আসুন উপকূলের সঙ্গে থাকি

  • সম্পাদকীয়
  • ২৫০

cyclone-sidr2.jpgকেন্দ্রের খবর প্রান্তে আর প্রান্তের খবর কেন্দ্রে। তথ্য বিনিময়, মতামত বিনিময়। উপকূলের পিছিয়ে পড়া জনপদের নানা তথ্য সেখানকার জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে তুলে আনতে চাই। দুর্গম জনপদের বাসিন্দারাই জানাবেন তাদের সমস্যার কথা। চিহ্নিত হবে উপকূল উন্নয়নের ইস্যু। এ ভাবেই উপকূলের বিচ্ছিন্ন জনপদ সম্পৃক্ত হবে কেন্দ্রের সঙ্গে। অন্ধকারে ঢাকা এলাকার তথ্য-উপাত্ত পৌঁছে যাবে নীতিনির্ধারক মহলে। ‘উপকূল বাংলাদেশ’ এভাবেই উন্নয়ন সহযোগী হিসাবে কাজ করবে।
দেশের দক্ষিণপ্রান্তের পিছিয়ে থাকা জনপদ উপকূল অঞ্চল। যেখানে অযতœ-অবহেলার ছাপ। বছরের পর বছর যুগের পর যুগ অন্ধকারে ডুবে থাকা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ওই জনপদের মানুষগুলো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বহুমূখী সংকটের গন্ডি পেরিয়ে কোনোমতে মেরুদন্ড সোজা করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে মুহূর্তেই আবার ন্যূয়ে পড়ে মানুষগুলো। ভয়াল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সম্পদশালী মানুষেরাও সব হারিয়ে পথে বসে। দুর্যোগের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে উপকূলের মানুষের জীবন। এখানে জীবন বার বার থমকে দাঁড়ায়। নদীভাঙ্গণের কারণে ৮-১০বার করে বাড়ি বদলানো কিংবা ঘূর্ণিঝড়ে সব হারানোই শেষ কথা নয়। প্রকৃতির গা ঘেঁসে বেড়ে ওঠা এই মানুষগুলো এক সময় প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে পারে না। পেশা বদল করে ছুটতে হয় অন্য কোথাও। এসবই উপকূলের মানুষের গা সওয়া। বিপর্যয়ের মুখে বার বার হেরে যাওয়া মানুষেরা তারপরও সাহস করে এগোয়। এক পা দু’পা করে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শেখে। এ যেন প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ। অনেক হতাশার মাঝেও উপকূলের প্রান্তে কান পেতে শোনা যায় সেখানকার অনেক সংগ্রামী মানুষের যুদ্ধজয়ের কাহিনী।
আমাদের চোখের সামনেই বেশ কয়েকটি ঘটনা। ‘ঘটনা’ না বলে এগুলোকে ‘দুর্ঘটনা’ বলাই ভালো। সিডর, নার্গিস, বিজলী, আইলা, গিরি। কে না জানে এইসব প্রাণঘাতি দানব দুর্যোগগুলোর কথা। এভাবেই নামে কিংবা বেনামে উপকূলের বার বার আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। ঘটা করে আসা দুর্যোগগুলোর নাম জানা গেলেও নিরবে আসা অনেক দুর্যোগ উপকূলের মানুষকে বিপদের মুখে ফেলে। উপকূলের জীবন এতটা নাজুক হওয়ার পরও এ অঞ্চলটি পড়ে থাকছে অবহেলায়। আমরা ছোটবেলা থেকে উপকূলের উন্নয়নে অনেক পরিকল্পনার কথা শুনেছি। কিন্তু সেখানকার মানুষের ভাগ্য বদল ঘটেনি। পড়ে আছে যেমনটা তেমনই। এদেশের পাহাড় অঞ্চল, হাওর অঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চলসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অঞ্চলগুলো যেভাবে কেন্দ্রীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন হয়ে উঠেছে, উপকূল অঞ্চল তেমনটা পারেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের কারনে উপকূলের দিকে বিভিন্ন মহলের নজর পড়েছে। উপকূল উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কিছু কাজও হয়েছে। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গেলে বাংলাদেশের উপকূলের কথা আসে সবার আগে। এসব বিষয় উপকূলের জন্য একদিকে ইতিবাচক। ঝুঁকির কারণে উপকূল অন্তত সামনে আসতে শুরু করেছে। উপকূলকে আরও বেশি করে সামনে নিয়ে আসতেই ‘উপকূল বাংলাদেশ’-এর এই প্রয়াস।
উপকূলের সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণে উপকূলের তথ্য-উপাত্ত দেশে ও দেশের বাইরের সব মহলে জানিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় কর্মরত উপকূলের সাংবাদিকদের পাশাপাশি এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত উপকূলের জেলা ও থানা পর্যায়ের সাংবাদিকগণ। সম্পৃক্ত থাকছেন বিচ্ছিন্ন জনপদে বসবাসকারী বিভিন্ন পেশার নাগরিকেরা। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হবে কেন্দ্র থেকে। আবার তারা নিজেরাই লিখবেন নিজেদের সমস্যার কথা। উপকূলের তথ্য প্রচারের এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উপকূলের সার্বিক উন্নয়ন। অবাধ তথ্য প্রবাহ কোনো অবহেলিত অঞ্চলকে এগিয়ে নিতে পারে। অন্ধকারে ছড়িয়ে দিতে পারে আলোর চ্ছটা। ‘উপকূল বাংলাদেশ’ উপকূলের সামগ্রিক চিত্র বিভিন্ন মহলে পৌঁছে দিতে চায়। এর মাধ্যমে উপকূলের খুঁটিনাটি বিষয় আরও সুনির্দিষ্টভাবে সর্বত্র পৌঁছে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। উপকূল অঞ্চলের একটি চোখ হিসাবে দেখা যেতে পারে এটিকে। সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকান্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ ‘ওয়াচডগ’-এর ভূমিকা পালন করবে। আগেই এতকিছু বলতে চাইনা। আমরা বড় করে ভাববো, কিন্তু শুরু করেছি ছোট দিয়ে। এই উদ্যোগ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’-এর তৃতীয় বার্ষিকীতে। আমাদের প্রত্যয় উপকূলের দর্পন হয়ে সবার সহযোগিতা নিয়ে সামনে আগানোর।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য