পিরোজপুরে জমজমাট নৌকা বাজার, জীবিকা হাজারো মানুষের
- ০৯:৩৬
- উপকূল সংবাদ, পিরোজপুর জেলা, প্রধান প্রতিবেদন, মধ্য-উপকূল, সর্বশেষ
- ১৭৭
রবিউল হাসান রবিন, কাউখালী Θ বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসাতে না আসতেই জমজমাট হয়ে উঠেছে নৌকার ব্যাবসা। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ব্যবসা এলাকার মানুষের কাছে একটি অন্যতম ঐতিহ্য। যা শুধু বেঁচা-কেনার জন্যই নয়, এই অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি পর্যটনেরও বিষয়। নয়নাভিরাম নৌকার পসরা চোখে না দেখলে মনেই হবে না জলে-ডাঙ্গায় এক সঙ্গে এত নৌকার সমারোহ ঘটতেপারে। পিরোজপুর জেলার সুন্দরী কাঠ সমৃদ্ধ এলাকা স্বরূপকাঠী উপজেলার ১১ গ্রামের দেড়হাজারের বেশী পরিবার কয়েক যুগ ধরে নৌকা-বৈঠা তৈরি ও বিক্রি করে তাদের জিবীকা নির্বাহ করছে।
সরেজমিনে এ নৌকার হাট ঘুরে মনে হল এ যেন এক নৌকার মেলা। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার এবং রোববার বসে এই হাট। বেশী পরিবারের প্রধান পেশা নৌকা তৈরী। মূলতঃ এই অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষের জীবন-জীবীকার প্রধান বাহনই হচ্ছে নৌকা। আর তাই নৌকা বেঁচা-কেনাকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যা নদীর শাখা খালে যুগের পর যুগ বসছে নৌকার হাট।
পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠির আটঘর, আদমকাঠী, জিন্দাকাঠী, বাস্তকাঠী, বেঙ্গুলী, দলহার, আতাপাড়া, ইন্দুরকানী, কুড়িয়ানা, শেখেরহাট ও গাগর এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছে এই নৌ সম্্রাজ্য। শুক্রবার কথা হয় নৌ-কারিগর ছাব্বিরের সাথে। তিনিও জানেন না কবে থেকে আটঘর খালে ও ডাঙ্গায় নৌকার হাটে বেঁচা-কেনা শুরু হয়।
তবে তিনি বলেন, বাপ-দাদারা এই কাম হরত, হেগো দেহাদেহি আমিও নাও (নৌকা) বানানোর ব্যবসা শুরু হরি (করি)। আটঘর খাল ও খালের পাড়ের রাস্তার ওপরে দু’পাশ জুড়ে ডাঙ্গায় ক্ষুদ্রাকৃতির অসংখ্যা ডিঙ্গি (স্থানীয় ভাষায় পেনিস ও টালাই) নৌকার বেঁচা-কেনা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা ওই গ্রামে গিয়ে নৌকা কিনে আনে। আবার অনেকেই শুধু নৌকা কেনার জন্যই নয় নয়নাভিরাম এই দৃশ্য দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন।
শেখেরহাটে নৌকা মিস্ত্রী ও ব্যাবসায়ী আলামউদ্দিন জানান, একসময় তারা এসব নৌকা তৈরী করতে সুন্দরীকাঠ ব্যবহার করতো। বর্তমানে তারা রেইন্ট্রী, মেহগনি, চাম্বল, মাদার, আম ও আমড়া গাছের কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরী করেন। তিনি আরও জানান, ১৬শ’ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রকার ভেদের নৌকা বিক্রি হয় এই হাটে।
নৌকা মিস্ত্রী কবির জানান, জেলার বাইরে থেকে পাইকারদের বড় বড় ট্রলার এসে একসঙ্গে ১৮ থেকে ২০ টি নৌকা কিনে তারা অন্য জেলায় নিয়ে বিক্রি করে। স্থানীয় নৌকা ব্যাবসায়ী জহর জানান, এ অঞ্চলের ব্যাবসায়ীরা যেহেতু নৌকায় করে খালের মধ্যে ব্যাবসা-বাণিজ্য করে, সে কারনেই ডিঙ্গি নৌকার চাহিদা বেশী। তিনি আরো জানান, ধানী ফসল, বিলের শাপলা, শাক, চাঁইপাতা, নার্সারী ব্যাবসা, পেয়ারা, আমড়া, ঘাষ, পানি কচু ও কলা সহ প্রভৃতি ফসলের বেঁচাকেনা এই ডিঙ্গি নৌকায় করেই খালের মধ্যে হয়ে থাকে।
নৌকা মিস্ত্রি আশুতোষ জানায়, একটি নৌকা তৈরী করতে দুইজন শ্রমিকের সময় লাগে একদিন আর খরচ হয় ৯শ’ টাকা। লাভ থাকে মাত্র ৩শ’ টাকা। ২৫শ’ টাকা দামের একটি নৌকা তৈরীতে দুই শ্রমিকের সময় লাগে ৩দিন। ওই নৌকায় লাভ হয় প্রায় ৭ থেকে ৯শ’ টাকা। আবার কোন কোন নৌকায় গাব, আলকাতরা ও নকঁশীর কারুকাজ থাকলে সে সব নৌকার মূল্য বেড়ে যায়। প্রতি হাটে আটঘর খালে এক থেকে দেড় হাজার নৌকা পসরা সাজে বিক্রির জন্য।
খালের পাশেই রাস্তার ওপর বেঁচাকেনা হয় নৌকার বৈঠা (দাঁড়)। নৌকা বিক্রির সময় বৈঠা দেয়া হয় না। তাই আলাদাভাবে ভিন্ন ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে ১শ’ থেকে ২শ’ টাকায় বৈঠা কিনতে হয়। জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক এই ছয়মাস আটঘর খালে প্রতি শুক্রবার এবং রোববার নৌকা ক্রেতা বিক্রেতাদের নৌকা ও বৈঠা বেঁচা-কেনা চলে।
বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিবছর জৈাষ্ঠ মাস থেকে নৌকা তৈরির কাজ শুরু করেন যা চলে আশ্বিন মাস পর্যন্ত। কিন্তু কাঠ সঙ্কট, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও গ্রাম অঞ্চলে নৌকা ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণে নৌকা কারিগররা পূর্বের মত নৌকা তৈরীতে ক্রমশ আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
অন্যদিকে ইজারাদারদের অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার সম্পূর্ণ মুনফা ভোগ করতে পারছেন না কারিগর ও বিক্রেতারা। এই অঞ্চলের নৌকা ব্যাবসায়ীদের দাবী তাদের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী নৌ হাট সমৃদ্ধ করার লক্ষে নেওয়া হো সরকারি-বেসরকারী উদ্যোগ।
//রবিউল হাসান রবিন/ উপকূল বাংলাদেশ/কাউখালী-পিরোজপুর/১৩০৬২০১৪//
