বরিশালে নজরুলের চার চাকার গাড়ি
- ১৬:০৪
- উপকূল সংবাদ, ঘটনাপ্রবাহ, বরিশাল জেলা, মধ্য-উপকূল, সর্বশেষ
- ২০৮
ডেস্ক উপকূল বাংলাদেশ ● বিদেশি কোন পদ্ধতিতে নয়, সম্পূর্ণ নিজের হাতে তৈরি করেছেন চার চাকার ভিন্ন রকম গাড়ি। ব্যাটারিচালিত এ গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে যাত্রী পরিবহন করে চালাচ্ছেন দেশি প্রযুক্তিতে তৈরি গাড়ির প্রচারণা। দৈনিক ইত্তেফাক এ খবর দিয়েছে।
৫৮ বর্গকিলোমিটার এই নগরীতে যাত্রী পরিবহনে কোন ভাড়া নেন না নজরুল। নিজের উদ্ভাবিত চার চাকার ব্যতিক্রমী গাড়িতে যাত্রীসেবা দিয়ে শুধুই প্রচারণা চালাচ্ছেন। এছাড়া তিনি উদ্ভাবন করেছেন ব্যাটারিচালিত স্পিডবোড ইঞ্জিন এবং হিট-সাউন্ডপ্রুফ বিল্ডিং বক্স। ‘স্ব-শিক্ষত বিজ্ঞানী’ নামে স্বীকৃতিও মিলেছে জীবনযুদ্ধে বার বার বিপর্যস্ত নজরুলের। ড্যাফোডিল-জনবিজ্ঞান উদ্ভাবক মেলায় দেশসেরা পাঁচের মধ্যে তিনি স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।
নজরুলের জীবনের গল্প যেন ‘দুখু মিয়ার’ ইতিহাসকে হার মানায়। ১৯৭৯ সালে চতুর্থ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করার পর আর বাসায় ফিরতে সাহস পাননি নজরুল। ছোট্ট শিশু নজরুল নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়ায়। লঞ্চযোগে এসে ভবঘুরে শিশুর ঠিকানা নেয় ঢাকার রাজপথ। সেখানেও বেশি দিন থাকা হলো না হতভাগ্য নজরুলের। শিশু পাচারকারীরা তাকে ভারতের দিল্লিতে পাচার করে দিল। ভাগ্যগুণে সে শ্রী হরিরাম নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার আশ্রয় পেয়ে যায়। ঐ কর্তাবাবুর ছেলের সাথে আবার স্কুলে ভর্তি হয় অসহায় নজরুল।
দিল্লিতে ইন্ডিয়ান টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে পড়ার সময় প্রকৌশল বিদ্যায় সে বেশ দক্ষ হয়ে ওঠেন। তবে আবারো তার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটলো। ১৯৯০ সালে বাবরী মসজিদকে কেন্দ্র করে দাঙ্গার সময় নজরুলকে মারধর করে পাঠিয়ে দেয়া হয় বাংলাদেশে। এখানে কিছুদিন থেকে পাড়ি জমান জর্ডানে। বেশ ভাল আয় উপার্জন করে ২০০৯ সালে দেশে ফিরে এসে তার জমানো অর্থ প্রায় ৩৯ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেন শেয়ার মার্কেটে। বিধি বাম! শেয়ার মার্কেট তাকে একেবারে নিঃস্ব করে ছেড়েছে। শেষ পর্যন্ত নজরুলের বেঁচে থাকার অবলম্বন হয় রিকশা চালানো।
নগরীর ভাটিখানার রোকেয়া আজিম সড়কের জোড় মসজিদ এলাকায় মা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ৪৩ বছর বয়সী নজরুল ইসলাম বসবাস করেন। সেখানে রিকশা চালানোর পাশাপাশি চলে তার গাড়ি তৈরির গবেষণা। যে আতুর ঘরে নতুন গাড়িটির জন্ম সেখানে বসেই নজরুল বর্ণনা দিল তার চার চাকার গাড়ি তৈরির নানা কৌশলের প্রয়াস।
ভারত থেকে আমদানি করা তিন চাকার ইজিবাইকের চেয়ে আলাদা মডেলের এ গাড়িটি দেখতে পুরানো আমলের জিপ গাড়ির মত। নজরুলের হাতে গড়া চার চাকার গাড়িটি ব্যাটারিতে চলে। চালকসহ ৮ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন গাড়িটি চলে ১২ ভোল্টের ৫টি ব্যাটারিতে। যার মধ্যে ৬০ ভোল্ট ডিসি মোটর ও ১৫শ’ ওয়াট বিদ্যুত্ কাজ করে থাকে। ম্যাগনেট ক্রস মোটরসহ সামনে রয়েছে দু’টি হেডলাইট, সামনে-পিছনে দিকনির্দেশক ইন্ডিকেটর, হর্ন, সেলফ্ স্টার্টার, ডান পায়ে স্কেলেটর ও ব্রেক সবই রয়েছে একটি গাড়ির মত। নতুন ৫টি ব্যাটারি ৮ ঘন্টা চার্জ দিলে একশ কিলোমিটার অনায়াসে যেতে পারে। প্রতি ঘন্টার গতিবেগ ৪৫ কি:মি:। ধবল সাদা রংয়ের গাড়িটি লম্বায় ৮ ফুট প্রস্থ ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি, উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। বাটারিসহ ওজন ৩শ’ কেজি। যাত্রী উঠা-নামার করার জন্য রয়েছে ৪টি দরজা।
গত বছর আগস্ট মাসে নজরুল নিজের বাসায় বসে তৈরি করেছেন গাড়িটি। এ পর্যন্ত ফ্রি যাত্রী পরিবহন করার পর তার ডাক পড়েছিল ড্যাফোডিল ইউনির্ভাসিটি ক্যাম্পাসে ২ দিনের এ মেলায় হাজির হওয়ার জন্য। সেখানে গত ৩ ও ৪ জুন ৩১ জন স্ব-শিক্ষিত বিজ্ঞানীর মধ্যে উদ্ভাবন প্রদর্শনীতে সেরা ৫টি উদ্ভাবনের মধ্যে স্থান করে নেয় নজরুলের গাড়িটি। বিশেষ সম্মাননা দেয়া হয়েছে তাকে। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি থেকে তিনটি গাড়ি নির্মাণের চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছে তাকে। তার তৈরি এ গাড়ি সারাদেশে বাজারজাত করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে একটি বেসরকারি ব্যাংক। তবে নজরুল কোন ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা কর্পোরেট হাউজের কাছে নিজেকে বা নিজের প্রযুক্তিকে বিক্রি করতে রাজি নয়। স্কুলগামী শিশুদের বিনা ভাড়ায় পরিবহন করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা পেলে বরিশালেই গড়ে তুলতে চান বড় একটি গাড়ি কারখানা।
গত এক বছর ফ্রি যাত্রী পরিবহন করে নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন নজরুল। ভিন্ন নতুন মডেলের এ গাড়িতে বিনামূল্যে যাত্রী পরিবহনের স্টিকার দেখে পথচারীরা জটলা সৃষ্টি করেন। নগরীর ইজিবাইক চালকদের ‘শত্রু’ হিসাবে চিহ্নিত নজরুল। তার ফ্রি যাত্রী পরিবহন তারা মেনে নিতে পারছে না। প্রায়ই তাকে ইজিবাইক চালকদের রোষানলে পড়তে হয়। এতকিছুর পরও নগরীর রূপাতলী থেকে লঞ্চঘাট, নথুলাবাদ থেকে সদর রোডসহ জনবহুল এলাকায় নিয়মিত চলছে তার ফ্রি যাত্রীসেবা।
//ডেস্ক উপকূল বাংলাদেশ/৩০০৮২০১৪//
