বিপন্ন উপকূল ও অনলাইন সাংবাদিক
- ১৪:০৭
- উপকূল সংবাদ, গণমাধ্যম, প্রধান প্রতিবেদন, বর্ষপূর্তি ২০১৪, ভোলা জেলা, মধ্য-উপকূল, শীর্ষ সংবাদ
- ২৭২
ছোটন সাহা || টেলিভিশন কিংবা অনলাইন মিডিয়া, দুটোই প্রায় এক ধারার। বলতে গেলে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রেরন করাই এর সাথে যুক্ত সংবাদকর্মীদের কাজ। টেলিভিশনে ফুটেজসহ রিপোর্ট অন্যদিকে অনলাইনে ছবিসহ রিপোর্ট। তবে চলতি কিছু কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে অনলাইন সংবাদকর্মীদের ঘটনাস্থলে না গিয়েও মোবাইলে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
টেলিভিশনের পাশাপাশি অনলাইনেও ভিন্ন ধারার নিউজ, স্পেশাল রিপোর্ট, সাইড স্টোরী, বিশেষ প্রতিবেদন, সমস্যা, সম্ভাবনা ও উন্নয়ন যুক্ত আছে এর সাথে। এসব রিপোর্ট তাৎক্ষনাত প্রেরন করতে না হলেও পর্যাপ্ত তথ্যবহুল হতে হয়। বিস্তারিত রিপোর্ট করার সুযোগ রয়েছে অনলাইনে। রয়েছে ধারাবাহিক সংবাদ লেখার সুযোগও।
আমাদের দেশে অনলাইন সাংবাদিকতা শুরু হয়েছে খুব বেশী দিন হয়নি। সারাবিশ্বের সাথে তথ্য প্রযুক্তি সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের দেশও তুমুল গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে অনলাইন সংবাদ মাধ্যম। রাজধানী কিংবা বিভাগীয় পর্যায়ে সংবাদকর্মীগন এর সুযোগটা যেমনি বেশী পেয়ে থাকেন ঠিত তেমনী সংবাদ পাঠাতেও তাদের বেগ পেতে হয়না। কিন্তু যত বিপত্তি উপকূলের সাংবাদিকদের। তাদের সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে সংবাদ তৈরী ও পাঠানো পর্যন্ত নানা বিরম্বনার মধ্য পড়তে হয়। তবুও উপকূলের সাংবাদিকগন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আর এ নিরলসভাবে কাজ করার জন্যই তারা হয়ত এখনও এগিয়ে রয়েছেন, টিকে আছেন।
মফস্বলে সাংবাকিতার দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে বেশীদিন আগের কথায় না যেয়ে সেই মান্দাতার আমলের ফ্যাক্সই ছিলো কর্মীদের একমাত্র ভরসা। এখন সেই যুগ চলে গেছেই বলা চলে। আগে যেখানে বিদ্যুৎ ছাড়া ফ্যাক্স করা সম্ভব হতো না, তবে জরুরী সংবাদের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনে ঢাকায় বার্তা পাঠাতে হতো সাংবাদিকদের। এখন ল্যাপটপ, ডেক্সটপ কিংবা কম্পিউটারই ভরসা। তবে ইন্টারনেট একটি গুরুপ্তপূর্ন বিষয়। এর সুযোগ ছাড়া সংবাদ পাঠানো কল্পনা করা যায়না।
আধুনিক এসব উপকরন সাংবাদিকতায় সহজ করে দিলেও এখনও অনেক উপকূলীয় জেলায়-কিংবা উপজেলায় সেখানকার সাংবাদিকদের সে সেবাও হরহামেশা পৌছায়নি। একটি কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেট এর উপর নির্ভর করতে হয় অনেককে। কেউ কেউ আবার সাইবারক্যাফে গিয়ে প্রয়াজনীয় সংবাদের কাজ সারেন। তবে অনেকের আবার নিজস্ব এসব উপকরন রয়েছে। তারা হয়তা বা কিছুটা এগিয়ে রয়েছেন।
উপকূলে অনলাইন মিডিয়ায় যারা কাজ করেন তাদেরকে বহু কষ্ট করতে হয়। আধুনিক সুবিধার অভাবে নির্ধারিত সময়ে তারা সংবাদ পাঠাতে পারেন না। তবে বেশী সমস্যায় পড়তে তখনই, যখন কোন দুর্যোগ উপকূলে আঘাত হানে। তখন দৌড়-ঝাপ বেড়ে সাংবাদিকদের। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশী দৌড় দিতে হয় অনলাইন কর্মীদের। দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ, ছবি তোলা ইত্যাদিসহ নানা কিছু। পরের ধাপ তো আরো কঠিন। ওই বিষয়ের ফলোআপ, সাইড স্টোরীসহ নানা প্রতিবেদন করতে তাদের ঘটনাস্থলে থেকে যেতে হয়। বিপন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে তাদের কাজ করতে হয়। (যদিও কিছু সংবাদ মাধ্যম ঢাকা থেকে রিপোর্টার ও ক্যামেরা পারসন দিয়ে কাজটি সহজতর করে)।
যারা সিডর, আইলা, রেশমী, মহাসেনসহ বিভিন্ন দুযোর্গে কাজ করেছেন, তারাই এসবের ব্যাখা দিতে পারবেন। কিন্তু বিনিময় তাদের ভাগ্যে আদালা কোন টিএ-ডিএ জোটেনা। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় নিজের খরচে সংবাদ সংগ্রহের কাজ করতে হয়। মাস শেষ হলে সেই একই বেতন। ভালো কোন রিপোর্ট করে প্রশংসা জোটেনা, বরং একটু ভূল হলেই……।
দিন বদলের সাথে সাথে অনলাইন পাঠকও বেড়েছে। তাই পাঠকদের কথা বিবেচনা করেই উপকূলেল সাংবাদিকদের বেশী বেশী রিপোর্ট করতে হয়। এখন যখনই কোথাও কোন ঘটনা ঘটা মাত্রই রিপোর্ট দিতে হবে। অন্যথায় পাঠকের ফোন। সুবিধা রয়েছে প্রিন্ট মিডিয়াকর্মীদের। তারা দেরীতেও সংবাদ পাঠাতে পারেন। উপকূলের সাংবাদিকদের উন্নয়নে বেশী বেশী প্রশিক্ষন, অফিস থেকে লেপটপ-ইন্টারনেট ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা অতি জরুরী হলেও তাদের ভাগ্যে তা জুটে না। নিজের পকেটের টাকা দিয়েই এসব ক্রয় করতে হয়। এতো সমস্যার পরও উপকূলের সাংবাদিকদের নিরলসভাবে কাজ করতে হয়। বড় বড় দায়িত্ব নিতে হয়। হামলা-মামলা আর জীবনের ঝুকি নিতে হয়।
প্রতিযোগীতা
উপকূলের সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিযোগীতা সবচেয়ে বেশী। এ প্রতিযোগীতা সব ক্ষেত্রেই। যেমন কোন নতুন সংবাদ মাধ্যম বের হলে একাধিক কর্মী ওই মিডিয়ায় কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগীতা করতে হয়। কার আগে কে ভালো কোন রিপোর্ট পাঠাতে পারে। অবশেষ যিনি কাজের মাধ্যম বার্তা প্রধানদের মন জয় করতে পারবেন, তখনই তিনি নিয়োগ পাবেন। তবে প্রতিযোগীতার সময় দিনের পর দিন এমনকি মাসের পর মাস তাকে বিনা বেতনে কাজ করতে হেব। নিয়োগ পেলেও ওই টাকা তাকে দেয়া হবে না। নিয়োগ পরবর্তী সময় থেকে তার বেতন নির্ধারন হবে। এ তো গেলো শুধু মিডিয়ায় নিয়োগ পটাওয়া প্রতিযোগীতা। পরে ধাপ আরো কঠিন। কার আগে কে সংবাদ পাঠাবেন, কার কত সোর্স বেশী, কে বেশী ভালো রিপোর্ট করে সর্বমহলে প্রশংসিত হবেন এমনি প্রতিযোগীতা চলে আসছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। হয়ত এ প্রতিযোগ্যীতার শেষ নেই।
সমস্যা
হাজারো সমস্যা উপক’লের সংবাদকর্মীদের। প্রয়োজনীয় উপকরন ছাড়াও বিনা বেতন, কম বেতন, খরচের তুলানায় বেতন কমসহ নানা কিছু। দুর্ঘটনা শিকার হলে সহযোগীতা না পাওয়া, চিকিৎসা ভাতা না দেয়াসহ অনেক কিছু। যা শুধুমাত্র উপক’লকর্মীগন জানেন। তবে এ থেকে উত্তেরনের জন্য অনেক কর্মী আবার অন্য জব করছেন। এতে তার প্রয়োজনীয় সংকট দুর হচ্ছে। সাংবাদিকতাও উন্নত হচ্ছে। কিন্তু যারা সাংবাকিতাকে শুধুই পেশা হিসাবে নিয়েছেন তাদের অনেক কষ্ট, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। শেষ বয়সে তাদের কোন কূল কিনারা থাকেনা।
সম্ভাবনা
বর্তমান সময়ে নড়ে চড়ে উঠেছে মিডিয়া হাউজগুলো। এখন মফস্বলে সাংবাদিকদেরও মূল্যায়ন করা হয়। ভালো রিপোর্টের জন্য পুরস্কৃুত করা হয়। পদবি পরিবর্তন করা হয়। অনেক মিডিয়া এখন জেলা প্রতিনিধিদের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট হিসাবে মর্যাদা দিচ্ছে। বেতন ভাতা ও সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মেধা খাটিয়ে নিরলস ভাবে কাজ করলে সাফল্য নিশ্চিত। যার প্রমান মিলেছে বাংলানিউজ স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট রফিকুল ইসলাম মন্টু বেলাতে। তিনি উপক’ল নিয়ে সাংবকাদিকতা করায় পুরস্কার পেয়েছেন। একাধিক পুরস্কার রয়েছে তার। সেটি উপকূলের সাংবাদিকদের জন্য অনুকরনীয়। শুধু তিনি নন’ তার মত অনেক কর্মী বিভিন্ন পুরস্কার পেয়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন।
উপকূল সাংবাদিকদের দাবী
দেশের ১৫টির অধিক জেলা নিয়ে গঠিত উপকূলীয় অঞ্চল। এ জনপদে কাজ করে অসংখ্য সংবাদকর্মী। তাদের মত অনলাইন সংবাদকর্মীও রয়েছেন। তবে কিছু কিছু দাবী রয়েছে এসব কর্মীদের। তারমধ্যে নিজ নিজ মিডিয়া থেকে প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা, সংবাদ পাঠানোর উপ-করন দেয়া, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, কাজের মূল্যায়ন। এছাড়াও বছর শেষে বেতন বৃদ্ধি, সেরা রিপোটারের নাম ঘোষনা ও পুরস্কার, চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনা ভাতা প্রদান। এছাড়াও ভালো পারফরমেন্স হলে তাকে ঢাকায় কর্মস্থল দেয়া। সর্বশেষ অবসরকালীন সময়ে এককালীন পেশসনের ব্যবস্থা করা।
লেখক: জেলা প্রতিনিধি, দেশ টিভি ও বাংলানিউজ,ভোলা
