সংসারের বোঝা কিশোর জামালের কাঁধে
- ০৮:৫৬
- ফিচার, বাঁচার লড়াই
- ৩০৭
সোহরাব হোসেন ।।
লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে সরকারি চাকরি করে দরিদ্র মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবে, টানাটানির সংসারে ফিরিয়ে আনবে সুখ-স্বাচ্ছন্দ। ছোট-ছোট ভাইবোনদেরও মানুষ করবে। এমন আশায় বুক বেঁধেছিল জামাল। কিন্তু বিধাতা জামালের এ সুখ স্বপ্ন বাস-বে রুপ দিলেননা। প্রকৃতির তান্ডবে ভয়াল সিডর কেড়ে নিয়েছে তার মা-বাবা। বই-খাতা নিয়ে স্কুলমুখীর পরিবর্তে ৫ সদস্যের সংসারের ঘানি টানতে তাকে রোজগারে নামতে হয়েছে। দিনভর ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে যা আয় হয় তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে চলে তাদের সংসার। মোটর সাইকেলের চাকার গতির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে তার সংসারের চাকা। শৈশবের লালিত স্বপ্ন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে।
কি করমু কন? আল্লায় মোর কপালে সুখ লেহে নাই। চাইছিলাম লেহাপড়া কইররা মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করমু। সরকারি চাকুরি লইয়া সংসারে সুখ আনমু, ভাইবোনগুলারে মানুষ করমু। তয় সব আশাই হারাইয়্যা গ্যাছে। ভয়াল সিডর সবকিছু তছনছ কইররা দেছে। মা-বাবার অবর্তমানে এহন সংসারের চাকা মোর ঘুরান লাগে। হ্যারা (তারা) বাইচ্যা থাকলে……… বলতে বলতে কণ্ঠভারি হয়ে আসে জামালের। চোখ মুছতে মুছতে বলতে থাকে তার কষ্টের কথাগুলো।
চার বোন আর দু‘ভাইয়ের মধ্যে জামাল দ্বিতীয়। সিডরের রাতে জামাল ঢাকার টঙ্গিতে বড় বোন সাহিদার বাসায় ছিল। বাবা শাহজাহান, মা ফিরোজা বেগম তিন মেয়ে শাহনাজ, নিপা ও তানিয়া এবং ছোট ছেলে শাকিবকে নিয়ে সে ভয়াল রাতে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার চরখালী গ্রামের ছোট ঘরে ছিলেন। গভীর রাতে নদীর পাড়ের বেরিবাঁধ ভেঙ্গে প্রবল স্রোত যখন বাড়ির উঠানে। দমকা বাতাস তার ছোট ঘরটিকে কয়েকটি ধাকা দিতেই হুরমুর করে ভেঙ্গে পড়ল কিন্তু তার আগেই ছেলে-মেয়েদের হাত ধরাধরি করে শাহজাহান ও তার স্ত্রী উঠানো দাড়ালেন। প্রবল স্রোতের তোড়েও সেখানেও টিকতে পারছিলেন না। পানি ক্রমশ বাড়তে থাকে। এক সময় তিন মেয়ে ও ছোট ছেলেটি মা-বাবার হাত ছেড়ে স্রোতে ভেসে গিয়ে কোন একটি গাছে ওঠে বেচে যায়। পরদিন সকাল হতে দেখা গেল শাহজাহান ওইফরোজা বেগম পরস্পরকে ধরাধরি করে ঘরের পাশে রেন্ট্রি গাছের নিয়ে চাপা পড়ে আছে। প্রতিবেশিরা এসে বাড়ির অদূরে গণকবরে দাফন করলেন।
অন্ধকার সেই বিভিষিকাময় রাতের শিহরণ জাগানো ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ওড়নায় বার বার চোখ মুছছিল এবছর জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশ নেয়া জামালের বোন নিপা। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ভয়াল রাতে প্রকৃতির এ তান্ডবে এ উপজেলার ১১৬ জন লোক প্রাণ হারায়। সিডরের সময় জামাল চরখালী সমবায় স্কুলের ৮ম শ্রেনীর ছাত্র ছিল। মা-বাবার অকাল মৃত্যুতে লেখাপড়া শিকেয় ওঠে তার।
সামান্য জমিতে ৩/৪ মাসের খোরাকী হয়। বছরের বাকি সময় বাড়তি আয় করে চালাতে হয়। তাই মা-বাবা হারানোর বছর খানেক পর প্রতিবেশির একটি মোটর সাইকেল ভাড়া নিয়ে প্রতিদিন ২০০/২৫০ টাকায় আয় হয় জামালের। সেই দিয়েই চলে বোন নিপা, তানিয়া আর ভাই শাকিবের লেখাপড়া আর সংসারের সব খরচ। আত্মীয়-স্বজন আর প্রতিবেশিদের সহযোগিতায় বোন শাহনাজকে বছর দু‘য়েক আগে বিয়ে দেয়া হয়েছে। তানিয়া সপ্তম শ্রেনীতে আর শাকিব চতুর্থ শ্রেনীতে লেখাপড়া করছে।
আঠার বছরের যুবক জামালকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে সংসারের ঘানি। সব সুখস্বপ্ন কেড়ে নেয়া ভয়াল সিডরের কথা স্মরণ করতে পারেনা জামাল। এদিনে তার ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে বাতাস। শুধু জামাল নয় তাদের মত অসংথ্য পরিবারের এদিনে কান্নার রোল চলে। ভুক্তভোগি পরিবারগুলোকে শান-না দিতে কোন কিছুই যথেষ্ট নয়।
সোহরাব হোসেন
ডেইলি স্টার করসপনডেন্ট, পটুয়াখালী
