শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি, পটুয়াখালী পৌরবাসীর দুর্ভোগ
- ২১:৪৭
- প্রধান প্রতিবেদন, বিশেষ প্রতিবেদন, সর্বশেষ
- ২২৬
মোঃ জাফর খান, পটুয়াখালী থেকে।। পটুয়াখালী শহররক্ষা বাঁধটি পৌরবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেয়া এবং ডিজাইন ক্রটিপূর্ণ হওয়ার কারণে এর সুফল থেকে পৌরবাসী বঞ্চিত। স্লুইসগেট খোলা ও বন্ধ করার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো লোক নেই। ফলে সময়মত এসব স্লুইসগেট দিয়ে পানি ওঠানো-নামানো যাচ্ছে না। এছাড়া শহররক্ষা বাঁধের কারণে শহরে জীববৈচিত্র্যে ব্যাপক নেতিবাচক পরিবর্তনও লক্ষ্য করা গেছে।
শহরের চকবাজার এলাকা প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। তাই পৌর শহরের পরিবেশ ঠিক রাখতে কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পটুয়াখালী জেলা শহরের চারদিক নদী বেষ্টিত। এ শহরের দক্ষিণে বহালগাছিয়া, পূর্বে লোহালিয়া, উত্তরে কচা ও পশ্চিমে পায়রা নদী। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ থেকে ভাদ্র এ চার মাসে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার ‘জো’র জোয়ারে শহরের এক তৃতীয়াংশ পানিতে ডুবে আর ভাটায় জাগে। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে ১৯৮২ সালে শহর রক্ষা বাঁধের প্রথম দাবি উঠে। ১৯৯৭ সালে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পটুয়াখালী এলে শহরবাসী শহররক্ষা বাঁধের দাবি তোলে। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি শহর রক্ষা বেড়িবাঁধ নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড এ প্রকল্পের অবকাঠামো কাজের গ্রহণযোগ্যতা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করে। ওই বছরই এপ্রিল মাসে পটুয়াখালী শহর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দাখিল করে।
পরবর্তীতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ১৭ কোটি ২৭ লাখ টাকার এক চেক লিস্ট প্রণয়ন করা হয় এবং ১৯৯৮ সালে ৮ আগস্ট তা দাখিল করা হয়। একই বছর আগস্ট মাসে পানি উন্নয়ন প্রকল্প ২ (এডিবি) পরিচালক এ প্রকল্পে ভৌত কাজের গ্রহণ যোগ্যতা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পটুয়াখালী আসেন। পরে নির্মাণ পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কিত বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, ডানিডা ও পৌরসভার সঙ্গে সিদ্ধান্ত মোতাবেক সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ব্যয় কমিয়ে ১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। ওই প্রকল্পের কাজের মধ্যে ছিল জমি অধিগ্রহণ ২ হেক্টর, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ৪ দশমিক ২০ কিলোমিটার, বন্যা নিরোধ দেয়াল দশমিক ৯০ কিলোমিটার, ড্রেনেজ স্লুইসগেট ৮টি, ড্রেনেজ আউটলেট ৩৮টি এবং পাম্প হাউস নির্মাণ ৪টি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড এ প্রকল্পটি অনুমোদন করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠান, মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হয়ে জমা পড়ে পরিকল্পনা কমিশনে। সেখানে আটকে যায় প্রকল্পটি। দীর্ঘদিন ফাইলটি আটক থাকার পর সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করে একটি প্যাকেজ প্রকল্পের আওতায় সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেয়া হয়। ২০০৪ সালের ২৯ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাক কাজে আশানুরূপ গতি পায়। পরবর্তীতে নতুন করে বর্তমান বাজার যাচাই করে এর ব্যয় ধরা হয় ২২ কোটি ১৯ লাখ টাকা। যা ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এ বছর জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও শেষ হয়নি শহরবাসীর দুর্ভোগ। এতে শহররক্ষা তো দূরের কথা, শহর রক্ষা বাঁধ এখন শহরবাসীর জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারের সময় ৩-৪ ঘণ্টা পানি উঠে থাকায় পৌরবাসীর স্বাভাবিক জীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ।
ভুক্তভোগী শহরের চরপাড়ার বাসিন্দা ও প্রেসক্লাব সভাপতি স্বপন ব্যানার্জি বলেন, শহর রক্ষা বাঁধ আমাদের কোনো কাজে আসেনি। বারবার বিষয়টি জেলা সমন্বয় কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয় এবং সমস্যার সমাধান করা না হলে পৌরবাসীর পক্ষ থেকে মামলা করার হুমকি দেয়া হলে ওই সভার সিদ্ধান্ত মতে জেলা প্রশাসক জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ দেলোয়ার হোসেন বলেন, এ ধরনের শহর রক্ষাবাঁধ তৈরি আমাদের কাছে নতুন, তাই কিছু ত্র”টি থাকতেই পারে। তাছাড়া পৌর শহরের সব ময়লা ড্রেন দিয়ে নেমে স্লুইসগেট ও তার ওয়ালের মাঝখানে আটকা পড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। যাতে ভবিষ্যতে এরকম না হয় তার জন্য এ বর্ষার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা থেকে শহরে পানি ওঠে। এজন্য আমরা বেশ কয়েকবার পোর্ট অফিসারকে চিঠি দিয়েছি, তাদের ভবনের নিচ দিয়ে যাতে পানি প্রবেশ না করে তার ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। কিন্তু তারা কোনো কার্যকরী ভূমিকা নিচ্ছে না।
