বিশেষ সম্পাদকীয় : পথচলার ৪ বছর

---দেখতে দেখতে চার বছর পূর্ন করে পাঁচ বছরে পা রাখল ‘উপকূল বাংলাদেশ’। দেশের দক্ষিণে ৭১০ কিলোমিটার তটরেখা বেষ্টিত অঞ্চলের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এটা এক ভিন্নধর্মী উদ্যোগ। প্রান্তিক জনপদের মানুষের সংকট নিরসনে এই উদ্যোগ নীতিনির্ধারক মহলে তুলে ধরছে নানান তথ্য। উপকূলের মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে আনছে কেন্দ্রে। এর মধ্যদিয়ে সমস্যা সমাধানের পথ সুগম হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের সঠিক তথ্য প্রকাশের মধ্যদিয়ে উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়াটা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। আর সে জন্যে অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিতকরণের এই চেষ্টা।

‘উপকূল বাংলাদেশ’-কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আমরা সব মহলের সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়েছি। পাঠকেরা ব্যাপক সাড়া দিয়ে আমাদের কাজে উৎসাহ জুগিয়েছন। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আমরা তাঁদের কথা ভুলিনি। উপকূলের প্রান্তিক জনপদ থেকে একদল সংবাদকর্মী আমাদেরকে নিয়মিত সংবাদ দিয়ে সহায়তা করেছেন। একইভাবে বিজ্ঞাপনদাতারা সহায়তা করেছেন বিজ্ঞাপন দিয়ে। প্রত্যেকের প্রতি আমাদের সবিনয় কৃতজ্ঞতা।

আমরা মনে করি, যেকোন অবহেলিত অঞ্চলকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। সমস্যাটা চিহ্নিত করতে না পারলে সমাধানের পথ বের করাটা খুবই কঠিন। তথ্যের অভাবে অনেক সমস্যা চোখের আড়ালেই থেকে যায়। জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা গ্রহনের সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মতামত নেওয়া হয় না। অথচ এই মানুষেরাই সমস্যা সমাধানের ভালো পরামর্শ দিতে পারেন। উপকূল বাংলাদেশ প্রান্তিক জনপদের সেই মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তাদের কথা তুলে আনে। এটা উন্নয়নেরই একটা অংশ।

বিচ্ছিন্ন উপকূল অঞ্চলের জানালা হিসাবে সবার সামনে উঠে আসছে এই উদ্যোগ। একটা জানালা থেকেই দেখা যাচ্ছে গোটা উপকূল। সমস্যা ও সম্ভাবনার পাশাপাশি দুর্যোগের নানান বিষয় রিপোর্ট আকারে প্রকাশিত হচ্ছে উপকূল বাংলাদেশ-এ। উপকূলের দিকে তাকিয়ে প্রতিনিয়ত নানান প্রশ্নের জবাব খুঁজছে উপকূল বাংলাদেশ। এদেশের সমুদ্র উপকূলে প্রতিনিয়ত কী হচ্ছে? সেখানকার কৃষিকাজে কৃষকদের লড়াইটা কী? উপকূলের গ্রামীণ নারীরা কতটা সংগ্রাম করে জীবিকা নির্বাহ করছেন? শিশুরাই-বা কীভাবে অবহেলায় বেড়ে উঠছে? কতোটা কষ্টে দিনযাপন করছেন জেলেসহ সেখানকার সব পেশার মানুষ? দিনভর কাঁকড়া ধরে, কাঠ কুড়িয়ে কিংবা মাছ শুকিয়ে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষটির জীবন কতটা দুর্বিষহ, কীভাবে তার এক একটি দিন পার হয়, শহুরে নাগরিকেরা কী তা জানেন?

আমরা দেখছি, এখনও উপকূলের অনেক গ্রাম ঢেকে আছে গভীর অন্ধকারে। মহাজন-জোতদার-শোষক শ্রেণীর দাপটে কথা বলার সাহস নেই নিরীহ মানুষগুলোর। উপকূলের বহুগ্রামে এখনও বিদ্যুতের আলো পৌঁছেনি। কাঁচের ভেতর দিয়ে কিভাবে আলোর ঝিলিক ছড়ায়, তা আজও অজানা সেখানকার বহু মানুষের কাছে। পাকা রাস্তা কিংবা শহর দেখার সৌভাগ্য হয়নি অনেকেরই। কাদাপানিতে লেপটে থাকা জীবনের খবর কেউ রাখে না। এইসব বিষয় তুলে আনার এখনই সময়। এইসব তথ্য-উপাত্ত তুলে আনা কী উন্নয়নের অংশ নয়? প্রকৃত তথ্য না জানা থাকলে উন্নয়নের গতি এগোবে কী করে?

স্থানীয় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ সম্পৃক্ত হচ্ছেন উপকূল বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে। এই গণমাধ্যম উপকূল এলাকায় তিন স্তরের কম্যুনিকেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। প্রথমত, এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ের স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা এই গণমাধ্যমে লিখছেন। তৃতীয়ত, তৃণমূল জনগোষ্ঠীদের মধ্যে জেলে, কৃষক, মজুর পেশাজীবীরা তাদের খবর এই পোর্টালে দিচ্ছেন।
আমরা জানি, এ পথ দুর্গম। উপকূলকে শহরের চশমা আঁটা চোখের সামনে তুলে ধরাটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তবুও অনেক সাহসে বুক বাঁধি। ২০১০ সালের ১৪ নভেম্বর, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর দিবসের তিন বছর পূর্তির একদিন আগে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছিল ‘উপকূল বাংলাদেশ’। তখন দেশ ছিল উত্তপ্ত। অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণের পর চিঠিপত্র বিতরণ শেষ। অনুষ্ঠানের ঠিক একদিন আগে হঠাৎ হরতালের ঘোষণা আসে। আমরা পিছু হটিনি, নির্ধারিত তারিখেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।

আমরা এগোতে চাই। এগিয়ে যেতে চাই সামনের দিকে। যেখানে একটা ধূ ধূ দিগন্ত রেখা দেখছি, সেখানেই পৌঁছাতে চাই। সবার সম্মিলিত সহায়তাই উপকূল নিয়ে এই উদ্যোগ এগিয়ে নিতে পারে।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য