দৃষ্টি পুব আকাশে, পুণ্যার্থীদের প্রতিক্ষার শেষ নেই
- ১৪:৩২
- ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সর্বশেষ
- ২৪৮
মেজবাহউদ্দিন মাননু, কুয়াকাটা।। সব ভক্তের দৃষ্টি যেন পুব আকাশের দিকে। একমনে একই ধ্যানে সবার প্রতিক্ষা, কখন সূর্য উঁিক দেয়। পুণ্যার্থীদের এই প্রতিক্ষার যেন শেষ নেই। রক্তিম লাল আভা ছড়ানো সূর্য বিশাল সাগরের জলরাশির বুক চিরে আলো দিতেই উলুধ্বনিতে সরগম হয়ে যায় প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সাগরপার। ব্যস্ত হয়ে পড়েন পুঁজোয়। এরা কেউ নয় হাজার হাজার রাসভক্ত নর-নারী। সাগরে পুণ্য¯œানে নেমে পড়েন এসব পুণ্যার্থী। শুধু নিজেই নয়, স্বামী-সন্তান থেকে পরিবারের সকলকে নিয়েই আসেন হাজারো পরিবারের গৃহকর্ত্রী। সারা বছরের পঙ্কিলতা দুর হয়ে যায়- এমন অন্ধ বিশ্বাস নিয়েই প্রতি বছরের মতো এবছরও হাজার হাজার রাসভক্ত পুণ্যার্থী মিলিত হয়েছে কুয়াকাটা সৈকতে। রাতভর এই ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা রাসভক্ত পূণ্যার্থীর। কুয়াশায় ঢাকা রবিবার প্রত্যুষের এই দৃশ্য সকল শ্রেণীর মানুষকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। শীত উপেক্ষা করে পুর্ণিমার এই তিথিতে ভক্তদের সমাগমে গোটা কুয়াকাটা সৈকত মুখরিত হয়ে যায়। শনিবার রাতভর এসব পুণ্যার্থী কুয়াকাটা রাধাকৃষ্ণ মন্দির ও তীর্থযাত্রী সেবাশ্রম প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় রীতিতে অংশ গ্রহণ করেন। রাতভর একমনে চলে সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য পাওয়ার চেষ্টা। দক্ষিণ উপকূলের শত বছরের ঐতিহ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের এই রাস মেলা এখন পরিণত হয়েছে সার্বজনীন উৎসবে। শনিবার রাতে এবছরের রাস উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রবিবার প্রত্যুষে পুণ্য¯œান শেষে এসব দর্শনার্থী কলাপাড়া পৌর শহরের মদন মোহন সেবাশ্রমে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মিলিত হয়। রাস উৎসব নির্বিঘেœ উদযাপনে কলাপাড়া পৌর শহরের মদন মোহন সেবাশ্রমে প্রতিবছরের মতো এবছরও পাঁচদিনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গনে হাজার হাজার রাসভক্ত ¯œান শেষে রাধাকৃষ্ণের যুগল প্রতিমা প্রতি দর্শন করবেন। এলক্ষ্যে ১৭ জোড়া যুগল প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে। মন্দির প্রাঙ্গনে বসেছে রাসমেলা। ইতোমধ্যে শত শত দোকানি তাদের দোকান সাজিয়েছে। মেলা প্রাঙ্গন ছাড়াও আশপাশের রাস্তায় বসেছে অসংখ্য দোকানপাট। ইতোমধ্যেই কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন শান্তিপুর্ণভাবে রাসউৎসব উদযাপনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। রয়েছে র্যাব পুলিশের সমন্বয়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাস উদযাপন কমিটির উদ্যোগে আগত ভক্তের জন্য নেয়া রাতের খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা। থাকছে সুপেয় পানির ব্যবস্থা। রাস উৎসবকে ঘিরে শুধু হিন্দুরা নয়, ভিন্ন ধর্মের মানুষও এই উৎসবে মিলিত হন। এই দিনের অপেক্ষায় থাকেন কুয়াকাটার হোটেল-মোটেল মালিকসহ সকল ব্যবসায়ী। মানুষের ভিড়কে কেন্দ্র করে চলে রমরমা ব্যবসা। ব্যবসার পসরা সাজায় শত শত নতুন, অস্থায়ী দোকানি। কিন্তু এ বছর রাসকে কেন্দ্র করে আয়োজকসহ ব্যবসায়ীদের মনে রয়েছে নানান শঙ্কা। হরতালসহ সারা দেশে রাজনৈতি সহিংসতা এ বছরের রাস উৎসবকে অনেকটা ম্লান করে দিয়েছে। রাস ভক্তদের উপস্থিতি ছিল অনেক কম। রাস উৎসব নির্বিঘেœ সম্পন্নের জন্য ইতোমধ্যে আয়োজকরা সংবাদ সম্মেলনে তাদের উৎকন্ঠার কথা উল্লেখ করে বিরোধী দলীয় নেত্রীর কাছে হরতাল প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। হিন্দু ধর্মীয় মতে, দাপরযুগে কংশ রাজার অত্যাচারে যখন মানবকুল অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল তখন সৃষ্টিকর্তার নির্দেশনায় অত্যাচারী রাজার হাত থেকে মানব জাতিকে রক্ষা করতে স্বর্য় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই ধরাধামে আবির্ভূত হন। শ্রীকৃষ্ণের অলৌকিক ক্ষমতাবলে কংস রাজাকে বধ করে মানবকুলকে রক্ষা করেন। পরবর্তীতে মানুষের মধ্যে হিংসা, হানাহানি, বিদ্বেষ মোচনের লক্ষ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সুদৃঢ় করতে শ্রীকৃষ্ণ রাধাকে নিয়ে বৃন্দাবনের তমাল ও কদমকুঞ্জে পূর্ণিমার এই তিথিতে নিষ্কাম প্রেমে মিলিত হয়ে এক উপাখ্যানের রচনা করেন। যা তখন থেকে রাসউৎবে পরিণত হয়। মদন মোহন সেবাশ্রমের সভাপতি ও রাস উদযাপন কমিটির সভাপতি বিপুল হাওলাদার জানান, ১৯২৭ সালে সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠাকালীণ থেকেই রাস উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। অগ্রহায়ন মাসের পূর্ণিমার তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় রাস উৎসব।
