মহেশখালীতে নতুন চর, নজর ভূমিগ্রাসীদের!
- ১৮:০২
- উপকূল সংবাদ, কক্সবাজার জেলা, পূর্ব-উপকূল, প্রধান প্রতিবেদন, শীর্ষ সংবাদ, সম্ভাবনার দিগন্ত
- ৫৩৭
মহেশখালী (কক্সবাজার) : বাংলাদেশে অন্যতম পাহাড় সমৃদ্ধ দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী ভূ-গৌলিক আয়াতন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে পাহাড় কাটা যার ফলে ভরাট হয়ে উঠছে পাশের নদী, জেগে উঠছে চরাঞ্চল। এ চরাঞ্চলে প্রায় ২৫ হাজার একর খাস ভূমি দখলে নিতে ভূমিগ্রাসীদের তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।বাংলাদেশের দক্ষিন-পূর্ব অঞ্চলীয় উপকূলীয়বর্তী বঙ্গোপ সাগরেরপাহাড় সমৃদ্ধ দ্বীপ মহেশখালী সম্প্রতিককালে অভূপূর্ব ভাবে ভূ-তান্ত্রিক ভূ-গাঠনিক প্রক্রিয়ার খুব দ্রত বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়ে আয়তনে বিশাল আকার রূপ ধারণ করে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মূল ভূ-ভাগের সাথে সংযুক্ত হতে চলছে। বিগত ক’ বছরে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূবাঞ্চলীয় উপকূলবর্তী দেশের একমাত্র পাহাড় সমৃদ্ধ বৃহৎ দ্বীপটি (বর্তমান আয়তন প্রায় ৩৮৮.৫ বর্গ কিঃমি) এবং এর সংলগ্ন কক্সবাজার চট্টগ্রামে উপকূলীয় অঞ্চলে খুব ঘন ঘন ভূমিকম্প এ অঞ্চলের অস্বাভাবিক ও অভাবনীয় ভূ-তাত্ত্বিক ও ভূ-গাঠনিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের সত্যতাকে প্রমাণ করে চলছে।
মহেশখালী দ্বীপের ভূ-তাত্ত্বিক চলমান পরিবর্তনের সাথে স্থানীয় ভূ-রূপাতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ও দ্বীপটির ভূমিরূপকে বিশেষ করে এর আয়তন আকার এবং আকৃতি পরিধি সম্প্রতি বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিয়েছে প্রকৃতি। মহেশখালী দ্বীপের এ অস্বাভাবিক ভূ-তাত্ত্বিক এবং ভূ-রূপত্তাতিক বির্বতনের বিষয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত ইনডেক্স জার্নাল “ওরিয়েন্টেল জিওগ্রাফার” এ প্রকাশিত “স্টাডিজ অন জিওমর্ফোলজিক্যাল অ্যানভাইরেন্ট অব দ্যা মহেশখালী আইল্যান্ড অব বাংলাদেশ” শীর্ষক একটি গবেষনাভিত্তিক নিবন্ধে এ দ্বীপটির নানা গাঠনিক ও ভূ- বিবর্তনিক বিশ্লেষন ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। গবেষনা মূলক নিবন্ধনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসোসিয়েট প্রফেসর ডক্টর মোহাম্মদ আব্দুর রব ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের লেকচারার আব্দুলহক
মূল ভূ-ভাগের সাথে যুক্ত হচ্ছে দেশের তৃতীয় বৃহত্তর উপকূলীয় দ্বীপ যৌথ গবেষনা নিবন্ধ থেকে জানা যায়, চট্ট্রগাম কক্সবাজার উপকূলের অদূরর্তী সাগর দ্বীপ মহেশখালী আজ থেকে প্রায় ২শ বছর আগে ১৭৮৯সালে মাত্র ১৮৮ বর্গ কিঃ মিঃ আয়তন জুড়ে বিদ্যমান ছিল। ১৮৮২সালে দ্বীপটিরভূমির মোট আয়তন বৃদ্দি পেয়ে প্রায় ২০৪ বর্গ কি্হঃয়। ১৯৮৩সালের ১৫্ ডিসেম্বর মহেশখালী থানা উপজেলায় রুপান্তরিত হয়। মাতারবাড়ী ধলঘাটা ও সোনাদিয়া চর দুটি আত্মপ্রকাশ সময় কাল দ্বীপটির পার্শ্ববর্তী উত্তরে ও দক্ষিনে যথাক্রমে আয়তন বড় হতে থাকে।
বর্তমানে মাতার বাড়ী ,ধলঘাটাও সোনাদিয়া দ্বীপ সমূহ সমগ্র মহেশখালী দ্বীপাঞ্চল একলায় মোট আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৩৮৮ বর্গ কিঃ মিঃ। এর উপরে মহেশখালী এই আয়তনিক পরিবর্তনের হিসাব মহেশখালী মূল দ্বীপ ও সংলগ্ন শাপলাপুরের নুনাছড়ি প্রায় ২০০শত একর, কুতুবজোমে সোনাদিয়া ও ঘটিভাঙ্গা মৌজায় প্রায় ৯ হাজার একর, ধলঘাটার হাঁসের দিয়া এলাকায় প্রায় ৯শত একর, হোয়ানকের আমাবশ্য খালী মৌজায় প্রায় ৫,০০০হাজার একর, মাতার বাড়ী প্রায়, ২০০শত একর সহ বিভিন্ন ইউনিয়নের দ্বীপদ্বয়ের সম্মিলিত হিসাবে প্রায় ২৫ হাজার একর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জেগে উঠেছে । ভূ-রূপত্ত্বতিক জটিল প্রকিয়ার মাধ্যমে ঐ নতুন চরাঞ্চল সমূহ ক্রমে সম্পূর্ণ রূপে মহেশখালীর মূল ভূভাগের সাথে সংযুক্ত হয়ে দ্বীপটির আয়তনকে ক্রমে বির্বধিত করে চলছে এবং একই সাথে দ্বীপটি আকার অবয়বকে করে তুলেছে ভিন্নতর।
বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জেগে উঠার কারণে ভূমিগ্রাসীরা অবৈধভাবে দখলে নিতে অপতৎপরতা শুরু করেছে ডক্টর রব ও জনাব হকের যৌথ গবেষনার ফলাফল থেকে আরো জানা যায় যে, আজ থেকে ২শ বছর পূর্বে ১৭৭৮ সালে মেজর রেনেলের মানত্রিচে মাতার বাড়ী চরের কোন নাম নিশানা ছিল না। সোনাদিয়া চরের আয়তন ছিল মাত্র ১.৫ বর্গ কিঃ মি।এর মত ১৮৯২ সাল “সার্ভে অব ইন্ডিয়ার” মানচিত্রে মাতার বাড়ীর আয়তন দেখা যায় ২৫.৪৫ বর্গ কিঃ মিঃ এবং সোনাদিয়ার আয়তন প্রায় ১০ বর্গ কিঃ মিঃ। ১৯৯৫ সালের নতুন দ্বীপদ্বয়ের আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে প্রায় ৪০ বর্গ কিঃ মিঃ এবং ৩১.০৫ কিঃ মিঃ তাদের এই গবেষনা নিবন্ধন থেকে মূল ভূখন্ড বিগত ২শত বছরের প্রায় ৪৪% বির্বধিত হয়েছে এবং সার্বিক হিসাবে সমন্ত অঞ্চলটির প্রায় ৬৩.৫% বড় হয়েছে।
তাদের মতে, এ প্রক্রিয়ায় আগামী মাত্র ১৫/২০ বছরের মধ্যে আয়তনে প্রায় দ্বিগুন বড় হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের বাংলাদেশের মূল মহাদেশীয় ভূভাগের সাথে সংযুক্ত হবে। বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির সাথে নতুন ও পুরাতন মানচিত্র, আকাশ চিত্র ও ভূ- উপগ্রহ চিত্র ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে নিবন্ধটিতে আরো বলা হয় যে, মহেশখালী তৎসংলগ্ন অগভীর সমুদ্র অঞ্চলের বিচ্ছিন্নকারী মহেশখালী চ্যানেলে পাহাড কাটার ফলে বিপুল পরিমাণে পলি সঞ্চালন হচ্ছে। এ কারনে পার্শ্ববর্তী নদী সমূহ ভরাট হয়ে ক্রমে সংক্রির্ণ হয়ে আসছে। একই সাথে দ্বীপটির দক্ষিণ উত্তর ও পূর্বঞ্চলীয় অগভির মহিসোপানের তলদেশ ক্রমে ভরাট হয়ে দ্বীপটি এদিকে যেমন দ্রত আয়তনে বড় হয়ে যাচ্ছে, ঠিক একই সাথে মহেশখালী, কক্সবাজারের চকরিয়া-চিরিঙ্গা অঞ্চলের সাথে উত্তর পূর্ব দিক দিয়ে যুক্ত হতে চলছে এ দ্বীপটি।
আগামী ১০/১৫ বছরের মধ্যেই মহেশখালীর মূল ভূ-খন্ডের সাথে গোরকঘাটা জেটি থেকে চৌফলন্ডি এলাকার মধ্যে এ দ্বীপটি সংযুক্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে ধারনা করা হচ্ছে।
এই নিবন্ধন থেকে জানা যায় যে, প্রায় ২শত বছর আগে ১৭৭৯ সালে মহেশখালী চ্যানেলের গড় গভীরতা যেখানে ১৫-৩৩ মিটার ছিল তা ১৯৮৩সালে ৯-২০মিটারে কমে যায় এবং বর্তমানে (১৯৯৯-২০০০) তা আরো অধিক হ্রাস পেয়ে গড়ে মাত্র ৫-৮/১০ মিটারে পৌছেছে। দ্বীপটির উত্তর পূর্বাঞ্চলে আজকাল চ্যানেলটি এতই সংকীর্ণ এবং অগভীর হয়ে পড়েছে যে, ভাঁটার সময় দেখা যায়, মহেশখালীর উত্তর-পূর্বঞ্চলীয় চ্যানেলটি প্রায় পানি শূণ্য হয়ে নিকটবর্তী কক্সবাজার জেলার চকরীয়া-মালুমঘাট উপকূলের সাথে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে য্ওায়ার আশংকা প্রকাশ পাচেছ।
ভাঁটার সময় ঐ চ্যানেল উত্তর দিকে কোন নৌযানই চলাচল করতে পারে না। যৌত ভাবে সম্পাদিত ঐ নিবন্ধে জানা যায় যে, মহেশখালী ও সংলগ্ন প্রায় একীভূত অন্যান্য চরাঞ্চলের মোট ৩১০বর্গ কিঃমি ১০০%ভূমির প্রায় ৫০বর্গ কিঃমিঃ বা ২৬% পাহাড়ী ভূমি (আদিনাথ রেঞ্জ), ৩৩ বর্গ কিঃ মিঃ ১১% প্যারাবন সমভূমি ৬৪বর্গ কিঃ মিঃ বা প্রায় ২১% অঞ্চল নব গঠিত উপকূলীয় জোয়ার- ভাঁটা প্রভাবিত প্যারাবন ভূমি বা ম্যানগ্রোভ জোঁয়ার ভাটাঁঁজাত সমভূমি এবং প্রায় ৮১ বর্গ কিঃমিঃ বা ২৬% অঞ্চল সক্রিয় জোয়ার -ভাটাজাত প্যারাবন সমভূমি। দ্বীপটিতে বর্তমানে প্রায় ৬০ বর্গ কিঃমিঃ বা ২০% নতুন জেগেওঠা কর্দম ভূমি , বালুকাবেলাভূমি অগভীর মগ্নচড়া গড়ে উঠেছে। বিপুল পলালয়ন ও ভূ-গাঠনিক উত্থানের ফলে মাতারবাড়ি চ্যানেল, সোনাদিয়া খাল ও মহেশখালী চ্যানেল ক্রমে সংর্কীণ ও অগভীর হয়ে যাচ্ছে এবং এসব দ্বীপ ক্রমে একীভূত হয়ে মূল ভূ-ভাগের সাথে মিশে যাচ্ছে।
গবেষকদ্বয়ের মতে, ঐ অঞ্চলের অভ্যন্তরস্থ ভূ-তাত্ত্বিক অস্থিরতা এ অঞ্চলে এ ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ও মহেশখালীর এ ভু-গাঠনিক এবং ভূ-রূপতাত্ত্বিক পরির্বতন ও রুপান্তরের ধারাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করছে এবং বৈজ্ঞানিক কারনে এই ধারণা করা যাচ্ছে।
//এম বশির উল্লাহ/ উপকূল বাংলাদেশ/মহেশখালী-কক্সবাজার/১৭১১২০১৪//
