ভয়াল ২৯ এপ্রিল, উপকূলে নিয়ে আসে কষ্ট-বেদনা!

ভয়াল ২৯ এপ্রিল

কুতুবদিয়া, কক্সবাজার : ভয়াল ২৯ এপ্রিল। ১৯৯১ সনের ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি এখনো ভুলতে পারেনি না উপকূলের ১৯ জেলার মানুষ। বিগত ২৬ বছর অতিবাহিত হলেও সেই সময়ের স্মৃতি ভোলা যায় না। এই দিনে পিতা-মাতা, সন্তান হারা পরিবারে স্বজনদের কান্নার আহাজারি ভারি করে তোলে পরিবেশ।

চৈত্র-বৈশাখ মাসে এমন ঘূর্ণিঝড় জনমে দেখেননি, বললেন কুতুবদিয়া দ্বীপের ৮৯ বছরের বৃদ্ধা আবদুল মালেক। বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসের গরমে খাল বিল চৌচির হয়ে যায়। এ সময় ঘূর্ণিঝড় বা তুফান হওয়ার কথা প্রশ্নই উঠেনা। ঐ জন্য অবহেলা করে সমুদ্র উপকূলের মানুষ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্তক বার্তার সংকেত তোয়াক্কা করেনি।

আবদুল মালেকের ভাষায়, ওইদিন বিকাল ৪টা হতে গুটি গুটি বৃষ্টি শুরু হয়। যতই রাত ঘনিয়ে আসছিল, ততই বাতাসের গতিবেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেড়িবাাঁধের পাশের পরিবারের লোকজন বাতাস আর জোয়ারের অবস্থা খারাপ দেখে নিকটবর্তী সেমিপাঁকা ঘর ও পাকা দালানে আশ্রয় নিলেও অধিকাংশ মানুষ নিজের ঘরেই ছিল। রাত যতই গভীর হচ্ছিল, বাতাসের গতিবেগ ততই বাড়তে থাকে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে সমুদ্রের জোয়ারের পানি বাড়তে থাকে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষায়, রাত ১১টার দিকে শুরু হয় বাতাস। বাড়তে থাকে জোয়ারের পানি। এমন পর্যায় গেছে নিচু এলাকায় ১৮-২০ফুট জোয়ারের পানি। হায়রে মানুষের আহাজারি। জোয়ারে ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ার পর উচুঁ গাছে আশ্রয় নিয়েও মানুষ রক্ষা পায়নি। জোয়ারের স্রোতে ভেসে গেছে আপনজন। মা-বাবা সামনে ছেলে সন্তান, ছেলে সন্তানের সামনে মা-বাবা, স্ত্রী জোয়ারের স্রোতে ভেসে গেলেও কেউ কাউকে রক্ষা করার সুযোগ ছিল না।

এমনও দেখা গেছে, মা-ছেলে একে অপরকে রক্ষা করতে গিয়ে দু’জনই লাশ হয়ে পড়ে আছে চরে। ঘূর্ণিঝড় তুফানের শেষে খাল বিল চরে সারিসারি লাশের মিছিল কেই কারো খবর নেয়ার বাঁক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। নিজের সামনে মা-বাবা,স্ত্রী সন্তানের লাশ দেখে কি করবে এই চেতনা নেই। এমনও পরিবার আছে সকল সদস্য ঘূর্ণিঝড়ে একসাথে মারা গেছে। ঘূর্ণিদূর্গত মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল পূনরায় সংসার করবে, মায়া মমতার বন্ধনে আবদ্ধ হবে এই স্মরণ শক্তি। দিন, মাস বছর অতিবাহিত হতে হতে ২৬ বছর চলে গেল এই স্মৃতির পাতা।

কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপকূলের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ ঘূর্ণিঝড়ে মারা য়ায়। এসব পরিবারের আত্মীয়স্বজন এই দিনে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শোকে মাতম হয়ে উঠে।

১৯৯১ সনের ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া বেড়িবাঁধ ২৬ বছরেও পূননির্মাণ করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষ। ১৯৯১ সনের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে পানি সম্পদ সমন্ত্রণালয় কক্সবাজারের পাউবোর ৭১ পোল্ডারের কুতুবদিয়া দ্বীপ রক্ষার ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ২৬ বছরে দুইশত কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বর্তমানে অরক্ষিত হয়ে পড়ে আছে কুতুবদিয়া দ্বীপবাসী। কুতুবদিয়া দ্বীপে জোয়ার-ভাটা বসছে। প্রতিনিয়তই আসছে জোয়ার ভাসছে মানুষ। রাজনৈতিকভাবে বাঁধ রক্ষার আশ্বাস দিলেও দ্বীপবাসীর স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে।

১৯৯১ সনের ঘূর্ণিঘড়ের পর থেকে কুতুবদিয়া দ্বীপের উপর বয়ে যাওয়া প্রতিনিয়তই জোয়ারের দূর্ভোগের কারণে শত শত পরিবার পৈত্রিক ভিটিবাড়ি ফেলে দেশের মূল-ভূখন্ডের পাহাড় পর্বতে গিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এমনকি চট্টগ্রাম বিভাগের অধিকাংশ উপজেলায় কুতুবদিয়া দ্বীপের লোক বসতি গড়ে তোলে কুতুবদিয়া পাড়া নামে স্থান করে নিয়েছে।

//প্রতিবেদন/২৯০৪২০১৭//


এ বিভাগের আরো খবর...
উপকূল দিবসের দাবি উপকূল দিবসের দাবি
‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন ‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন
বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক
পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন
উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প
কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’ কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’
শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন
জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল
একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’ একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’
‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার ‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার

ভয়াল ২৯ এপ্রিল, উপকূলে নিয়ে আসে কষ্ট-বেদনা!
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)