নলছিটিতে ইউপি চেয়ারম্যানের ৬১ লাখ টাকার দুর্নীতি

jhalakati-berry-badh-pic.jpgমোঃ আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি ● ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার নাচনমহল ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন আকনের বিরুদ্ধে ৬১ লাখ টাকার দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির বিষয়ে উল্লেখ অভিযোগ করেছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ।
অভিযোগে জানাগেছে, বিশখালী নদীর পাড় ভবানীপুর হতে টেকেরহাট পর্যন্ত সিডিএমপির মাধ্যমে ৫৮ লাখ টাকার বেশি বরাদ্দ পায়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত কাবিখার মাধ্যমে রাস্তার উপর মাটি ফেলে বেরিবাধের কাজ সম্পন্ন করে। যার সিপিসি ছিল আঃ বারেক হাওলাদার ও হেমায়েত সরদার। বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে ভবানীপুর খালের উত্তর হতে বিশখালী নদীর পার দিয়ে চাঁদপুরা ও খুলনা গ্রামকে বেরিবাধের আওতায় না এনে ভবানীপুর থেকে টেকেরহাট পর্যন্ত বাজার সড়কের উপর মাটি ফেলে প্রকল্প সম্পন্ন করে। বর্তমানে ওই বেরিবাধের বাহিরে ২০০টির বেশি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীর পাড়ে ঝুঁকি পূর্ণ অবস্থায় মানবেতর বসবাস করছে। এছাড়াও রাস্তার উপর বেরিবাধ নির্মাণে স্কিম মোতাবেক কাজ না করে ভুয়া কাগজপত্র ও মাস্টার রোল দেখিয়ে বিল উত্তোলন করেছে।

সিডিএমপি প্রোজেক্টের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত বিনামূল্যে প্রদানের জন্য ২২ টি গভীর নলকূপ ১৪ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে প্রদান করেছে। এ ব্যাপারে ভবানীপুরের চিত্তরঞ্জন বিশ্বাসের পুত্র অসিম বিশ্বাস জানান, বৃদ্ধ পিতা বাড়িতে ডিপ টিউবয়েল দেখতে চাইছেন। তাই আমি বিগত নির্বাচনে আমু ভাই এমপি হবার পর তার ডান হাত ধরে একটি ডিপ টিউবয়েল চাইছিলাম। আমু ভাই তখন চেয়ারম্যান খোকনকে টিউবয়েল দেয়ার কথা বলে দেন। টিউবয়েল আসলে তার কাছে গেলে তিনি ১৪ হাজার টাকা দাবি করেন। বৃদ্ধ পিতার চাহিদা পূরণ করতে গাছ বিক্রি ৫শত টাকার ২৮ টি নোটের মাধ্যমে সরাসরি তাকে ১৪ হাজার দেই।
জেমি মোল্লা জানান, একটি ডিপ টিউবয়েল বসাইতে গেলে ৭০/৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। সবাই যখন ১৪ হাজার টাকা দিয়ে টিউবয়েল নেয় তাহলে আমি বাদ যাব কেন। তাই আমিও ১৪ হাজার টাকা দিয়ে টিউবয়েল নিয়েছি। এছাড়াও হাইসাওয়া প্রকল্পে ৫ টি পরিবারের সমন্বয়ে টিউবয়েল দেয়ার কথা থাকলেও জনসাধারণের সুবিধার কথা চিন্তা না করে এক ইউপি সদস্যের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ হাজার টাকার বিনিময় মাঝ কোলায় (ধানক্ষেতে) টিউবয়েল বরাদ্দ দিয়েছেন।
অপর দিকে ইউনিয়নের মুখিয়া বাজার সংস্কার ও হারদল আনছার মাস্টারের বাড়ির সামনের রাস্তা সংস্কারে ৪০ দিনের কর্মসূচীর লোক দিয়ে কাজ করিয়ে বরাদ্দকৃত টিআর আত্মসাত এবং নাচনমহল ইউপি ভবন সংস্কার ও আসবাবপত্র ক্রয়ে ২ টি প্রকল্পে বরাদ্দকৃত ১০ টন টিআর ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খোকন আত্ম সাত করেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়াও ২০১০ সালের অর্থ বছর থেকে বর্তমানে ২০১৪ অর্থ বছর পর্যন্ত নাচনমহল বাজার,  টেকেরহাট বাজার, ভবানীপুর বাজার থেকে উন্নয়ন মূলক খাতে পাওয়া অর্থ কাজ না আত্মসাত করেছে। তার এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে ক্যাডার বাহিনী দিয়ে হুমকি অথবা মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেয় বলে এলাকাসীর অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের কাছে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়।
এব্যাপারে ইউপি সদস্য নান্নু হাওলাদার জানান, ত্রাণ ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে বেরিবাধের বরাদ্দ অর্থ দিয়ে স্কিম মোতাবেক কাজ না করে রাস্তার উপর সামান্য কিছু মাটি ফেলে কাজ সম্পন্ন দেখায়। বেরিবাধের স্কিম অনুযায়ী কাজ করায় ২০০ টিরও বেশি পরিবার জলাবদ্ধতায় মানবেতর জীবন যাপন করছে।
হাইসাওয়া প্রকল্পের নলছিটি ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর আজাদ বলেন, ৫ টি পরিবারের মাঝে ১ টি করে টিউবয়েল দেয়ার নিয়ম রয়েছে। মধ্য বিত্ত বা স্বচ্ছল পরিবারের জন্য ১৪ হাজার এবং হতদরিদ্র বা অসহায় পরিবারের জন্য ৭ হাজার টাকা করে জমা দেয়ার নিয়ম রয়েছে। আমরা ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম করে সচেতন করেছি। কেউ যদি ইউপি চেয়ারম্যানকে ১৪ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে আমাদের চাপিয়ে রাখার সুযোগ নেই। মূলত তারা আমাদের উপর আস্থা না রেখে চেয়ারম্যানকে সন্তুষ্ট করেছে।
নাচনমহল ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সভাপতি ও অভিযোগের ১ নং স্বাক্ষরকারী মোঃ আব্দুল বারেক হাওলাদার জানান, নাচনমহল ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে দায়ের করা অভিযোগের যথাযথ সত্যতা রয়েছে। অভিযোগে উল্লেখিত সকল অনিয়ম, দুর্নীতি ও কুকীর্তির অভিযোগ আমার এবং এলাকাবাসীর।
এব্যপারে ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন আকন খোকনের সাথে যোগাযোগের জন্য তার ব্যবহৃত ০১৭১২২২৫২৭০ নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
নলছিটি উপজেলা প্রজেক্ট ইনভেস্টিগেশন অফিসার (পিআইও) মোঃ আনোয়ার হোসেন জানান, সিডিএমপির মাধ্যমে কাজ হয়েছে। ঢাকা থেকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের লোক এসে মেজরমেন্ট করে। তারপরে বিল সাবমিট করলে বিল দেয়। তারা যদি মনে করে ২ অথবা ১ ইঞ্চি কম হয়েছে তাহলে বিল কেটে আবার নতুন করে বিল সাবমিট করতে হয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ইঞ্জিনিয়াররা এসে দেখে তারপরে বিল দেয়। তারা যতটুকু বিল দেয়ার দরকার মনে ততটুকুই অনুমোদন করে। যেখানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সরাসরি লোক পাঠায় সেখানে আমাদের কম বেশি করার কোন সুযোগ নেই।
নলছিটি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল হাসানাত মোহাম্মদ আরেফিন বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে, তারিখ দেয়া হয়েছে শুনানীর জন্য। উভয় পক্ষকেই নোটিস দেয়া হয়েছে তারিখে উপস্থিত থাকার জন্য। এরপর যদি প্রয়োজন মনে করি সরেজমিনে যাবার তাহলে অবশ্যই যাব।

//মো. আতিকুর রহমান/উপকূল বাংলাদেশ/ঝালকাঠি/২৪০৯২০১৪//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য