সিডরের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেননি বরিশালের কালিকাপুরবাসী

বিধান সরকার ।।
গাঁওখানির নাম কালিকাপুর। আয়তন বলতে দীঘে এক কিলোমিটার। আর প্রস্থে আধা কিলোমিটার হবে। এর বুক চিড়েই বহমান বরিশাল থেকে লাখোটিয়া হয়ে বাবুগঞ্জগামী পিচঢালা সড়কটি। শ’তিনেক খানার এই গাঁওখানিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোকের বসতি। যাদের সিংহভাগ অতিদরিদ্র। পেশা বলতে ভাগচাষী বা দিনমজুর; নতুবা ভ্যান চালিয়ে জীবনটাকে টেনে নিয়ে চলে কোন রকম। এদেরই একজন প্রতিনিধি মহম্মদ হারুন উকিল (৪৬)। বংশ পদবি উকিল, তবে পেশায় তিনি টেম্পো চালক। বড় তিন মেয়ে ঢাকায় চাকুরি করায় স্ত্রী এবং ছোট দুই সন্তান নিয়ে, বাড়িতে টানাপড়েনের মধ্য দিয়েও সুখেই ছিলেন। যার উপসি’তি টের পাওয়া যায় তার বর্ণনায়। বাল্য থেকে অনাথ বলে কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত সুখ তার জীবনে বেশীদিন স্থায়ীত্ব পায়নি। তার ওপরে ২০০৭ সলের ১৫ নভেম্বরের সিডর, ওলট-পালট করে দেয় সবকিছু। ঘর সংলগ্ন বিশালাকৃতির রেইনট্রি গাছের চাপায় দুই শিশু সন্তানসহ স্ত্রী পারম্নল বেগমের তাৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়। হারুন উকিল নিজেও মাথায় আঘাত পেয়ে অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন ঘন্টা দু’য়েকের মতো। জ্ঞান ফিরে এলে স্ত্রী-সন্তানদের খুঁজতে গিয়ে গাছের ডাল আর ঘরের চালা সরাতে থাকেন একাকী। এমনি করে স্ত্রীর মরদেহের কাছে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। হারুন উকিল জানালেন, হাত দিয়ে দেখেন শরীর তখনো গরম, তবে মুখে কথা নেই। সন্তান দু’টির মৃতদেহ পান শেষ রাতে সিডরের তান্ডব থেমে যাওয়ার পর, নিকটবর্তী বাড়ির লোকেরা এসে বের করলে। বড় বোন জাহানারা বেগমের বর্ণনায়- ভাইয়ের মাথায় আঘাত লাগায় এবং স্ত্রী-সন্তানদের মৃত্যুশোকে পাগল হয়ে গিয়েছিল প্রায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা করাতে হয়েছে। দেড় লক্ষাধিক টাকা খরচ হলেও সাহায্য পেয়েছেন নামে মাত্র। সিডরের বয়স তিন বছর পার হলেও হারুন উকিল নিজ বসত ভিটায় ঘর উত্তোলন করতে পারেননি বলে, সেই থেকে আজো ভাড়ায় থাকেন ষ্টীল ব্রিজ লাগোয়া আবাসে। আর এই গ্রামের রাঢ়ী বাড়ির সেকান্দার রাঢ়ীর ঘরখানিও আজো তুলতে পারেননি অর্থাভাবে। অমনিভাবে বসত ঘর, ক্ষেতের ধান, কলা বাগান, টমেটো ক্ষেত, মুরগির খামারসহ নানাবিধ গাছের ক্ষতির বোঝা আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন আবুল কালাম হাওলাদার, রজ্জব আলী সরদার, দলিল উদ্দিন রাঢ়ী, নুরুল ইসলাম বেপারী, শাহিনুর বেগমের মতো গাঁওখানির ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় অর্ধেক পরিবার। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কারো কারো মতে আরো তিন থেকে দশ বছর লেগে যাবে। এক্ষেত্রে ত্রাণের সুষম বন্টন ও স্বল্পতার পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের অনিয়মের কথাও খুব করে বলেছেন কেউবা।

সিডরের রাতের তান্ডব সম্পর্কে বর্ণনায় বর্ষিয়ান দলিল উদ্দিন রাঢ়ী বলেন, ঐ দিন সন্ধ্যা থেকেই ঝিরি ঝিরি করে বাতাস বইতে শুরু করে। আর ঝড় শুরু হয় তখন সাড়ে ৯টা থেকে ১০টা হবে। বৃষ্টির সাথে ঝড়ের তীব্রতা বাড়তে থাকে রাত ১১টার পর থেকে। তাদের এই কালিকাপুর গ্রামে প্রথমে উত্তর-পূর্ব কোন থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণে ঘুড়েছে বাতাসের গতিবেগ। অবশেষে পশ্চিম দিকে থেকে মিলিয়ে চারদিক থেকেই সিডরের তান্ডব লক্ষ্য করা গেছে। আগুনের হল্কায় পরিস্কার দেখা যাচ্ছিল। ভাগ্য ভালো এখানে পানির চাপ খুব হয়নি। আর বাতাসের চাপ গেছে উপর থেকে। এজন্য বড় ধরনের গাছপালা একবারে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলেছে। ওই গাছ যেসব ঘরে পড়েছে তাদের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। ফসলের ক্ষতি বলতে মাঠে তখন ইরি ও আমন ধান ছিল। বাতাসের প্রচন্ড বেগে সিডরের পরদিন ক্ষেতে গিয়ে দেখতে পান, ধান সব পড়ে আছে মাঠে আর গাছগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে। অমনি ভাবে যারা কলার বাগান আর টমেটো লাগিয়েছিল তাদের অবস্থা অবর্ণনীয়। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক এবং আশা থেকে ঋণ নিয়ে টমোটো ও করলার চাষ করেছিলেন ভাগচাষী কালাম হাওলাদার। বাড়িতে আছে মুরগীর খামার। সব মিলিয়ে তাদের দেড় লক্ষাধিক টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। যা পুষিয়ে উঠতে আরো ৫/৬ বছর লেগে যাবে বলে জানান তার স্ত্রী সেলিনা বেগম। সাহায্য পাননি বলে ফের ঋণ নিয়েছেন। সাহায্য নিয়ে কথা ওঠায় মধ্যবিত্ত এক কলাচাষী ও পোল্ট্রি খামারী ক্ষোভের সাথে বললেন, ত্রাণ না দিয়ে যার যা ক্ষতি হয়েছে সে অনুযায়ী উপকরণ বন্টন করা উচিত ছিল। যে গরীব ভূমিহীন, তাকে সার দেয়া হয়েছে। সে তো ওই সার বিক্রি করে দিয়েছে। এমনও হয়েছে কেউবা ১০ থেকে ১২ বার ত্রাণ নিয়েছে। আর গাড়ি চলাচলের সড়ক এই কালিকাপুর গ্রামের মধ্যদিয়ে হওয়াতে রাসত্মায় যারা প্রথমে এসেছেন তারাই ত্রাণ থেকে শুরু করে অন্যান্য সহায়তা পেয়েছেন। তার দৃষ্টিতে দু:স’ পরিবারগুলো ত্রাণ পেয়ে অলস হয়েছে। এখনো তারা ফিবছর নভেম্বর মাস এলেই জিজ্ঞাসা করেন রিলিফ আসবে কবে নাগাদ, এমন কথা জানালেন এই ইউনিটের ইউপি সদস্য লেহাজ উদ্দিন হাওলাদার। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রামের ৩’শ গৃহের মধ্যে ৫০টি সম্পূর্ণরূপে বিধ্বসত্ম হয়েছে। আর আংশিক ক্ষতির পরিমাণ হবে শ’খানেক। লেহাজ মেম্বর ৭/৮টির ন্যায় পোল্ট্রি খামার, গাছপালা, মাঠের ফসল সব মিলিয়ে আনুমানিক লাখ বিশেক টাকার ক্ষতির কথা বলেছেন। তবে ইউপি সদস্যের ওই হিসেব ছাপিয়ে কেউবা চল্লিশ লাখ থেকে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শামসুল আলম ফকির জানিয়েছেন, কালিকাপুর গ্রামের ক্ষতির পরিমাণ অর্ধকোটি টাকার নিচে হবে না।

কালিকাপুর গ্রামে উকিল বাড়ি ছাড়াও ঘরে গাছ পড়ায় মৃত্যু হয়েছে মেম্বর বাড়ির আমির হোসেন (৭০) নামের এক বৃদ্ধের। তবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা হারুন উকিল, তার স্ত্রী-সন্তানদের মৃত্যুর পিছনে সম্পর্কে চাচা নুরুল ইসলাম উকিলকেই দায়ী করেন। শৈশবে বাবা মারা যাওয়ায় বাবুগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর নামক গ্রামে মামা বাড়িতে বেড়ে ওঠেন হারুন। প্রাথমিকের গন্ডি পাড়ানোর আগেই মামাদের সংসারে কাজে নামতে হয়। কৈশোর পেরোনো বয়সে ভগ্নিপতির সাথে চট্টগ্রামে গিয়ে জুট মিলে কাজ নেন। পৈত্রিক ভিটেয় দীর্ঘদিন অনুপসি’তির সুযোগে পুলিশে কর্মরত চাচা ও অন্যরা মিলে অর্ধ একর সম্পত্তি বাগিয়ে নেয়ার ফন্দি আঁটে। অবশেষে বিয়ে করে স্ত্রী নাসিমা বেগমকে। পৈত্রিক ভিটায় বসত করা শুরু করলে প্রতিপক্ষের সমস্যা আরো বেড়ে যায়। চাচা নুরুল ইসলামের রান্নাঘর লাগোয়া রেইনট্রি গাছটি লাগিয়েছিলেন হারম্ননের বাবা কেরামত আলী উকিল। ১৫ নভেম্বর সিডরের সপ্তাহ খানেক আগে রেইনট্রি গাছটি ২০ হাজার টাকায় চাচা হারুন উকিল বিক্রি করে দিলে থানা পুলিশে অভিযোগ করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই রেইনট্রি গাছের ৪টি শিকড় ক্রেতারা কেটে ফেলেন। সিডরের দিন সন্ধ্যার পর হারুন উকিল বাইরে না গিয়ে কন্যা পারম্নল ও পুত্র সায়েমকে অংক দেখাতে বসেন। তারা বাবুগঞ্জ মডেল স্কুলে যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তো। রাত ৮ টার দিকে ভাত খেয়ে সন্তানদের নিয়ে স্ত্রী নাসিমা বেগম ঘুমাতে যান। হারুন সবে সিগারেট ধরিয়েছেন মাত্র। ঠিক এ সময়ে শো-শো আওয়াজ শুনে স্ত্রীকে বলতে যাবেন উঠে বসো, কিসের শব্দ দেখোতো। কথা শেষ না হতেই সব শেষ হয়ে যায়। বিশাল রেইনট্রি গাছটি ঘরের উপর পড়ায় স্ত্রী-সন্তানদের বুক থেকে নিচের অংশ থেতলে যায়। চাচার ঘর থেকে ডাক দিলে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের বাঁচাতে পারতেন বলে বিলাপের সুরে বলতে থাকেন। সহায়তা বলতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিয়েছিলেন ১৫ হাজার টাকা ও সহায়তা করেছিলেন বরিশাল জেলা বার, ব্র্যাক ও আশা সংস্থা থেকে। ওই টাকা জানাজা ও মিলাদে খরচ হয়েছে। দু’বান্ডিল টিন পেয়েছিলেন। যার এক বান্ডিল আবার স্থানীয় ইউপি সদস্য চেয়ে নিলে আজ অবধি ফিরিয়ে দেয়নি। একেতো স্বজন হারা বেদনা, তার উপরে আর্থিক সংকট ও শারীরিক সমস্যা, সব মিলিয়ে হারুন উকিল আর বাড়িমুখো হতে পারেননি। এভাবে আর্থিক সংকটের ফলে আজ অবধি বসত ভিটায় ৫ থেকে ৬ টি পরিবার ঘর তুলতে না পেরে হয়েছেন শহরমুখী। শাহিনুর বেগমের পোল্ট্রি খামার আজো ভগ্নাবস্থায়। মেরামত করতে পারেননি বলে নেট টাঙিয়ে তবেই মুরগি রাখছেন। কলার বাগান আর কোনদিন করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয়ের কথা বললেন রোকেয়া বেগম। সিডরে ক্ষতিগ্রস্থ ঘর মেরামতের জন্য কিসিত্মর টাকা গুনতে হবে নূর মহম্মদ সরদারকে। আবার নতুন করে তার গড়তে হবে তাঁত মেশিন। সব মিলিয়ে অতি দরিদ্রের সংখ্যা কমেনি বরং বেড়েছে। এ অবস্থা থেকে উন্নতির জন্য পেশা অনুয়ায়ী এখনো উপকরনাদি বা আর্থিক সহায়তা দিয়ে, আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তার জন্য সুপারিশ করেছেন স্থানীয়রা।

বিধান সরকার
সাংবাদিক, বরিশাল

উপকূল বাংলাদেশ

উপকূল বাংলাদেশ

পাঠকের মন্তব্য