ভয়াল সিডরের দু:সহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে বেতাগীর মানুষ

সাইদুল ইসলাম মন্টু ।।
সিডরের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি বরগুনার বেতাগী এলাকার সিডর ক্ষতিগ্রস্থদের। তারা অবহেলিত, বঞ্চিত, অনেকেই মানবেতর জীবন-যাপন করছে। স্বজনহারা ব্যথা নিয়ে কাটছে অনেকের জীবন, অনেকে এখনো বিধ্বসত্ম ঘড়বাড়ি বানিয়ে দেয়া হবে- এ আশায় বুক বেঁধে কেউ কেউ রাসত্মার পাশে কিংবা বাড়িতে কোনমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থরা ভেঙ্গে যাওয়া ঘর মেরামতের জন্য নামে মাত্র যে টাকা পেয়েছে, তাতে শুধু ঘর বানানোর মিস্ত্রির খরচও হয়নি। ত্রান বিতরনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ বিসত্মর। ঘূর্নিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র ও যেসব আবাসন নির্মাণ হয়েছে তাও অপরিকল্পিত।

ধেঁয়ে আসছে ঘুর্নিঝড় সিডর, ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। ব্যাপক সতর্কতা, মাইকিং চলছে। রাতের আগেই আঘাত হানতে পারে। বুধবার রাত পর্যনত্ম চট্রগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর এবং কক্সবাজারে ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত বহাল ছিল। বৃহস্পতিবার সতর্ক সংকেত সরাসরি ১০ নম্বরে চলে যায়। উপকূলবর্তী এলাকার লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। বিমানবন্দরসহ চট্টগ্রাম বন্দরেরও সকল কার্যক্রম বন্ধ। এভাবেই ঐদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে হুঁশিয়ারি সংকেত দেয়া হয়। ৯ নভেম্বর এর উৎপত্তিস’ল ভারত মহাসাগরে হলেও ১৫ নভেম্বর উপকূলীয় বলেশ্বর অতিক্রমকালে রাত সাড়ে নয়টায় দেশের স’ল সীমায় প্রবেশ করে। প্রথমেই বরগুনা, পরপরই ভোলা পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, মংলা, সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচন্ড আঘাত হানে। শুরম্ন হয় ঝড় বৃষ্টি, ফুঁসে ওঠে সাগরের পানি। কোন কিছু বোঝার আগেই  মুহুূর্তেই সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় ধ্বংসযজ্ঞের নতুন রেকর্ড।

সন্ধ্যা নাগাদ ঘন্টায় ২২০ কিলোমিটার থেকে ২৪০ কিলোমিটার বাতাসের গতিবেগ। রাত যতই বাড়ছে বাতাসের গতিবেগও ততই বাড়তে থাকে। রাত আনুমানিক সাড়ে এগারোটা কিংবা বারোটা বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ২৪০ থেকে ২৮০ কিলোমিটারে পরিনত হয়। আয়তন ২ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার। তবে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশের উপর বয়ে যায়। ‘সিডর’ সিংহলী শব্দ। যার অর্থ চোখ, ১৩১ বছরের ইতিহাসে বড় ১০টি ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে এটি অন্যতম হলেও সুন্দরবনের কারনে গাছ-পালার বাধা পেয়ে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

সিডরের ভয়াবহতার স্মৃতি বেতাগীবাসী আজও বয়ে বেড়াচ্ছে। সেদিন এ উপকূলীয় জনপদে নেমে আসে মানবিক বিপর্যয়। মারা যায় ৩১ জন, আহত হয় শত শত লোক। বেঁচে যাওয়া সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ংকারী এই রাতটির কথা মনে উঠতেই শিউরে উঠে গোটা শরীর। সে সময় এমনটি মনে হয় এখানে কোনদিন কিছুই ছিল না। চিরচেনা গ্রামগুলো ছিলো নীরব, নিথর নিশ্চিহ্ন জনপদের রূপ। বিশ্লেষজ্ঞদের মতে, সিডরের ক্ষয়ক্ষতির পরিমান সঠিক নিরূপন না করা গেলেও ধ্বংসস’পে পরিনত এখানকার শত শত পরিবার সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে, বিধ্বসত্ম হয় ৯০ ভাগ কাঁচা ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ও ক্ষেতের ফসল, কৃষি এবং মৎস্য। ৭০ ভাগ রাসত্মাঘাট, পুল, ব্রীজ, কালভার্ট ও ৭৫ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ৩৬ হাজার ১৬৩ টি পরিবারের মধ্যে ২১ হাজার ২০ জন কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস’ হয়। ১ লাখ ৭ হাজার ২৫১  জন লোক কমবেশি, সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ হয় ৩৪ হাজার ৭৫২ জন লোক। ১০ হাজার ৯ শত ৪৭ টি ঘর আংশিক, সম্পূর্ন বিধ্বসত্ম  হয় ৬ হাজার ৭৭৯ টি ঘর, টাকায় ক্ষতির পরিমান ৫৪ কোটি ৭০ লক্ষ ৫০ হাজার।  আমন ধান ১১ হাজার ৩ শত ৩৪ একর, রবি শস্য ২ হাজার ৮১৬ একর টাকায় ১৯ কোটি ৪৮ লক্ষ ২৮ হাজার, ঘের ১৬৪ টি, গবাদিপশু ১০ হাজার ২ শত, হাঁস মুরগী ৬০ হাজার ১ শত। টাকার হিসেবে ১৪ কোটি ৮৯ লক্ষ ১ হাজার।

সরকারি হিসেব অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়ের কবলে ৩১ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে শিশু ২, নারী ৪ জন। শুধু সরিষামুড়ি ইউনিয়নেই মারা যায় ২২ জন। এছাড়াও বুড়ামজুমদারে ৪ জন, মোকামিয়ায় ২ জন, হোসনাবাদে ২ জন, বেতাগীতে ১ জন। এর মধ্যে কেওড়াবুনিয়া গ্রামের আদম আলীর স্ত্রী আম্বিয়া বেগম, ছোপখালী গ্রামের শাহ আলমের পুত্র মিরাজ হোসেন, দেলোয়ার হোসেনের পুত্র জহিরম্নল ইসলাম শিপন, ছোট মোকামিয়ার মোজাফ্‌ফর সিকদারের স্ত্রী ফতেমা বেগম, মোঃ সেলিমের পুত্র হেলাল, গ্রামার্দ্দন গ্রামের একই পরিবারে হামেদ খানের পুত্র রাকিব, মেয়ে সোনিয়া, স্ত্রী নাজমা বেগম, আবু হাওলাদারের মেয়ে শাহনাজ বেগম, সরিষামুড়ি গ্রামে গফুর হাওলাদারের ছেলে সাইফুল হোসেন, নাজেম আলীর স্ত্রী জমিনা বেগম, গহর হাওলাদারের পুত্র মোঃ সালেক, আঃ মন্নানের পুত্র কবির হোসেন কালু, দুলু শরীফের পুত্র মোঃ লিটন ,স্বপন শরীফ, মফেজ উদ্দিন হাওলাদারের পুত্র মোঃ শাহ্‌জালাল, জালাল উদ্দিন ফরাজির পুত্র আঃ সোবাহান,আব্বাস সিকদারের পুত্র মোঃ সুমন, আঃ অহমেদের মোঃ আলী, শাহজাহানের পুত্র মোঃ আনিচ, হাসেম খার পুত্র মোঃ ইব্রাহীম, হারম্নন মিস্ত্রির পুত্র মোঃ ফরিদ, শাহজাহানের পুত্র মোঃ শামসু, গাবতলী গ্রামের মোঃ হাসেমের পুত্র মোঃ ইলিয়াছ, আবুল কালামের পুত্র মোঃ রাসেল, রাজ্জক আলীর পুত্র মোঃ নুরুল ইসলাম, কালিকাবাড়ী গ্রামের হাসেম মুন্সীর পুত্র মোঃ কালাম, এনাম আলীর পুত্র মোঃ রম্নস’ম হাওলাদার, দঃ কালিকাবাড়ীর হোসেন আলীর পুত্র কালু মিয়া, বেতমোর গ্রামের শাহআলমের পুত্র মোঃ লাবু ও ভোড়া গ্রামের মোসলেমের পুত্র মোঃ ফারম্নক হোসেন ।

এখানকার দুর্গতদের দেখতে অনেকেই ছুঁটে আসে। এরমধ্যে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসুচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের উপ-কান্ট্রি ডিরেক্টর লেরি ন্যারম্নমিকসহ অসহায়দের মাথা তুলে দাঁড়াতে এগিয়ে আসে সৌদি এম্বাসেটর, জাতীয় ও আনর্ত্মজাতিক অনেক গুরম্নত্বপূর্ন ব্যক্তি। সিডরে গণমাধ্যমকর্মীরা সংবাদ পরিবেশনসহ নানাভাবে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে।

সিডরের ভয়াবহ ধ্বংসলীলার ক্ষয়ক্ষতি হয়ত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়, তবে এখানকার জনগোষ্ঠিকে ঘুরে দাঁড়াতে দীর্ঘমেয়াদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। সে জন্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগ অত্যনত্ম জরম্নরি।

সাইদুল ইসলাম মন্টু
সাংবাদিক, বেতাগী, বরগুনা

উপকূল বাংলাদেশ

উপকূল বাংলাদেশ

পাঠকের মন্তব্য