বাংলাদেশের ৪৩ বছর, উপকূল কতটা এগিয়েছে?

বিজয়ের নিশানঢাকা : বহু ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে ৪৩ বছর পার করে এসেছে দেশটি। এই সময়ে দেশ এগিয়েছে অনেক দূর। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক খাতে উন্নয়নের জোয়ার। কিন্তু স্বাধীন এই দেশটির সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা সমুদ্র উপকূবর্তী এলাকা কতটা এগিয়েছে? দেশের মূলধারার উন্নয়নে কতটা সম্পৃক্ত হতে পারছে এই উপকূল? এ হিসাব মিলিয়ে দেখার সময় এসেছে।

বছর ঘুরে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে বিজয় আসে। সারাদেশের মানুষের মত উপকূলের মানুষের জীবনেও এই বিজয় নিয়ে আসে অন্যরকম এক আনন্দ। নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে পালিত হয় দিনটি। উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার তটরেখায় বসবাসকারী মানুষেরাও প্রত্যাশা করেন, এই বুঝি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে! কিন্তু সে প্রত্যাশা আর বাস্তবে রূপ পায় না। হাজার হতাশার জালে জড়িয়ে তারা আবার আশা ছেড়ে দেয়। এভাবেই দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। ফিরে ফিরে আসে বিজয়ের মাস।

সরকারি হিসাবে ১৯ জেলা উপকূলের আওতাভূক্ত। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকট ১৫ জেলায়। এরমধ্যে রয়েছে পূর্ব উপকূলের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, নোয়াখালী, মধ্য উপকূলের বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, চাঁদপুর এবং পশ্চিম উপকূলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা। এসব জেলার সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় রয়েছে হাজারো সমস্যা।

উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা বাস্তবতার এক কঠিন নিগড়ে বাঁধা। প্রতিনিয়ত তাদেরকে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন করে টিকে থাকতে হচ্ছে। উপকূলের দীর্ঘ এলাকা কখনো প্লাবনে ডুবে যায়, কখনো ঝড়-বন্যায় ভেসে যায় মানুষজন কিংবা সম্পদ। এ অঞ্চলের বহু এলাকা এখনো উন্নয়ন সুবিধা পৌঁছেনি। গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। রাস্তাঘাট, কালভার্ট, হাসপাতাল কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। দ্বীপ চর কিংবা বিচ্ছিন্ন চরের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।

বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কোন কোন এলাকায় এরইমধ্যে দেখা দিয়েছে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়। নদী-ভাঙ্গণে বিলীন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো ভাসমান দিন কাটাচ্ছে। জীবিকা নির্বাহ করছে অনাহার-অর্ধাহারে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা অঞ্চলের জীবযাত্রাকে বলতে গেলে অচল করে রাখছে। এরই প্রভাব পড়ছে সমাজের নানা স্তরে। অশিক্ষা-অসচেতনতার কারণে গোটা অঞ্চল অনগ্রসর থেকে যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি সেবা পৌঁছাচ্ছেনা সাধারণ মানুষের কাছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বদলে যাচ্ছে দেশের উপকূলের চিত্র। মানুষগুলোকে টিকে থাকতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পরিবেশ উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়া পরিবারগুলো ভাসমান দিন কাটাচ্ছে। তাদের দিন কাটছে অনাহার-অর্ধাহারে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এ অঞ্চলের জীবযাত্রা প্রায় অচল করে রেখেছে। বহুমূখী প্রতিবন্ধকতায় উপকূলের মানুষগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদেরকে মানিয়ে নিতে পারছেনা।

জলবায়ু পরিবর্তরের প্রভাবে বহুমূখী দুর্যোগে বিপর্যস্থ হয়ে পড়ছে দেশের উপকূলীয় এলাকা। সাম্প্রতিককালে নদী ভাঙ্গণ বেড়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। প্রাকৃতিক সম্পদের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। এরইমধ্যে সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ভয়াবহতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে উপকূল এলাকার মানুষের জীবন জীবিকার ধরন। প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনের ওপর। প্রকৃতির রূদ্ররূপ সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিলীন করে দিচ্ছে। জোয়ারের পানির প্রভাব বেড়েছে। পানিতে বাড়ছে লবনাক্ততা। আর এর প্রভাব পড়ছে কৃষি ব্যবস্থার ওপর। সমূদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে দেশের উপকূলীয় এলাকার জন্য অপেক্ষা করছে এক ভয়াবহ দুর্যোগের সংকেত। নিচু এলাকা তলিয়ে যাবে। লবনাক্ততা বাড়বে। দেখা দিবে জলাবদ্ধতা। সেই ভয়াবহতার জন্য এখন যেমন আতংক রয়েছে, তেমনি এরই মধ্যে কিছু কিছু প্রভাব দেখা দিয়েছে।

গবেষণা সূত্র বলছে, ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গড়ে প্রতি বছর তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ১৯৬১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশে গড়ে প্রতি বছর তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক ৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শেষ দশ বছরে তাপমাত্রা এত বেশি বেড়েছে যে ৪০ বছরের গড় তাপমাত্রার হার দ্বিগুন হয়েছে। গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বেড়েছে পেয়েছে প্রায় দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে দশমিক ৫ মিটার। দক্ষিণ পশ্চিম খুলনা অঞ্চলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার রেকর্ড করা হয়েছে ৫.১৮ মিলিমিটার।

এইসব তথ্য থেকে দেখা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে অত্যন্ত ধীর গতিতে। এরপরও এ হারে বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৮৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। সুতরাং বিপন্ন উপকূলের দিকে নজর দেওয়ার সময় এখনই।

//সম্পাদকীয়/উপকূল বাংলাদেশ/ঢাকা/১৬১২২০১৪//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য