ক্ষত শুকায়নি আইলায় ক্ষতিগ্রস্তদের

0920140525104823.jpgএম. শাহীন গোলদার, সাতক্ষীরা Θ আজ ২৫ মে। ২০০৯ সালের এই দিনে ভয়ঙ্কর ঘুর্ণিঝড় আইলার আঘাতে প্রাণ হারায় উপকূলের দুই শতাধিক মানুষ। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয় প্রায় তিন লাখ লোক। এখনো সারেনি আইলার ছোঁবলের ক্ষত। পাঁচ বছর আগের সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে তাদের।সাতক্ষীরার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার চকবারা গ্রামের ইমান আলীর পরিবারের ১১ সদস্যকে কেড়ে নেয় আইলা। পরের দিন সকালে মৃতদেহগুলো বাড়ির পাশের বিভিন্ন স্থান থেকে কুড়িয়ে আনেন ইমান আলী।
তিন দিন পর খোলপেটুয়া নদী থেকে উদ্ধার হয় তার বড় বোন মোমেনা বেগমের মৃতদেহ।

কেউ কেউ স্বজনদের লাশের সন্ধান পেলেও অনেকেই দিনের পর দিন নদীর দিকে তাকিয়ে থেকে ফিরেছেন ব্যর্থ হয়ে। গাবুরার সোরা পল্লীর আলিমদ্দি আজও সেদিনের তা-বে হারিয়ে যাওয়া সন্তান বায়েজিদের কথা ভেবে ভেতরে ভেতরে কেঁদে চলেছেন। ওই হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুরসহ উপকূলবর্তী পাঁচ ইউনিয়নের শতাধিক পরিবার। এসব পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য আইলার তা-বে মুহূর্তের মধ্যে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।

ক্যালেন্ডারের পাতা গুনে ঠিক পাঁচ বছর আগের এই দিনে উপকূলবাসী প্রত্যক্ষ করে প্রকৃতির নির্মম দানবীয়তা। প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ো বাতাস নিয়ে আইলা দুপুর একটার দিকে আঁছড়ে পড়ে উপকূলে। মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ল-ভ- হয়ে যায়। পটুয়াখালি, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীর হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ, খুলনা ও সাতক্ষীরায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হয়।

গাবুরা ইউনিয়নের কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা দুই দিনের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির পর ২৫ মে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাস ও বৃষ্টির বেগ বেড়ে যায়। বেলা একটার কিছু পরেই সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট সর্বনাশা আইলা আঘাত হানে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে। ঝড়ো বাতাস ও পানির তোড়ে শুরুতেই গাবুরা এলাকার উপকূলরক্ষা বাধ ভেঙে চল্লিশ হাজারেরও বেশি জনবসতি পানিতে নিমজ্জিত হতে শুরু করে বেলা দুইটার পর থেকে। মুহূর্তের মধ্যে সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা ও দাকোপ উপজেলার উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা ল-ভ- হয়ে যায়।
এসময় চারিদিক থেকে আসা নদীর পানি জনবসতিকে তলিয়ে দিয়ে সাগরের উপর অংশের সাথে একাকার হয়ে যায়। অভিন্ন অবস্থা দেখা যায় শ্যামনগর উপজেলার অপর দ্বীপ ইউনিয়ন পদ্মপুকুরসহ আরও তিনটি ইউনিয়নে।

এক মাসের বেশি সময় ধরে এসব এলাকা পানিতে নিমজ্জিত থাকায় মানুষ এলাকা ছাড়তে শুরু করে। অসংখ্য মানুষ পরিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ লাখ ৯৫ হাজার ১২২ জন মানুষ মুহূর্তেই নিরাশ্রয় হয়ে পড়ে। শুধু শ্যামনগরেই গৃহহীন হয় দুই লাখ ৪৩ হাজার ২৯৩ জন। এছাড়া শ্যামনগরের ৯৬ হাজার ৯১৬টিসহ মোট ১ লাখ বিয়াল্লিশ হাজার ২৪৪টি বসতঘর বিধ্বস্তÍ হয়। উপজেলার ৪৮ হাজার ৪৬০ পরিবারসহ মোট এক লাখ ১৪ হাজার পরিবার আইলার আঘাতে সরাসরি ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

আইলার ধ্বংযজ্ঞে ৩৯৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ তিন শতাধিক মসজিদ, মন্দির স¤পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়। ১৭৯ কিলোমিটার রাস্তা সম্পূর্ণ ও ৯৯ কিলোমিটার আংশিক নষ্ট হয়ে যায়। ৪১টি ব্রিজ ও কালভার্টসহ ১১৭ কিলোমিটার বেড়িবাধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুধু শ্যামনগরেই ১২৭ কিলোমিটার উপকূলরক্ষা বাধের ৯৭ কিলোমিটার স¤পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

হাজার হাজার গবাদী পশু আর হাঁসমুরগীর প্রাণহানির পাশাপাশি শুধুমাত্র উপজেলাতেই ১৯৪ হেক্টর ক্ষেত ও ৩২ হাজার ৬৬১ একর চিংড়ি চাষের জমি তলিয়ে যায়। সহস্রাধিক নলকূপ ও দুই হাজারেরও বেশি পুকুর-জলাশয় জলমগ্ন হয়ে পড়ে।

আইলার পর থেকে এলাকায় যে কর্মসংস্থানের অভাব সৃষ্টি হয় তা আজও অব্যাহত। আইলায় লবণাক্ত পানিতে ডুবে যাওয়া পুকুর-জলাশয়গুলোর পানি আজও ব্যবহার উপযোগী না হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাব গোটা উপকূলজুড়ে। আইলার কারণে উপকূলীয় গোটা এলাকা গাছশূন্য হয়ে পড়ায় এসব এলাকা এখন মরুভূমির রূপ নিয়েছে। জ্বালানি ও খাবার পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কর্মসংস্থানের অভাব উপকূলবাসীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

অধিকাংশ পরিবার তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বসতভিটায় ফিরে বসবাস শুরু করলেও কয়েক হাজার পরিবার আজও সেখানে ফিরতে পারেনি।

চারিদিকে বাধ বেষ্টিত এসব জনপদে উপকূলরক্ষা বাধগুলো কোন রকমে সংস্কার করা হলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবে তা এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে পাঁচ বছরেও ফসল উৎপাদনের উপযোগী হয়ে ওঠেনি মাটি। ধ্বংস্তূপে পরিণত হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যক্রম চালু হলেও লেখাপড়ার পরিবেশ আজও স্বাভাবিক হয়নি। আরও দুই থেকে তিন দশক সময় লাগবে উপকূলীয় মানুষের আইলার ক্ষতি কাটিয়ে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াতে।

স্থানীয় খোলপেটুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফরহাদ হোসেন জানান, আইলার পর এখানকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। স্থানীয় পরিবেশ গবেষক শাহীন ইসলাম বলেন, ‘আইলায় খাদ্য নিরাপত্তা বিপর্যস্ত হয়েছে। কৃষকরা লবণাক্ততা মোকাবেলা করে আবার ধান চাষের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাদের এ প্রচেষ্টায় সরকার সহযোগিতা না করলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।’

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তবিবুর রহমান জানান, সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা উপদ্রুত এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে চেষ্টা করছে।

//সৌজন্যে-রাইজিংবিডি/২৫০৫২০১৪//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য