বিধ্বস্ত লালুয়ার বুকে সবুজের সমারোহ

7-23-11-13-rupgonj_vegetable-field-11-copy.jpgমেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া।। লালুয়া ইউনিয়নের চিরচেনা বিবর্ণ, ধূসর বর্ণের মাঠ ঢেকে গেছে সবুজের আস্তরণে। বোরো, ইরি, তরমুজ, খেসারি, মুগ, ফেলন, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ধরনের ফসলে মাঠ রয়েছে পরিপূর্ণ। সিডরবিধ্বস্ত লালুয়ার জনপদে দীর্ঘ বছর বেকার থাকা কৃষক যেন তার ব্যস্ত থাকার জায়গাটি এ বছর ফিরে পেয়েছে। তারা ব্যস্ত রয়েছে স্বকর্মের মধ্যে। এসব কৃষকের মধ্যে ফিরে এসেছে প্রাণের স্পন্দন। লোকসানের বোঝা গুনতে গুনতে ধার-দেনায় কাহিল এই মানুষগুলো আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কেউ কেউ আবার উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করে লাভের মুখ দেখতে পেয়ে রয়েছেন স্বস্তিতে। লালুয়ার মঞ্জুপাড়া, চান্দুপাড়া, ছকানি, বানাতিপাড়া, চারিপাড়া, পশুরবুনিয়া, চিঙ্গরিয়া গ্রামজুড়ে দেখা গেছে কৃষকের সাফল্যের চিত্র।
সরেজমিনে না দেখলে বোঝার উপায় নেই যে কৃষক তাদের কর্মের স্থানটি খুঁজে পেলে কতটা নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। আর এসব সাফল্যের সবটুকু সম্ভব হয়েছে শুধু স্লুইস সংযুক্ত খালে মিঠাপানি সংগ্রহের কারণে। যুগের পর যুগ ধরে লালুয়ার অধিকাংশ স্লুইস সংযুক্ত খালে থাকত লোনা পানি। ফলে কৃষক তাদের ইচ্ছা থাকলেও সেচের পানি না থাকায় ফলাতে পারত না কোন ধরনের রবিশস্য কিংবা বোরো। কিন্তু এ বছর কৃষক ইউনিয়ন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে সাগর কিংবা নদীর পানি লোনা হওয়ার আগেই লালুয়ার সব ক’টি খালের অগ্রভাগে বাঁধ দেয়। সংরক্ষণ করে মিঠা পানি। আর সংগৃহীত এই পানি ব্যবহার করে এখন বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলিয়েছেন। কৃষক পেয়েছে বাড়তি ফসল উৎপাদনের সুযোগ। মাত্র একটি ফসল আমননির্ভর এসব কৃষক এখন ফলাচ্ছেন বাড়তি ফসল।
লালুয়ার মঞ্জুপাড়া গ্রামের কৃষক মুসা গাজী জানান, তিনি এ বছর ১৬ বিঘা জমিতে খেসারি, ফেলন ডাল, ভুট্টা ও বোরোর আবাদ করেছেন। প্রায় কুড়ি হাজার টাকা খরচ হয় তার। ডাল জাতীয় শস্যের কয়েক মণ ফলন ও কিছু পরিমাণ ভুট্টা বিক্রি করে নয় হাজার টাকা পেয়েছেন। এখনও ধান পাকেনি। অন্তত খরচের দ্বিগুণ অর্থ পাবেন নিশ্চিত করে বললেন এই কৃষক। একই কথা জানালেন, ওখানকার শাহ আলম গাজী, আব্বাস গাজী, আলতাফ হাওলাদার, ইউনুস হাওলাদার, মোশাররফ। সবাই জানালেন, তারা ৭৩ কৃষক ৫২ একর জমিতে সমন্বিতভাবে এসব আবাদ করেছেন। ছ’কানির খালটিতে স্লুইসের সামনে বাঁধ দেয়ার কারণে মিঠা পানি সংগ্রহ করতে পারায় তাদের পক্ষে শুকনো মৌসুমে এসব ফসল ফলানো সম্ভব হয়েছে। এই খালটিতে বাঁধ দেয়ার কারণে মঞ্জুপাড়া, চান্দুপাড়া গ্রামের তিন শতাধিক কৃষক পরিবার রবিশস্য ফলানোর পাশাপাশি গবাদি পশুকে খাওয়ানোর এবং গৃহস্থালীর কাজে মিঠা পানি ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। একই দৃশ্য বানাতিপাড়ার স্লুইসটির সামনের খালে বাঁধ দেয়ার কারণে। সেখানকার বানাতিপাড়া ও চারিপাড়া গ্রামের কৃষক বোরো, তরমুজ ও ডাল জাতীয় শস্য উৎপাদন করেছে। তারা জানালেন, এক এক করে দু’টি বাঁধ দিয়েছেন মিঠা পানি সংগ্রহের জন্য। সেখানকার সচেতন এক কৃষাণী হাওয়া বেগম জানালেন, রবিশস্য ফলানো ছাড়াও গ্রামের কৃষক রান্নাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য মিঠা পানি পেয়েছে। গবাদি পশু নিয়েও বিপাকে পড়তে হয়নি এ বছর। তরমুজ ফলানো কৃষক শওকত সাউগার, জামাল সাউগার, নাসির সাউগার, ওয়াজেদ প্যাদা জানালেন, শুধুমাত্র শুকনো মৌসুমে মিঠা পানি সংগ্রহের সুযোগ থাকলে কৃষকের আর কোন ধরনের সহায়তার প্রয়োজন নেই।
গলাচিপার পানপট্টি এলাকা থেকে চিঙ্গরিয়া গ্রামে এসে ৭২ বিঘা জমি একসনা ভিত্তিতে কিনে তরমুজের আবাদ করেছেন শফিকুল ইসলাম। জমির দাম, শ্রমিকের মজুরি, সেচ, বীজসহ সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় নয় লাখ টাকা খরচ হয়েছে তার। কৃষি প্রজেক্টের দায়িত্বে নিয়োজিত বাবুল ফকির জানালেন, আর ৫-৭ দিন পরে ফলন বিক্রি করতে পারবেন। কিছু তরমুজ প্রায় পাঁচ কেজি ওজন হয়েছে। ২৪ বিঘার তরমুজ বিক্রি উপযোগী হয়েছে। অন্তত ৫০ হাজার গাছ রয়েছে এই প্রজেক্টে। সংলগ্ন পশুর বুনিয়া স্লুইস সংযুক্ত খালে বাঁধ দিয়ে এসব আবাদ করা হয়েছে। এদের দেখাদেখি আশপাশের কৃষক আরও প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে তরমুজসহ ডাল জাতীয় শস্যের আবাদ করেছেন। চিঙ্গরিয়া ও পশুরবুনিয়া গ্রামের মাঝখানের বিলে এখন সবুজের আস্তরণে ঢেকে গেছে মাঠ। এসব দেখে এলাকার অধিকাংশ কৃষক জানালেন, এ বছর তারা কিছু কিছু আবাদ করেছেন। আগামী বছর ব্যাপকভাবে আবাদের লক্ষ্য তাদের। কিন্তু সবশ্রেণীর কৃষকের দাবি একটাই যেন স্লুইস সংযুক্ত খালে আগেভাগেই বাঁধ দেয়া হয়। মিঠা পানি সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে তাদের আর কিছুই দরকার নেই। লালুয়ার ইউপি চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম জানালেন, জলবায়ু পরিবর্তনে অভিযোজনের জন্য খালে মিষ্টি পানি সংরক্ষণ এবং বোরো ও রবিশস্য চাষ সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে লালুয়া ইউনিয়ন পরিষদ, কলাপাড়া উপজেলা ও সিবিএ-এলজি প্রকল্প, একশনএইড বাংলাদেশ এ বছর তাদের ইউনিয়নের অধিকাংশ স্লুইস সংযুক্ত খালের অগ্রভাগে মিঠাপানি সংগ্রহের জন্য বাঁধ দেয়ার সহায়তা করে। এছাড়া বোরো এবং বিভিন্ন ধরনের রবিশস্য ফলাতে কৃষককে বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করা হয়। কৃষকসহ শ্রমজীবী ও প্রান্তিক কৃষকের সারা বছর আয় নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি। ওই এলাকায় আবাদযোগ্য জমি যা পূর্বে লবণাক্ততার কারণে অনাবাদী ছিল তা আবাদের আওতায় আনা। এসব লক্ষ্যে একশনএইড কলাপাড়ায় কাজ করছে বলে জানালেন, সংস্থার এ্যাসিয়েট কো-অর্ডিনেটর এসএমএ রকিব। এছাড়া স্লুইস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি করে মনিটরিং কমিটিও গঠন করা হয়। এতকিছুর পরও কৃষকের শঙ্কা কাটছে না লোনা পানির আতঙ্কে। যতক্ষণ, যতবার কৃষকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে তখনই তাদের মন্তব্য খালে মিঠা পানি থাকার ব্যবস্থা করলে আর কিছুই লাগবে না।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য