উপকূলের জেলে-জীবনে সংকটের শেষ নেই
- ০০:৫৯
- প্রধান প্রতিবেদন, বিশেষ প্রতিবেদন, সর্বশেষ
- ২২৪
নিজস্ব প্রতিবেদক॥ বঙ্গোপসাগরের লোনা জলের আঁছড়ে পড়া ঢেউ ভেঙ্গে যারা রূপালী ইলিশ ধরে— সেই জেলেদের জীবন এখন নানামুখী সংকটে বিপন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের আকাল আর ঝড়-ঝঞ্ঝাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলে পরিবারগুলোতে এখন আর আনন্দ-উচ্ছ্বাস নেই। এর উপর রয়েছে জলদস্যুদের তাণ্ডব আর মহাজনদের দৌরাত্ম্য। প্রতিনিয়ত দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে জর্জরিত উপকূলের জেলে পরিবারগুলোর ঋণের বোঝা তাই বেড়েই চলছে। ঝড়ের কবলে পড়ে জীবন হারানোর মতো ঝুঁকি নিয়েই বেঁচে আছে উপকূলের লাখ লাখ জেলে।
যেমন কাটছে ওদের জীবন
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরবর্তী সমুদ্রের কূল ঘেঁষে এক সময় যে চরটি জেগে উঠেছিল তার নামই পদ্মা। জেলে পল¬ীর পাশাপাশি ইলিশ বেচাকেনার জন্য সেখানে গড়ে উঠেছে একটি মিনি মার্কেট। চরে বসত গেড়েছে শত শত জেলে পরিবার। এদেরই একজন শাহ আলম মাঝি। ৪ সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে যে ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে তিনি বসত গড়েছেন, তার অধিকাংশই দখল করে আছে জাল ও মাছ ধরার বিভিন্ন সামগ্রী। ছোট্ট একটি চৌকির উপরে ৬ জনে মিলে কোন রকম রাত কাটান। জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে সাগরে আসা-যাওয়া করেন। যখনই মহাজনের ডাক আসে তখনই নৌকা কিংবা ট্রলার নিয়ে ছোটেন গভীর সমুদ্রে। ঘরে ফিরে আসার মনোবাসনা নিয়ে সাগরে গেলেও অনেকেরই আর ফেরা হয় না। দেখা হয় না প্রিয় সন্তান, স্ত্রী কিংবা বাবা-মায়ের মুখ। ২০০৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গোপসগারে যে সামুদ্রিক ঝড় হয়েছিলো তাতে প্রাণ হারিয়েছিলো এই জেলে পল¬ীর ১৩ জন জেলে। সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি এখনো তাড়া করে জেলে ছগির হোসেনকে।
পাথরঘাটার পদ্মা, জ্ঞানপাড়া ও জীনতলার মানুষ জšে§র পরই সাগরের সাথে নিবিড় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। শুধু পাথরঘাটা নয়, ভোলার মনপুরাকে বলা হয় মত্স্য সম্পদের প্রাণকেন্দ্র। চরফ্যাশন, ঢালচর, চর কুকরি-মুকির, চর জহিরউদ্দিন, চর পাতিলা, বঙ্গের চর ও হিজলা উপজেলার মেঘনার তীর ঘেঁষে মত্স্য পেশার সাথে যারা জড়িত তাদের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এদের মধ্যে ৬ থেকে ৭ লাখ আদম সন্তান সরাসরি ইলিশ শিকারের সাথে যুক্ত। বাকিরা মত্স্য শ্রমিক, পাইকার, আড়তদার ও দাদনদার। চরফ্যাশন উপজেলার চর কলমি পন্টুনে দাঁড়ালে তেঁতুলিয়া, বুড়াগৌরাঙ্গা নদী থেকে পটুয়াখালীর গলাচিপা পর্যন্ত বিশাল নদীর যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই সারিবদ্ধ ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের বহর দেখা যায়। শত শত সারিবদ্ধ ট্রলার ছুটে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের দিকে। চাল-ডাল সঙ্গে নিয়ে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে চেপে হাজার হাজার জেলে হারিয়ে যায় গভীর বঙ্গোপসাগরে। বেতারবার্তায় যখন ঝড়ের আভাস পায় তখন আর তারা তীরে ফেরার সুযোগ পায় না। লাশ হতে হয় তাদের। দাফনের ভাগ্যও জোটে না। এদের বৌ-ছেলেমেয়েরা তীরে অপেক্ষা করে দিন কাটায়। সাগরের বিশাল ঢেউয়ের শব্দে চাপা পড়ে যায় তাদের কান্না। প্রিয়জন হারানোর শোক ভুলে নিজেরাই এ পেশা বেছে নেয় অভাবের তাড়নায়। পেশার পরিবর্তন হয় না। ভাগ্যও বদলায় না। মরে গেলে সাগর তীরে তাদের সমাধি হয়। নদী ভাঙ্গনে হারিয়ে যায় সেই সমাধি। বাপ-দাদার কবর জিয়ারতের সুযোগটি পর্যন্ত পায় না জেলেরা।
স্বাধীনতার পর দক্ষিণাঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু অসহায় জেলেদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। জেলেদের আহরণ করা মাছ বিদেশে রপ্তানি করে যেসব ব্যবসায়ী কোটিপতি হয়েছেন, তারাও এদের ব্যাপারে উদাসীন। ঢাকা মুন্সীগঞ্জ কিংবা বরিশাল থেকে পাথরঘাটায় গিয়ে দাদনের ব্যবসা করেন— এ রকম ব্যবসায়ী রয়েছেন অনেক। তারা একের পর এক বরফকল তৈরী করে ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন; কিন্তু জেলে পল¬ীগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই।
এনজিও ঋণ ও দাদন খুবলে খাচ্ছে ওদের
এনজিওর ঋণ ও দাদন নামের অভিশাপ অথবা করুণার যাঁতাকলে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে উপকূলের জেলে জীবন। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সাগর কিংবা নদীতে ইলিশ থাকে না। আবার মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত উপকূলের মত্স্য অভয়ারণ্যগুলোতে ইলিশ শিকার বন্ধ থাকে। বছরের বিশাল এই সময় জেলে পাড়াগুলোতে চলে দুর্দিন। এ সুযোগটি বেছে নেয় দাদন ব্যবসায়ী মহাজনরা। খেয়ে-পরে বাঁচার জন্য এসময় চড়া সুদে এনজিওর কাছ থেকেও ঋণ নেয় জেলেরা। স্ত্রী-কন্যার মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে নিরুপায় জেলেরা এ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অপেক্ষা করে মৌসুমের। জুন মাসের শুরুতে বর্ষা ও জোয়ারের পানি দেখে আশায় বুক বাঁধে জেলে পরিবারগুলো। অনেকের ৮/১০ বছরের শিশু পুত্র দিনরাত উপেক্ষা করে বাঁচা-মরা লড়াইয়ে সামিল হয়। জালের ফাঁকে ইলিশ আটকালেও ভাগ্যের ফাঁক দিয়ে সেই ইলিশ চলে যায় মহাজনের মোকামে। ইলিশ ভর্তি জেলে নৌকা ঘাটে ভিড়ানোর সাথে সাথে বাজ পাখির মত ছোঁ মারে মহাজনের লোকেরা। দরদাম ঠিক হয় মহাজনের ইচ্ছানুযায়ী। প্রতিবাদের শক্তি নেই জেলেদের। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখে। দাদনের হিসাব চেয়ে কোনো জেলে প্রতিবাদ করলে মহাজনরা শহরের কর্তাব্যক্তিদের নিয়ে এসে অবৈধ কারেন্ট জাল ব্যবহারের অভিযোগে জেলেদের শেষ সম্বল জালটাও পুড়িয়ে দেয়। এনজিওদের ঋণ ইলিশ মৌসুমে সুদে-আসলে পরিশোধ না করলে খাটতে হয় জেল। মহাজনের দাদনের টাকা ও এনজিওদের চড়া সুদের ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অনেক জেলে।
জলদস্যুর তাণ্ডব
মহাজন, বন্যা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের চেয়েও জেলেদের কাছে ভয়ংকর রুদ্রমূর্তি হচ্ছে জলদস্যু। পাথরঘাটার জেলে জসীমউদ্দিন জানায়, ঝড়-বন্যার তবুও আলামত পাওয়া যায়, ডাকাতের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। হঠাত্ এসে এরা কেড়ে নেয় জেলেদের সর্বস্ব। মত্স্য শিকারে যাবার পর স্বামীর চিন্তায় ঘুমায় না আজিমোন। আকাশে মেঘ নেই, গাঙ্গে বানের কিংবা তুফানের আলামত নেই। তবুও তার উত্কণ্ঠা। না জানি কখন হানা দেয়ে জলদস্যু। কেড়ে নেয় তাদের সবকিছু। জাল-বৈঠা নিয়ে ক্ষান্ত হবে তো। নাকি তার স্বামীকে মারধর করে গাঙ্গে ফেলে দেবে। পাথরঘাটা উপকূলের এ চিন্তা শুধু আজিমোনের নয়। ভোলার দৌলতখানের বেড়ীবাঁধ থেকে শুরু করে দশমিনার জেলে পল¬ীর সকল বৌ-এর একই দুশ্চিন্তা।
বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারীদের পাশাপাশি ঘুরে বেড়ায় একদল হায়না। এ হিংস্র দানবদের জেলেরা জলদস্যু কিংবা ডাকাত নামেই চেনে। রাজু বাহিনী, জুলফিকার ও জুলফ বাহিনীসহ অসংখ্য জলদস্যু বাহিনী সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে ঘাঁটি গেড়ে আছে। মেঘনা-তেঁতুলিয়ায় ভুট্টো বাহিনীসহ তজুমদ্দিন ও কালকিনিতে রয়েছে একাধিক জলদস্যু বাহিনী। অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে এরা নৌ পথে চলাচল করে। জেলেদের জাল, নৌকা এমনকি শিকার করা ইলিশ ও ট্রলারের ইঞ্জিন পর্যন্ত এরা খুলে নিয়ে যায়। কখনো কখনো জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
পুলিশ ও বনকর্মীদের চাঁদাবাজি
সমুদ্র থেকে মাছ ধরে ফেরার পথে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ, বন বিভাগের কর্মী ও চাঁদাবাজদের হয়রানির শিকার হয় জেলেরা। মোরেলগঞ্জ, মংলা, নলি, শরণখোলা, পাথরঘাটা, নেয়ামতি, চর মোন্তাজ ও রায়ন্দাসহ বেশ কিছু পয়েন্টে পুলিশকে প্রতি ট্রিপে ট্রলার ও বনকর্মীদের ২০ টাকা হারে চাঁদা দিতে হয়। যে অঞ্চলে জেলেরা মাছ ধরতে যায় সে অঞ্চলের বন বিভাগ থেকে পাস সংগ্রহ করার নিয়ম রয়েছে। সরকারি নিয়মানুসারে এক সপ্তাহ মাছ ধরা বাবদ বন বিভাগের সীমানায় মাছ ধরতে ২২৫ টাকা ও প্রতি মণ মাছের জন্য ৭৫ টাকা পরিশোধ করতে হয়; কিন্তু এর বাইরেও উেকাচ দিতে হয়। এমনকি কখনো কখনো পুলিশ কিংবা বন কর্মকর্তার পছন্দের মাছটি তাদের হাতে তুলে দিতে হয়।
