা বীজতলা তৈরিতে কাজ করছে। অধিকাংশ জমিতে বীজ বপন করে চারা উৎপাদনের প্রক্রিয়া চলছে। উৎপাদিত শীতকালিন সবজি শেষ হওয়ার পর এখন বারো মাস ব্যাপি সবজি চাষ শুরু করেছেন। রোপিত চারায় সকাল-সন্ধ্যা নদী থেকে সেচ পাম্প দিয়ে পানি দিচ্ছে কৃষকরা।

চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল দ্বীপকুল এলাকার চাষী মনজুর আলম জানান, প্রতি বছর তিনি মাতামুহুরি নদীর তীরে ৫ কানি জমিতে বিভিন্ন ধরণের সবজি চাষ করেন। উক্ত জমিতে টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও কাঁচা মরিচের বীজ বপনসহ চারা রোপন করতে  প্রায় এক লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবছর বীজতলা তৈরিতে প্রায় ৩০ হাজার টাকা বেশি খরচ পড়েছে।  এর মধ্যে পরিচর্যা, কীটনাশক ব্যবহার, সার প্রয়োগ, শ্রমিকের মজুরিসহ ফলন উৎপাদন পর্যন্ত আরো ১ লাখ টাকা খরচ হয়। যথা সময়ে এসব সবজির বাম্পার ফলন এবং বাজারে ন্যায মূল্য থাকায় প্রায়  দু’ চার লাখ টাকা আয় হয়েছে বলে তিনি জানান।

আমান পাড়া এলাকার চাষী শাহাব উদ্দিন ও মোক্তার আহমদ জানান, শ্রমিকের মাধ্যমে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত সবজির চারা রোপন করে যাচ্ছি। সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাতামুহুরি নদী থেকে পানি এনে জমিতে দেয়া হচ্ছে। জমিতে দেয়া হচ্ছে পর্যাপ্ত সারও। তিনি আরো জানান, এখনো অনেক জমিতে শীতকালিন সবজি রয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যেই পুরোদমে মাতামুহুরির দু’তীরে সবজির বাম্পারে ভরে যাবে। তবে অনেক স্থানে আগাম সবজির চারা রোপন করা হয়েছে।

চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের আমান পাড়া এলাকার মহিলা শ্রমিক পাখি বেগম, শাকেরা বেগম ও জুবাইদা জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তারা বীজতলা তৈরি করার পাশাপাশি সবজির চারাও রোপন করছে। এর বিনিময়ে তাদের দেওয়া হয় দৈনিক ১৫০ টাকা মাত্র। কিন্তু পুরুষ শ্রমিকদের দৈনিক বেতন পড়ে ৩০০ টাকা।

চাষীরা জানান, গত দু’ মাস আগে থেকে সবজি উৎপাদন ও  বীজ তলা তৈরি, বীজ বপন, সেচ দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, কীটনাশক ও সার প্রয়োগসহ আনুষাঙ্গিক কাজ করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। বাজারে আগাম সবজির সরবরাহ দিতে কৃষকরা পুরোদমে কাজ করছে।

চকরিয়া কৈয়ারবিল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শরিফ উদ্দিন চৌধুরী জানান, চকরিয়ার বেশির ভাগ মানুষ কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। সবচেয়ে বেশি মাতামুহুরি নদীর দু’পাশের বাসিন্দারা কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে অনেক কৃষক মাতামুহুরি নদীর দু’তীরে আগাম শাক-সবজি চাষ করছে। এই নদীর দু’তীর থেকে রেকর্ড পরিমাণে সবজি উৎপাদন হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারি কৃষি অফিসার আশিস কুমার দে জানান, কক্সবাজারসহ আট উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি শাক-সবজি উৎপাদন হয় চকরিয়া উপজেলায়। তার মধ্যে মাতামুহুরি নদীর দু’তীর অন্যতম।

//আরফাতুল মজিদ/ উপকূল বাংলাদেশ/কক্সবাজার/২৩০৩২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য