কোম্পানিগঞ্জের চরাঞ্চলে কৃষকের ধান লুট অব্যাহত, সর্বশান্ত শতাধিক কৃষক

rice600x400.jpgসুমন ভৌমিক, কোম্পানিগঞ্জ, নোয়াখালী।। কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার চরাঞ্চলে কৃষকদের আমন ধান লুট অব্যাহত রয়েছে। গত বিশ দিনে প্রায় ১৫ হাজার মণ ধান লুট করেছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার উড়িরচরের চিহ্নিত জলদস্যু শাহদাত হোসেন ওরফে জাসু বাহিনীর সদস্যরা। এর মধ্যে বেশিরভাগ ধান প্রকাশ্যে দিবালোকেই লুট হয়েছে। এ বিষয়ে থানায় লিখিত ও মৌখিক একাধিক অভিযোগ দিলেও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি পুলিশ প্রশাসন, অভিযোগ করছে ভূক্তভোগী কৃষকরা।
এ ছাড়া গত ২০ নভেম্বর চলমান নোয়াখালীসহ একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় ধান লুটের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বললেও উল্টো ধান লুট অব্যাহত রেখেছে বাহিনীরা। তবে; কোম্পানিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলছেন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নিজেই দস্যুদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সহসা কোম্পানীগঞ্জের চরাঞ্চলে পুলিশের স্পেশাল ফোর্সের ক্যাম্প করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৮ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর উমেদ গ্রামের চার খালের ঘাট এলাকা থেকে বিভিন্ন কৃষকের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মণ ধান লুট করে দস্যুরা। এ ঘটনায় বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও কোন প্রতিকার পায়নি কৃষকরা। উল্টো গত ২০ তারিখ থেকে সোমবার পর্যন্ত আরও প্রায় ছয় হাজার মণ ধান লুটে নিয়েছে তারা। সাড়ে তিন হাজার মণ ধান লুটের ঘটনায় একাধিক কৃষক বাদি হয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানায় অভিযোগ দিয়েছে। কিন্তু দস্যুদের অপতৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। গত ২০ নভেম্বর থেকে চর এলাহী গ্রামের বাসিন্দা স্বপনের ১৫০০ মণ, রেনু চেয়ারম্যানের ৪০০ মণ, আবুল কালামের ২০০ মণ, হেদায়েত উল্যার ৯০০ মণ, মাহাফুজুর রহমানের ৩০০ মণ, নূর নবীর পুনরায় ৮০০ মণ, শহীদ উল্যা সবুজের ২০০ মণ, শহীদ উদ্দিন বাবুলের ২৫০ মণ, খালেক মিয়ার ৩০০ মণ, হানিফ চেয়ারম্যানের ৬০০ মণ, নবী মিয়ার ৬০০ মণ, বশির উল্যার পুনরায় ২০০ মণসহ প্রায় সাত হাজার মণ ধান পুনরায় লুটেছে জাসু বাহিনীর দস্যুরা। গত ২০ দিনে এ নিয়ে প্রায় ১৫ হাজার মণ ধান লুট হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন ভূক্তভোগী কৃষকরা। দফায় দফায় ধান লুটের ঘটনায় কৃষকরা পুলিশ প্রশাসনের দারস্ত হলেও সুফল বয়ে আনেনি তাদের।
আবুল কালাম (৯০) (লাডিআলা বুড়িয়া) জানান, গত ১৯ তারিখ তাঁর স্ত্রী মারা যায়। তখন তিনি ছিলেন চর রমজান এলাকায়। সেখানে তাঁর চাষকৃত বর্গা জমির ধান তুলতে যান। স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ শুনেও বাড়ি ফিরে আসেন নি। দস্যুদের হাত থেকে নিজের ধান বাঁচাতে। কিন্তু বড় নিষ্ঠুর দস্যুরা। ২০ নভেম্বর ধান নিয়ে নদীর পাড়ে আসামাত্র ২০০ মণ ধান অস্ত্রের মুখে নিয়ে যায় দস্যুরা। শেষ দেখা হলো না স্ত্রীর সাথে। কবরে এক মুঠো মাটিও দিতে পারেনি। এসব বলতে বলতে কেঁদে ফেলল আবুল কালাম। হারিয়েছে স্ত্রী, সর্বশেষ যে ধানের জন্য কয়েকটি মাস অপেক্ষায় ছিল সে ধানও ঘরে তোলা হলো না তাঁর। এক দিকে স্ত্রী ও ধান হারানোর শোক, অপর দিকে সুদের টাকা কিভাবে দিবে সে চিন্তায় এখন দিশেহারা এ বৃদ্ধ কৃষক।
সফল কৃষক ও সাবেক চেয়ারম্যান হানিফ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, প্রতিবছর আমন মৌসুমে কৃষকদের হয়রানী করছে জাসু বাহিনী। তবে এ মৌসুমে তথা এ বছর ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে বাহিনীরা। প্রতি বছর আমন মৌসুমে কিছু চাঁদা নিয়ে চলে যেত। এবার চাঁদা ও ধান দুটোই নিয়েছে তারা। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে চরাঞ্চলে কৃষকরা আর ধান বা অন্য কোন শস্য চাষ করবে না। তাই কর্তৃপক্ষ যত দ্রুত সম্ভব এ দস্যুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এমন প্রত্যাশা এ কৃষকসহ স্থানীয় অর্ধশতাধিক কৃষকের।
জানা যায়, জলদস্যু জাসু বাহিনীর নিজস্ব ট্রলার ও অস্ত্রধারী বাহিনী দিয়ে নদীতে দস্যুতা ছাড়াও দুর্গম ওইসব চরে বসবাসকারী এবং চাষাবাদকারী চাষীদের উপর প্রতিনিয়ত হামলা-নির্যাতনসহ বিভিন্ন অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। জাসুর বিরুদ্ধে কোম্পানীগঞ্জ ও সন্দ্বীপ থানায় বেশকয়েকটি মামলাও রয়েছে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নোয়াখালী পুলিশ সুপার মো. আনিসুর রহমান পিপিএম বলেন, এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বলা হবে। তিনি এ প্রতিবেদককে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলেন।
এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ধান লুটের ঘটনা ও জাসু বাহিনীর অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণের জন্য যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-মহা-পুলিশ পরিদর্শকের (ডিআইজি) উদ্যোগে সহসায় ওই দুর্গম চরাঞ্চলে স্পেশাল পুলিশ ফোর্সের একটি ক্যাম্প করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ওই চরাঞ্চলে স্পেশাল ফোর্সের ক্যাম্প করা গেলে জাসু বাহিনীর দৌরাত্ম কমবে বলে তিনি মনে করেন।  source : চলমান নোয়াখালী

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য