চারিদিকে থই থই পানি, মানুষের কষ্ট সীমাহীন

dsc02286.JPGনিজস্ব প্রতিবেদককপোতাক্ষ ও বেতনা নদীর ভাঙনের পর শুক্রবার ও শনিবারের অবিরাম বর্ষণে সাতক্ষীরা সদর, তালা ও কলারোয়া উপজেলার ১৩৫ গ্রাম প্লাািবত হয়েছে। এতে ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চার হাজারের অধিক বাড়িঘর ভেঙে গেছে। তলিয়ে গেছে কয়েক হাজার বিঘার চিংড়ি ঘের, পুকুর ও ফসলের ক্ষেত। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। বৃষ্টি অব্যহত থাকলে রাতের মধ্যে জেলার আরও অনেক বেশি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভেঙে পড়েছে সুপেয় পানির ব্যবস্থাপনা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা।
কেন্দ্রীয় পানি কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম জানান, অতিবৃষ্টির কারণে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ ও অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে জালালপুর ইউনিয়নের কানাইদিয়া গ্রামের মীরপাড়ায় কপোতাক্ষের পানি উপচে বেড়িবাঁধ তিনবার ভেঙে যায়। চেষ্টা করেও মাটির অভাবে সেখানে বাঁধ সংস্কার সম্ভব হয়নি। ফলে ইউনিয়নের কানাইদিয়া, চরকানাইদিয়া, কৃষ্ণকাটি, আটঘরিয়া, রথখোলা ও জেঠুয়ার বিস্তীর্ন অঞ্চল প্লাবিত হয়। এ ছাড়া বৃষ্টির পানিতে ইসলামকাটি, তালা সদর, তেঁতুলিয়া, কুমিরা, নগরঘাটা, খলিলনগর ও সরুলিয়া ইউনিয়নের ৪০টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়। ভেসে যায় কয়েক হাজার বিঘার ফসলের খেত ও চিংড়ি ঘের। ঘরের মধ্যে পানি ঢোকায় অনেকেই গবাদি পশু ও হাঁস মুরগি নিয়ে রাস্তা ও আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। অনেকেই চলে যায় দূরবর্তী কোন আত্মীয়ের বাড়িতে। এরপর শুক্রবারের বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে তালা উপজেলা পরিষদ চত্বর।
তালা উপজেলার ১৮ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জিয়ালা নলতার ঘোষপাড়ায় ডুুমুরিয়ার পাশে একটি অবৈধ চিংড়ি ঘেরের বাঁধ কেটে দিয়ে ও কানাইদিয়া এলাকা দিয়ে পানি শালতা নদীতে ফেরার বিকল্প ব্যবস্থা করে মানুষজনকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বল্লী ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম ও সমাজসেবক ডাঃ মিজানুর রহমান জানান, আখড়াখোলা বাজারের রাস্তার উপর আড়াই ফুট থেকে তিন ফুট পর্যন্ত পানি উঠেছে। আখড়াখোলা বাজার থেকে ভাটপাড়া রাস্তার মধ্যবর্তী চারটি স্থানে কেটে দেওয়া হয়েছে। আখড়াখোলা থেকে লাবসা ইউনিয়নের দেবনগর, আখড়াখোলা থেকে মুকুন্দপুর রাস্তার উপর তিন থেকে চার ফুট পানি ওঠায় উপজেলা সদরের সঙ্গে বল্লী ইউনিয়নের একাংশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইউনিয়নের প্রায় সব ক’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার সকালে মুষলধারায় বৃষ্টি হওয়ার কারণে বল্লী ইউনিয়নের বেতনা নদীর বাসাবাটি নামকস্থানে ভাঙন দেখা দিলেও শনিবার অব্যহত বৃষ্টিার কারণে তা সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ভাটপাড়া, হাজিপুর, রঘুনাথপুরসহ কয়েকটি স্থানে বেতনা নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে জলাবদ্ধ হয়ে পড়া  ভাটপাড়া , মুকুন্দপুর, রঘুনাথপুর, নারায়নপুর, হাজিপুর, শ্যামপুর, সেনবাগ, বল্লী, কাঠালতলা, রায়পুর, কুশোডাঙা, সমনডাঙা, শিয়ালডাঙা, আমতলা, বালুডাঙি ও সেজডা ঘরচালাসহ ২০টি গ্রামে শুক্রবার ও শনিবারের মুষলধারায় বৃষ্টি নতুন করে তলিয়ে দিয়েছে ২০ হাজার পরিবারের বাড়িঘর, চিংড়ি ঘের ও ফসলের খেত। মুছে গেছে ফসলের ক্ষেত ও চিংড়ি ঘেরের নিশানা।
একইভাবে ঝাউডাঙা ইউনিয়নের হাজিপুর ও বয়ারখোলায় বেতনা নদীর বেড়ি বাঁধে ভাঙনের ফলে ওয়াড়িয়া, গোবিন্দকাটি, ঝাউডাঙা , হাজিপুর, হাসিমপুর, তুজুলপুর, আখড়াখোলা, বিহারীনগরের একাংশ, বলাডাঙা ও বয়ারখোলা গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়ে। শুক্রবার ও শনিবারের মুষলধারার বৃষ্টিতে ঝাউডাঙা বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ, পাওয়ারহাউজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ওয়াড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে পানি ঢুকে পড়ে পড়াশুনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। দেবনগর থেকে মুকুন্দপুর সড়কে তিন থেকে চার ফুট পানি ওঠায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।  পুরো বা আংশিক ভেঙে পড়েছে সাত’শ এর বেশি ঘরবাড়ি। ১০টি গ্রামের সাত হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভেসে গেছে পাঁচ হাজার বিঘার বেশি চিংড়ি ঘের ও ফসলের খেত।
বৃষ্টি ও বেতনার পানিতে লাবসা ইউনিয়নের কৈখালি, খেজুরডাঙি, দেবনগর ,রাজনগর, গোপীনাথপুর, মাগুরা, বিনেরপোতা জেলেপাড়া, বলদেপাড়া ও গদাইয়ের বিল পানিতে তলিয়ে গেছে। রাজনগর থেকে দেবনগর ও দেবনগর থেকে বলদেপাড়ার রাস্তার উপর দেড় থেকে দু’ফুট পানি জমায় যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। রাজনগরের বাঁশের সাঁকোটি ভেঙে পড়ায় মানুষজন নতুন করে সমস্যায় পড়েছে। এসব গ্রামের পাঁচ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভেসে গেছে দু’ হাজার বিঘার চিংড়ি ঘের, পুকুর ও ফসলের ক্ষেত।
বেতনা নদীর পানি ও শুক্রবার রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টিতে সাতক্ষীরা পৌরসভার মেহেদীবাগ, মাঠপাড়া, বদ্দীপুর কলোনী, লস্করপাড়ার নীচের অংশ, ঝুটিতলা, শাল্যের বিল, মাছখোলা, জেয়ালা, গোয়ালপোতা, কৈখালি, বাগডাঙি, দামারপোতা, ঘুড্ডিরডাঙি, রইচপুর, কুকরালি, মালোপাড়া তলিয়ে গেছে। তিন হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার এক হাজারের বেশি বাড়ি ভেঙে গেছে। এ ছাড়া ফিংড়ি ইউনিয়নের কমপক্ষে সাতটি গ্রাম কম বেশি প্লাবিত হয়েছে।
কলারোয়া  উপজেলার উত্তর ক্ষেত্রপাড়ার সাহাপাড়া খালের মুখ ভেঙে যাওয়ায় ও কপোতাক্ষের পানি ও গত দু’দিনের বৃষ্টির পানিতে পৌরসভার গোপীনাথপুর, মুরারীকাটি, ও সরকারি কলেজ মাঠ প্লাবিত হয়েছে। এাছাড়া উপজেলার খোর্দ্দ-বাটরা, উত্তর জয়নগর, দেয়াড়া মাঠপাড়া, মাছিনগর, মানিকনগর, রাজনগর, ছোট রাজনগরসহ কমপক্ষে ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব গ্রামের ১০ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এক হাজারের বেশি পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙেছে।
বল্লী ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান জানান, তার ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের ২০ হাজার পরিবারের ২৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি। তার ইউনিয়নের বেতনা নদীর কয়েকটি স্থানে ভাঙনের ফলে তিনি নিজ উদ্যোগে ৩৩ হাজার ব্যাগ মাটি দিয়ে বাঁধ সংস্কারের চেষ্টা করেছেন। এ পর্যন্ত বাঁধ সংস্কারের জন্য সাত টন জিআরের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দু’ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।
ঝাউডাঙা ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, তার ইউনিয়নের ১০টি গ্রামের আট হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৭০০ এর বেশি ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। নদীবাঁধ সংস্কারে সাতটন চালের সহায়তা পাওয়া গেছে।  শুক্রবার সকালে যশোরের শার্শায় কপোতাক্ষ নদের কিছু বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ওই পানি তার ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
লাবসা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম জানান, তার ইউনিয়নের ১১টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে।
সাতক্ষীরা পৌর মেয়র আব্দুল জলিল জানান, পৌরসভার ১৫টি গ্রামের তিন হাজারের বেশি বাড়ি পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দু’ হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি। সহায়তা মিেিলছে সাত মেট্রিক টন চাল।
কলারোয়া উপজেলা চেয়ারম্যান বিএম নজরুল ইসলাম জানান, পৌরসভা ও উপজেলার ২৫টির বেশি গ্রাম পানিতে ডুবে গেছে। ভেঙে গেছে এক হাজারের বেশি ঘরবাড়ি।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ড. মুঃ আনোয়ার হোসেন হাওলাদারের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, তিনি শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বল্লী, লাবসা ও ঝাউডাঙা ইউনিয়নের বিভিন্ন প্লাবিত এলাকা পরিদর্শণ করেছেন। বল্লী ইউনিয়নের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ বলে তিনি উল্লেখ করে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসককে অবহিত করবেন।
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক কর্মকর্তা মোঃ মোশারফ হোসেন জানান, রোববার অফিসে যেয়ে খাতা পত্র দেখেই ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে কি পরিমান সহায়তা দেওয়া হয়েছে তা জানানো সম্ভব হবে।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য