দূষণ-দখলের কবলে রূপসা ভৈরব ময়ূর

6948402735_b748ef873d_n.jpgএনামুল হক, খুলনা।। দূষণ-দখলের কবলে পড়েছে খুলনা মহানগরীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত রূপসী রূপসা, ভৈরব ও ময়ূর নদী। নদী তীরবর্তী ছোট-বড় অসংখ্য শিল্প-কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, কঠিন বর্জ্য, ঝুলন্ত পায়খানায় নির্গত মানব বর্জ্য, শত শত ড্রেন ও নালা-নর্দমা থেকে বেয়ে আসা ময়লা-আবর্জনা বিষাক্ত করে তুলেছে নদী তিনটির পানি। এছাড়া অবৈধভাবে পাড়সহ নদী দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলার প্রতিযোগিতার কারণে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে এক সময়ের প্রমত্তা এই নদীর স্রোতধারা। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা দূষণ ও দখল প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বিলীন হয়ে যাওয়া নদীগুলোর মতো এই নদী তিনটিরও করুণ পরিণতি হবে।খুলনা মহানগরীর তিন দিক নদী দ্বারা বেষ্টিত। নগরীর পাশে রয়েছে রূপসা, ভৈরব, ময়ূর ও কাজীবাছা নদী। রূপসা ও ভৈরবের দুই তীরে রয়েছে ৫৩টি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে ৪০টি প্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক বর্জ্য প্রতিনিয়ত নদীর পানিতে মিশছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া কারখানার বর্জ্য শোধন করে রূপসা নদীতে ফেলার নিয়ম থাকলেও খরচ বাঁচাতে অনেক প্রতিষ্ঠানই সে নিয়ম মানছে না। নগরীর দৌলতপুর-খালিশপুর এলাকায় অবস্থিত পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নামে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বি.পি.সি) তিনটি তেলের ডিপো প্রতিদিন ধোয়া-মোছার পর সেই তেলযুক্ত পানি ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি চলে যাচ্ছে ভৈরব নদীতে। পরিবেশবিদদের মতে ভেসে থাকা তেলের কারণে সূর্যের আলো নদীর পানির নিচের স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে মাছ ও জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক বেঁচে থাকার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি মত্স্য পোনার নার্সারি গ্রাউন্ড ধ্বংস হচ্ছে। এছাড়া ভৈরব ও রূপসা নদীর দুই তীরে রয়েছে ১০টি পাটকল। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যও মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র ও ম্যাচ ফ্যাক্টরির রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী নদী দূষণের জন্য খুলনা সিটি কর্পোরেশনও কম দায়ী নয়। কর্পোরেশনের কয়েকশ’ ড্রেনের পানি কোন ধরনের শোধন ছাড়াই ড্রেনের মাধ্যমে সরাসরি গড়িয়ে পড়ছে নদীতে। এছাড়া নদী তীরে রয়েছে অসংখ্য ঝুলন্ত পায়খানা। এসব ঝুলন্ত পায়খানা থেকে নির্গত মানব বর্জ্য, শত শত ড্রেন ও নালা-নর্দমা থেকে বেয়ে আসা ময়লা-আবর্জনা বিষাক্ত করে তুলছে নদীর পানিকে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, খুলনার তিনটি নদী দূষণের মূল কারণ হচ্ছে কেসিসির শত শত ড্রেন ও নালা-নর্দমার ময়লা-আবর্জনা ও দূষিত পানি নদীতে গিয়ে পড়া। পরিবেশ অধিদপ্তরের আশঙ্কা যেভাবে ময়লা-আবর্জনা এবং দূষিত পানি, বর্জ্য ও রাসায়নিক দ্রব্য প্রতিনিয়ত নদীগুলোতে পড়ছে তাতে নদীর পানি খুব বেশিদিন ব্যবহারের উপযোগী থাকবে না। সূত্রমতে, প্রতিমাসে পরিবেশ অধিদপ্তরের কেমিস্ট শাখা থেকে নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। এরমধ্যে রূপসা নদীর রূপসা ঘাট ও লবণচরা এবং ভৈরব নদীর চরেরহাট ও ফুলতলা অংশের পানি সংগ্রহের মাধ্যমে পরীক্ষা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ অধিদপ্তরের কেমিস্ট শাখার কর্মকর্তা সৈয়দ আহমদ কবির জানান, ওই নদী দুটির মধ্যে রূপসা নদীর পানিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। তিনি জানান, নদীর পানিতে সাড়ে ৪ মিলিগ্রামের ওপরে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা থাকতে হবে। রূপসা নদীতে জুন-জুলাই মাসে ৬-৭ মিলিগ্রাম পর্যন্ত অক্সিজেনের মাত্রা থাকে। তবে পানি প্রবাহের মাত্রা কমে গেলে দূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। ওই কর্মকর্তা বলেন, একটি বেসরকারি সংস্থা যশোর জেলার অভয়নগর থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত নদীর পানি দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করছে। তালিকাভুক্ত ওইসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে শীঘ্রই সতর্কীকরণ নোটিস দেয়া হবে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই খুলনায় নদী-খাল দখলের মহোত্সব চলছে। ইতিমধ্যে রূপসা ও ভৈরব নদীর দীর্ঘ ২২ কিলোমিটার তীরের ভূমির অধিকাংশ স্থান অবৈধ দখলদারদের কবলে চলে গেছে। হিমায়িত চিংড়ি রফতানিকারক কয়েকটি কারখানা, পাথর ভাঙ্গা প্রতিষ্ঠান, অসংখ্য দোকানপাট, বস্তি ও বাড়িঘর গড়ে উঠেছে নদীর দুই পাড় দখল করে। খুলনার সর্ববৃহত্ পাইকারি মোকাম ‘বড় বাজার’ এর একটি বড় অংশ দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট গড়ে তুলেছে ব্যবসায়ীরা।

বিআইডব্লিউটিএ ইতিপূর্বে একাধিক নদী দখলদারের তালিকা প্রস্তুত করে উচ্ছেদ অভিযানে নামার উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। ওই তালিকা অনুযায়ী রূপসা ও ভৈরব নদীর পাড়ে কমপক্ষে দুই শতাধিক অবৈধ দখলদার রয়েছে। নদীর দু’তীরে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারের সর্বোচ্চ জল রেখা থেকে ৫০ গজ ওপর পর্যন্ত জমি বিআইডব্লিউ¬টিএ’র। এসব জমিতে স্থাপনা গড়তে হলে তাদের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে নগরীর লবণচরা থেকে মজুদখালী পর্যন্ত রূপসা ও ভৈরব নদীর দুই তীরে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকা, আধাপাকা ও কাঁচা স্থাপনা। ময়ূর নদী দখল করে পাকা ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়েছে।

কাজিবাছা ও ময়ূর নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখল এবং নদীতে নানা বর্জ্য ফেলে নদীকে সংকুচিতসহ পানি দূষিত করা হচ্ছে। এছাড়া পলি ও বর্জ্য দ্বারা অব্যাহতভাবে নদী ভরাট হচ্ছে। ফলে নদীর গভীরতাও দিন দিন হরাস পাচ্ছে। কাজীবাছা নদী দখল করে মাছের ঘের, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা নির্মাণ এবং শুকনা মৌসুমে ধান চাষ করা হয়। জানা যায়, বিভিন্ন সময় অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য