বাল্যবিয়ে প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে মেয়েশিশুদের নিয়তি
- ০০:৩২
- প্রধান প্রতিবেদন, সর্বশেষ
- ২৭১
শংকর লাল দাশ, গলাচিপা।। বাল্যবিয়ে আইনত নিষিদ্ধ হলেও পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে মেয়েশিশুদের তা যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিন চরাঞ্চলের কোথাও না কোথাও ঘটছে বাল্যবিয়ের ঘটনা এবং ক্রমে তা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। কেবল চরগঙ্গা নামের একটি প্রত্যন্ত দ্বীপগ্রামেই গত একমাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১০টি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে। বাল্যবিয়ের শিকার এসব শিশুকন্যার বয়স ১২ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। এদের অধিকাংশই স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভুয়া জন্ম সনদ বাগিয়ে এদের পাত্রস্থ করা হয়েছে। বাল্যবিয়ের কারণ হিসেবে অভিভাবকরা তাদের দারিদ্র্যতা এবং বখাটেদের উৎপাতকে প্রধানত দায়ী করেছেন। উপজেলার অন্যান্য প্রত্যন্ত দ্বীপগ্রামেও একই সময়ে কয়েকটি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব বিয়ে বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট মহলগুলো থেকে এ যাবত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে বাল্যবিয়ের ঘটনা কিছুতেই কমছে না।
রাঙ্গাবালী উপজেলার সাগর তীরবর্তী বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের চরগঙ্গা গ্রামে সরেজমিন অনুসন্ধানে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া প্রায় সব শিশুকন্যা ও তাদের পরিবারের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এরা হচ্ছেÑমোশারেফ মিয়ার মেয়ে মৌসুমী, নসু মিয়ার মেয়ে তানজিলা, জাকির হোসেনের মেয়ে জুলিয়া, নিজাম মিয়ার মেয়ে রেশমা, শাহজাহান মজুমদারের মেয়ে নিলুফা, কবির হোসেনের মেয়ে মরিয়ম, বাবুল মিয়ার মেয়ে সোনিয়া, কিশোর ফরাজির মেয়ে কেয়ামনি, ইসমাইল মাঝির মেয়ে শিল্পী বেগম ও আব্দুল লতিফের মেয়ে পপি বেগম। চরগঙ্গা রেজিস্ট্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ সোলাইমান নিশ্চিত করে জানান, বাল্যবিয়ের শিকার বেশিরভাগ শিশু তার বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণীর ছাত্রী। অভিযোগ উঠেছে, এসব অপরিণত বয়সের বিয়ের নিবন্ধন করিয়েছেন একই গ্রামের একটি মসজিদের ইমাম মোঃ মাহাতাব হোসেন। তিনি নিজেকে বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) মাওলানা মোঃ ইলিয়াসের সহকারী বলে দাবি করে জানান, তিনি গত দু’সপ্তাহে ৬টি বিয়ে পড়িয়েছেন। এর মধ্যে তিন দম্পতির জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত সনদ হাতে পেয়েছেন। বাকিগুলো নিবন্ধন হয়নি। বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার এবং পশ্চিম গাববুনিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মোঃ ইলিয়াস জানান, মাহতাব নামে তার কোন সহকারী নেই। তবে তিনি জেনেছেন অর্থের বিনিময়ে ইমাম মাহতাব হোসেন বিভিন্ন নিকাহ রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে বিবাহ নিবন্ধন করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে থাকেন; যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, এসব বিয়ের বেশিরভাগ সম্পন্ন হয়েছে অপরিণত বয়সের ছেলে শিশুদের সঙ্গে। অধিকাংশ বিয়েতে দিতে হয়েছে সাধ্যমতো যৌতুক। অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার কারণ হিসেবে ক্ষুদ্র কৃষক মোশারেফ হোসেন জানান, তাঁর মেয়েটি পড়াশোনায় মনোযোগী নয়। সংসারে রয়েছে অভাব-অনটন। তাছাড়া, অল্প বয়সী মেয়েদের বিয়ের বাজারে চাহিদা রয়েছে। যে কারণে তিনি তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মেয়ের স্বামীর বাড়ি রাঙ্গাবালী সদর ইউনিয়নে। কেয়ামনির মা জেসমিন বেগম বলেন, ‘মাইয়া বড় হইছে। এলাকার কিছু খারাপ পোলাপান হারাদিন জ্বালায়। ইশকুলে আইতে-যাইতে খারাপ আকার-ইঙ্গিত করে। হ্যাগো উৎপাতে মানসম্মান রক্ষা করা কঠিন। এই লেইগ্যা মাইয়ার বিয়া দিলাম।’ আরও কয়েক অভিভাবক একই অভিযোগ করে জানান, বখাটেদের উৎপাতে মেয়ে নিয়ে বাড়িতে বসবাস করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরগঙ্গা গ্রামের ইউপি মেম্বার মোঃ সোনা মিয়া জানান, গত এক মাসে মূলত আরও বেশি বাল্যবিয়ে ঘটেছে। তাঁরা নানাভাবে প্রচারণা চালিয়েও বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে পারছেন না। এলাকার বাসিন্দার বেশিরভাগ নিতান্ত গরিব। অভাবের তাড়না এবং সামাজিক নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে অভিভাবকরা অপরিণত বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ লিয়াকত আলী এ বিষয়ে জানান, বাল্যবিয়ের ঘটনাগুলো সম্পর্কে তাঁকে কেউ কিছু জানায়নি। তারপরও তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। একই সঙ্গে শীঘ্র ওই গ্রামে সচেতনতামূলক কর্মসূচী দেয়া হবে।
বড়বাইশদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব রিয়াজ উদ্দিন জানান, কিছু অভিভাবক এসে তাদের ছেলেমেয়ের জন্ম নিবন্ধনের সনদ নিয়েছেন। যখন ওই সনদ দিয়ে অপরিণত বয়সের ছেলেমেয়ের বিবাহ নিবন্ধন করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে তখন ঢালাওভাবে জন্ম নিবন্ধন সনদ দেয়া বন্ধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাহে আলম জানান, বাল্যবিয়ে আইনত দ-নীয় অপরাধ। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
