সবুজ উপকূল, সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি

লেখক : ছাইফুল ইসলাম মাছুম

নোনা জল, ভেজা মাটি, সবুজ তেপান্তর-এই আমাদের উপকূল। উপকূল মানেই তো সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুয়াকাটার সূর্যাস্ত, রাখাইন পল্লী, মেঘনার রূপালী ইলিশ, নিঝুম দ্বীপের মায়াবী হরিন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, সেন্টমার্টিন নারিকেল জিঞ্জিরা, জেলেদের সহজ সরল জীবন, মৌয়ালের খাঁটি মধু, কর্ণফুলীর জাহাজের সারি কিংবা কতুবদিয়ার বাতিঘর।  বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে উপকূলীয় অঞ্চল বিস্তৃত। পশ্চিমে সাতক্ষীরা থেকে পূর্ব-দক্ষিণের কক্সবাজার জেলা পর্যন্ত উপকূলের ব্যাপ্তি। এই উপকূলে রয়েছে হাজারো সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা জাগাতে ভিন্নমাত্রা যোগ করছে ‘সবুজ উপকূল কর্মসূচি।’ এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহনকারী তরুণেরাই আগামীদিনে উপকূলের দু:খের লালবাতি নিভিয়ে, উপকূল জুড়ে জ্বালিয়ে দিবে প্রশান্তির সবুজ বাতি। দুঃখ দুর্দশায় পুরো উপকূল যেখানে অন্ধকার আচ্ছন্ন, সেখানে ‘সবুজ উপকূল’ যেন সাগরপাড়ে আলোর হাতছানি।

তবে উপকূলের কথা ভাবতেই আমাদের চিন্তায় ভিন্নচিত্র ভিড় করে। নদী ভাঙ্গনে উদ্বাস্তু মানুষের হাহাকার। বন্যায় পানিবন্দি জনপদ। ঘূর্নিঝড়ে নিহত মানুষের লাশ। ভেঙ্গে পড়া কাঁচা ঘরবাড়ি। অনাহারী জেলের অসহায় মুখ। দ্বীপাঞ্চলের শিক্ষা বঞ্চিত শিশুদের শিশুশ্রম। বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত ফসলি জমি। নোনাজলে ফসলের ক্ষতি। বিদ্যুত বিহীন ‘এনালগ’ বসতি। বিশুদ্ধ পানির অভাবে রোগাক্রান্ত মানুষ। বিচ্ছিন জনপদ, ট্রলার ডুবিতে ভেসে উঠা লাশ। ট্রলারে ও জনপদে জলদস্যুর হানা। সুন্দরবনে রামপাল। সিডর-আইলার রোয়ানুর আঘাত। নিষ্ঠুর প্রকৃতি প্রতিনিয়ত উপকূলের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক টানাপোড়ন, অসচেতনতা ও সামগ্রিক বাস্তবতায় উপকূলীয় অঞ্চল পিছিয়ে পড়ছে দিন দিন।

উপকূলীয় তরুণদের স্বপ্ন জাগাতে স্কুল ভিত্তিক প্রোগ্রাম ‘সবুজ উপকূল’-এর যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে। উপকূল বাংলাদেশ নামের প্রতিষ্ঠান এর উদ্যোক্তা। উপকূল জুড়ে ভিন্নধারার এই কর্মসূচিতে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও উপকূল সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু বলেন, ’উপকূল জুড়ে স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো এবং সৃজনশীল মেধা বিকাশ এই ব্যতিক্রমী কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য’।

সবুজ উপকূল চলতি বছর কর্মসূচি বিস্তৃত হচ্ছে ১৪ জেলার ২৫ উপজেলায় ২৬টি স্কুল ভিত্তিক কর্মসূচি। এবারের কর্মসূচিতে প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষার্থীকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সবুজ উপকূল অনুষ্ঠানের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহনে দেয়াল পত্রিকা ‘বেলাভূমি’ প্রকাশ। লিখনীর মাধ্যমে উপকূলের নানান সমস্যার চিত্র ‘বেলাভূমি’তে তুলে ধরেন ছাত্রছাত্রীরা। উপকূলের স্কুল থেকে প্রকাশিত দেয়াল পত্রিকা ‘বেলাভূমি’ যে শুধু বিদ্যালয়ের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকছে তা নয়, এই পত্রিকার রয়েছে অনলাইন সংস্করণ। প্রতিটি দেয়াল পত্রিকা থেকে বাছাই করা লেখাগুলো ‘বেলাভূমি’র এই অনলাইন সংস্করণে থাকবে। এর ফলে উপকূলের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের লেখা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বব্যাপী। লেখালেখির সঙ্গে পড়–য়ারা পরিবেশ বিষয়েও সচেতন হচ্ছে। উপকূল সুরক্ষায় গড়ে উঠছে দক্ষ নাগরিক দল।

লেখক : শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা বিভাগ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ঢাকা।

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য