দক্ষিণাঞ্চলের বহুকাঙ্খিত পায়রা সমুদ্র বন্দর
- ১৮:১৪
- ঘটনাপ্রবাহ, প্রধান প্রতিবেদন, সম্ভাবনার দিগন্ত, সর্বশেষ
- ৪৪৯
মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া।। দক্ষিণ উপকূলের লাখো মানুষের এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা। কখন প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন পায়রা সমুদ্র বন্দরের। রামনাবাদ চ্যানেলে দেশের তৃতীয় ‘পায়রা সমুদ্র বন্দর’ উদ্বোধনকে ঘিরে সেখানে এখন দিনরাত চলছে কর্মকান্ড। পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প নামে চলছে এই কার্যক্রম। এলক্ষ্যে পটুয়াখালীর পর্যটন শহর কলাপাড়ায় রামনাবাদ চ্যানেলের প্রবেশদ্বার টিয়াখালীতে অনেক আগেই ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট সরদার বেল্লাল হোসেন জানান, নদীরপাড় ঘেঁষে সেখানে বালু ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। করা হয়েছে সড়ক। বসানো হয়েছে বিদ্যুত লাইনের খুঁটি। সোলার সিষ্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুত সরবরাহ চালু করা হয়েছে। কন্টেইনারসহ পণ্যসামগ্রী ওঠা-নামা করাতে ক্রেন সংযুক্ত করা হয়েছে। গভীর নলকূপ, টার্মিনাল ভবনসহ জেটি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দু’টি পন্টুন, একটি প্রশাসনিক ভবন ও একটি গুদাম নির্মাণ করে বন্দরের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হচ্ছে। শত শত শ্রমিক এসব কাজে নিয়োজিত রয়েছে। সমুদ্রবন্দর স্থাপনের কাজকে ঘিরে ওই জনপদে এখন প্রাণচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। ছোট ভ্যাসেলের মাধ্যমে পণ্য খালাসের মধ্য দিয়ে এই বন্দরের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ১৯ নবেম্বর, মঙ্গলবার প্রথম প্রহরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে বহুকাঙ্খিত পায়রা সমুদ্র বন্দরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। সেখানে এক সুধি সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা করবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই সঙ্গে এখানকার মানুষের আরেক প্রত্যাশিত কুয়াকাটাগামী বিকল্প সড়কের বালিয়াতলীতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। করবেন লালুয়ায় শের-ই-বাংলা নৌ-ঘাটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনসহ কয়েকটি উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন এবং ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন। প্রধানমন্ত্রীর আগমন এবং সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে উৎসব মুখর পরিবেশ। সুধি সমাবেশকে মহাসমাবেশে পরিণত করতে স্থানীয় আওয়ামী লীগসহ সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। স্থানীয় সাংসদ পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষের সঙ্গে এলক্ষ্যে মতবিনিময় সভা করে যাচ্ছেন। শুক্রবার রাতে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। মাহবুবুর রহমান জানান, অবহেলিত দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করে একটি মাইলফলক স্থাপন করলেন। যার কারণে অবহেলিত এই অঞ্চলের দারিদ্র্য মোচন হবে। এর ফলে এখানকার বেকার মানুষকে কাজের সন্ধানে এখন আর ঢাকায় ছুটতে হবে না। চিটাগং বন্দরের চেয়ারম্যান, নৌ সচিবসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অসংখ্য কর্মকর্তারা পায়রা সমুদ্রবন্দর উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত সময় পার করছেন। চলছে সর্বত্র সাজ সাজ রব। সর্বশেষ ৩ নবেম্বর, মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পায়রা সমুদ্র বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৩ পাশ হয়। এ আইনের আওতায় রামনাবাদ পাড়ের মধ্যবর্তী টিয়াখালী ইউনিয়নের ইটবাড়িয়াতে দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর স্থাপন কাজ চলছে। জানা গেছে, ২৫ আগস্ট নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের সভাপতিত্বে মন্ত্রনালয়ে পায়রা সমুদ্র বন্দর স্থাপন সংক্রান্ত এক সভায় রামনাবাদ চ্যানেলে সমুদ্র বন্দর নির্মানের প্রয়োজনীয়তা, নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয়ের উদ্যোগ ও এ সংক্রান্ত রূপরেখা তুলে ধরা হয়। ইতোপুর্বে ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কলাপাড়ার শহরে মোজাহারউদ্দিন বিশ্বাস কলেজ মাঠের এক বিশাল সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী রামনাবাদ চ্যানেলে দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর নির্মানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পায়রা সমুদ্র বন্দর স্থাপনের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহন ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ জেলা প্রশাসনকে এক কোটি ৫১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৬৮৭ টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। ২১ অক্টোবর চট্রগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক অমিতাভ সরকারের কাছে এই চেক হস্তান্তর করেন। পায়রা সমুদ্র বন্দর স্থাপনে টিয়াখালী ছাড়াও লালুয়ার চারটি মৌজার অধিকাংশ জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়েছে। সমুদ্র বন্দর নির্মাণের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি তদারকি সেল গঠন করা হয়েছে। হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের প্রধান লে. কমান্ডার হাবিব-উল-আলমকে প্রধান করে সাত সদস্যের এই সেল গঠন করা হয়েছে। এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান সুজন মোল্লা জানান, দেশের কাঙ্খিত উন্নয়নের লক্ষ্যে দক্ষিণের এই জনপদে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তৃতীয় সমুদ্র বন্দর স্থাপন করে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সমুদ্র বন্দর চট্রগ্রাম ও মংলা বন্দরের তুলনায় পায়রা বন্দরে অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। এ বন্দর স্থানের গভীরতা রয়েছে ১৫ মিটার পাশাপাশি চট্রগাম বন্দরের গভীরতা মাত্র ৯ দশমিক ২ মিটার। প্রস্তাবিত এ বন্দরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধা হবে গভীরতা বেশি থাকার ফলে এ বন্দরের জেটিতে মাদার ভ্যাসেল ভিড়তে পারবে এবং এ মাদার ভ্যাসেল থেকেই মালামাল সরাসরি লোড-আনলোড করা যাবে। যেখানে চট্রগ্রাম বন্দরের গভীরতা কম থাকায় মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য প্রথমে লাইটার জাহাজে তোলা হয় এবং লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য মূল জেটিতে নিয়ে খালাস করা হয়। এতে পণ্য লোড-আনলোডে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়। কিন্তু তৃতীয় পায়রা সমুদ্র বন্দরে মাদার ভ্যাসেল থেকে সরাসরি পণ্য খালাসের সুবিধা থাকায় পন্য লোড-আনলোডে বাড়তি সুবিধা রয়েছে। ২০১০ সালের ১৮ জুলাই চট্রগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) ক্যাপ্টন আরিফ মাহমুদের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি কারিগরি টিম তৃতীয় সমুদ্র বন্দর স্থাপনের প্রস্তাবিত স্থানটি এই স্থানটি দু‘দিনব্যাপি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে তখন এসব ইতিবাচক সুবিধার দিক তুলে ধরেছিলেন। আরিফ মাহমুদের মতে, ২০০৫-২০০৬ সালের সার্ভে অনুসারে বর্তমানে সাড়ে চার মিটার থেকে সাত মিটার গভীরতা সম্পন্ন সাড়ে সাত হাজার থেকে ১০ হাজার টন মালামাল বোঝাই জাহাজ লালুয়ার রামনাবাদ মোহনা এলাকায় সমুদ্র থেকে এমুহুর্তে মালামাল নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে। জেটি ছাড়াই জাহাজ দিয়ে পণ্য এখান থেকে খালাসের সুবিধাও রয়েছে।
