এতিম তিন শিশু নিয়ে বিপাকে বৃদ্ধা জয়নব

joynob.bmpএম কে রাজু, কলাপাড়া, পটুয়াখালী।। তিনটি শিশু নিয়ে রাস্তাই এখন জয়নব বিবির(৬০) সংসার। অন্যের ঘরে বৃদ্ধ অসুস্থ্য স্বামীকে রেখে এতিম তিন নাতি-নাতনীকে পড়া লেখা শিখিয়ে মানুষ করা ও তাদের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে এখন গ্রামে গ্রামে ভিক্ষার জন্য ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ডালবুগঞ্জ ইউনিয়নের খাপড়াভাঙ্গা গ্রামের বৃদ্ধা জয়নব তার মৃত ছেলের স্বপ্নপূরন করতে শুরু করেছে নতুন সংগ্রাম। দুই বছর আগেও ছেলে জাকির হোসেন, পুত্রবধু রোকসনা ও তাদের তিন সন্তান ঝুমুর(৮), রিফাত(৫),কাকলী(৪)এবং স্বামী জয়নাল ফকিরকে নিয়ে হাসিখুশি ও সুখের সংসার ছিল জয়নবের। কিন্তু বড় ছেলে জাকিরের অকাল মৃত্যুতে তাদের এ সংসারে দেখাদেয় ঘোর অমানিশা। স্বামীর মৃত্যুর এক মাসের মধ্যে তিন সন্তানকে দাদীর কাছে ফেলে রেখে স্ত্রী রোকসনা এখন অন্যের সংসারের স্ত্রী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনের সন্তানকে হারিয়ে চোখের পানি ফেলারও সময় পায়নি জয়নব। নিজের অসুস্থ্য স্বামী ও তিন নাতি-নাতণীকে বাঁচাতে এ বৃদ্ধ বয়সে মাটি কাটা থেকে শুরু করে শ্রমবিক্রি। কিন্তু বয়ষের ভারে ভারি কাজ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত থালা হাতে এখন ভিক্ষাই তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। জয়নব বিবি জানায়“মোর পোলা মইর‌্যা গ্যাছে। কিন্তু হ্যার রক্ত তো মোর ঘরে। অগো মায় তিনডা পোলা মাইয়ারে পাষানের মতো ফালাইয়া গ্যাছে। কিন্তু মুই ফালামু ক্যামনে। সে জানায় যতোদিন মুই বাইচ্চা আছি মোরতো অগো টানাই লাগবো। সারদিন ভিক্ষা করে যে চাল পায় তা বিক্রি করেই এ বৃদ্ধা তিনটি এতিম শিশুকে লেখাপড়ার খরচ সহ তাদের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দেয়ার চেষ্টা করছে সে। বড় নাতনী ঝুমুর দ্বিতীয় শ্রেনীতে এবং রিফাত ও কাকলী প্রথম শ্রেনীতে পড়ে। যখন স্কুল বন্ধ থাকেও তারা দাদির সাথে বের হয় রাস্তায়। ঈদের আগের দিন সকালে কথা হয় তার ছোট নাতণী কাকলীর সাথে। সে জানায়“ মোর আব্বু এ্যামন ঘুমান ঘুমাইছে এ্যাহন আর আয় না। আমাগো আর মজা কিইন্নাও দেয়না, নুতান জামাও দেয়না। মায়ও আয় না। দাদি না থাকলে মোরা কই থাহুম।” মা ও বাবার মুখও মনে নেই তার। বড় নাতনী ঝুমুর জানায়“ মোরা তো স্কুলে যাই কিন্তু স্কুলে যাওয়ার জামাও নাই। রাস্তায় হালাইয়া দেওয়া কাগজ টোকাইয়া যে কাগজে ল্যাহা নাই হেইয়া সেলাই কইর‌্যা এ্যাহন বাসায় বইয়া লেহি। দাদি আর আমাগো কত দ্যাখবে কন। ঠিক কবে বাসায় মাছ মাংস রান্না হইছে তা মনে নেই এই তিন এতিম শিশুর। আজ সকালে কি দিয়ে ভাত খেয়েছো জিজ্ঞাসা করলে হাসি মাখামুখে তাদের সরল উত্তর মরিচ আর লবন দিয়া। এইয়াই তো রোজ খাই। এ তিন শিশুরই লেখাপড়ার আগ্রহ থাকলেও দারিদ্রতার কারনে এখন স্কুল বন্ধ করে দাদির সাথে রাস্তায় নামতে হয়েছে দু’মুঠো ভাতের জন্য। বৃদ্ধা জয়নব জানায়“ মোর পোলার স্বপ্ন আছিল তার পোলা মাইয়াগো ল্যাহাপড়া করাইবে। হেতো মইর‌্যা গ্যাছে। আমি যতোদিন বাইচ্চা আছি পোলাডার স্বপ্নডারে বাঁচাইয়া রাহার চেষ্টা করমু। গত ঝড়ে মোর ঘরডাও পইড়্যা গ্যাছে। এ্যাহন ওগো লইয়া অন্যের বাসায় থাকতে হয়। মোরতো আর কেউ নাই যে এই তিনডা বাচ্চারে দ্যাখবে। ওগো একটু খাওন দেবে।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য