চোখ বুঝলেই দেহি লাশ আর লাশ

সিডর স্মৃতিস্তম্ভ, নলটোনা, বরগুনা

বরগুনা: এই দিন আইলেই আর ঘুমাইতে পারি না। চৌখ(চোখ) বুঝলেই দেহি লাল আর লাশ। হুনতে (শুনতে) পাই স্বজনদের চিৎকার। বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের ভয়াবহ সেই বন্যার কথা এভাবেই বলছিলেন আবু জাফর(৪৫)। সিডরের সেই রাতে তিনি হারিয়েছেন তার পরিবারের চয় জন সদস্যকে। তাইতো সেই রাতের কথা মনে পড়লে অজান্তেই জল এসে যায় তার চোখে। তবু বলছিলেন সেই সময়ের কথা।

মহাবিপদ সংকেতের কথা শুনে আতঙ্কিত বরগুনা উপকূলের মানুষ। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির সাথে দমকা হাওয়া বইছে। কেউ কেউ আশ্রয় কেন্দ্রে গেলেও বেশিরভাগ মানুষই রয়ে গেলো নিজের ঘরে। তাদের মনে করেছিল এরকম ঝড় তো প্রতিবারই আসে এতে আর কি হইবে। রাত ১০ টার দিকে আঘাত হানল সিডর। মাত্র ১০ মিনিট স্থায়ী এই জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের কয়েক হাজার মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পরলো। পুরো এলাকা হয়ে গেলো লন্ডভন্ড। চারিদিকে ধ্বংসলীলা। নদীতে দেখা গেলো লাশের পর লাশ। কবর দেবার জায়গা পাওয়া যাচ্ছেনা। এক একটি কবরে ২/৩ জনের লাশ ফেলে মাটি চাপা দেয়া হলো।

বরগুনা সদর উপজেলার মাঝের চর গ্রামের আ. রশিদ নিজ চোখে সে দিন দেখেছিলেন সিডরের ভয়াবহতা। তিনি নিউজ২৪ঘন্টাকে বলেন, সিডরে নিজের চোখের সামনে একমাত্র পুত্র সন্তানকে হারিয়েছি। বাবা কাধে ছেলের লাশ কি যে যন্ত্রনার তা বলে বোঝানো যাবে না। সেই রাত আর পরের দিনের বিধ্বস্ত জনপদ আজীবন বরগুনা বাসীর মনে ক্ষত হয়ে থাকবে যা কখনো শুকাবে না।

বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের রোজিনা বেগম সিডরের সময় হারিয়েছেন তার ৫ বছর ও ২৪ দিন বয়সি দুই সন্তানকে। তাই এই দিন আসলেই তার চোখের ঘুম চলে যায়। সারারাত কাদেন ঘরের মেঝেতে বসে।

এরকমই স্বজন হারানোর বেদনায় ভারী হয়ে উঠেছিলো বরগুনাসহ গোটা উপকূল। বরগুনা সদর উপজেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার নাম নলটোনা। যেখানে সিডরের এক বছর আগে থেকেই বেরীবাধ ছিলনা। সিডরের সময় সেখানে ২০ ফুটের মতো পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল। ঘূর্নিঝড়ের পরের দিনই সেখানে অর্ধ শতাধিক মানুষের লাশ পাওয়া যায়। তখনও এলাকাটি পানির নিচে হাবুডুবু খাচ্ছিল। লাশ দাফনের জন্য কোন স্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। লাশগুলো নিয়ে আসা হয় বরগুনা-নিশানবাড়িয়া সড়কের পাশে পশ্চিম গর্জনবুনিয়া গ্রামে। দাফনের কাপড় ছাড়াই ৩৩ জনকে ১৯ টি কবরে মাটি চাপা দেয়া হয়। জায়গার অভাবে ৫ টি কবরে ৩ জন করে ১৫ জন, ৪ টি কবরে ২ জন করে ৮ জন ও ১০ টি কবরে ১ জন করে ১০ জনের লাশ দাফন করা হয়। কবরগুলোকে একটু উচু করে রাখা হয়েছে।

বরগুনা প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা সংগ্রাম সম্প্রতি ইট দিয়ে কবর স্থানটি ঘিরে দিয়েছে। সারিবদ্ধ কবর দেখে মানুষ এসে থমকে দাড়ায়। কেউ কেউ কান্না চেপে রাখতে পারেননা। সিডরের স্মৃতি হয়ে আছে কবরগুলো।

কবরগুলোতে শুয়ে আছেন, নলটোনা গ্রামের তাসলিমার বাবা আবদুর রশিদ (৫৫), মা আম্বিয়া খাতুন (৫০), ছেলে আল আমিন (৭), ফোরকানের বাবা দিন আলী (৬৫), হাসি বেগমের মেয়ে শাহিনুর (৪), শাহজাহানের মা তারাভানু (৬০), মেয়ে খাদিজা আক্তার (৩), আনিসের স্ত্রী খাদিজা বেগম (৩০), ছেলে আবু বকর (৩), রফেজ উদ্দিনের স্ত্রী বিউটি বেগম (৩৫), মাসুমের মা হেলেনা আক্তার (৩০), বাদলের মা লালবরু (৬৭), বাবুলের মেয়ে জাকিয়া আক্তার (৮), আবদুস সত্তারের স্ত্রী সাফিয়া খাতুন (৩০), ছেলে রেজাউল (১২), রেজবুল (৭), মেয়ে সাবিনা (৯), সগির হোসেনের মেয়ে সোনিয়া আক্তার (৩), আবদুর রবের ছেলে হোসেন আলী (১২), মেয়ে ময়না (৭), হোসনেয়ারা (৫), শাশুড়ী মনোয়ারা বেগম (৫০), সরোয়ারের স্ত্রী জাকিয়া আক্তার (৩০), মেয়ে রোজিনা (৪), ছত্তারের স্ত্রী বেগম (৫০), পুত্রবধু নাজমা আক্তার (৩০), নাতি পারভেজ (৪), নাসির উদ্দিনের স্ত্রী হোসনেয়ারা (২৬) ও গর্জনবুনিয়া গ্রামের গনি বিশ্বাসের ছেলে জাহিদ হোসেন (৫) ও খাদিজা আক্তার (৩০)। বাকী ৩ জনের নাম আজো জানা যায়নি।

বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু জাফর সালেহ বলেন, প্রলয়ংকারী সিডরের নিহতদের স্মরনে সরকারি উদ্যোগে কোন স্মৃতি স্তম্ব করা হয়নি। তাই প্রেসক্লাব স্থানীয় উন্নয়ন সংগঠন সংগ্রামের সহযোগীায় সদর উপজেলার নলটোনা গ্রামে একই কবরে ৩৩ জনকে দাফন করা স্থানটিকে সিডর স্মৃতি স্থম্ব হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রতিবছর সিডর দিবসে এখানে মাছুষ আসে তাদের স্মরণ করতে।

তিনি আরো বলেন প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবছরও সিডর স্মৃতিস্তম্ভে পালন করা হয়েছে সিডর দিবস। দিবসটি উপলক্ষ্যে নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

//প্রতিবেদন/নিউজটোয়েন্টিফোরঘন্টা ডটকম-এর সৌজন্যে/১৫১১২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য