আকাশে নানা রঙের ঘুড়ি, সৈকত পেয়েছিল বর্ণিল রূপ
সুজাউদ্দিন রুবেল, কক্সবাজার।। সোনালি রোদে পড়ন্ত বিকেলে কক্সবাজার সৈকতের আকাশে উড়ছে নানা রঙের ঘুড়ি। আকাশপানে ঘুরির দিকে তাকিয়ে দুরন্ত শৈশবে ফিরে যাচ্ছেন পর্যটকসহ অনেকেই।
রং-বেরঙের ঘুড়ির ভেতরেই শৈশবের স্মৃতি বেশি মুখরিত হয়ে ওঠে। আর এ শৈশব বন্ধনের ঘুড়ি উৎসবটি ছিল শুক্রবারে। বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী জাতীয় ঘুড়ি উৎসবের প্রথম দিন ছিল শুক্রবার।
উৎসবে ঢাকার মতিঝিল থেকে আগত পর্যটক দম্পতি শাহান আহমদ ও হোসনে আরা ঘুড়ির নাটাই হাতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। শাহান আহমেদ বলেন, ‘শৈশবে আকাশে কত ঘুড়িই না উড়িয়েছি, ভেসে বেড়িয়েছি মুক্ত মনে। দুরন্ত শৈশব, ঘুড়ি-লাটাই, মুক্ত আকাশ, গ্রামের বিস্তৃত মাঠ- সবই এখন স্মৃতি। আজ জীবনের এই মধ্য বেলায় ঘড়ি-লাটাই হাতে যেন সেই শৈশবকে ফিরে পেয়েছি।’
ভিকারুন্নেছা নুন স্কুল এন্ড কলেজে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ফারিহা (১২) কান্না করে বলছে, ‘বাবা ঘুড়ি দাও, তুমি আমাকে নিয়ে এসেছ ঘুড়ি দেবে বলে। কিন্তু তুমি আমাকে ঘুড়ি দিচ্ছ না কেন।’ অবশেষে বাবা তার মেয়ের কান্না থামাতে নিয়ে আসে মৎস্যকন্যা, অতঃপর মেয়ের মুখে হাসি। সেই হাসি দেখে বাবাও খুশি।
শেষ বিকেলে দেড় শতাধিক বিভিন্ন রংগের ঘুড়ি যখন একে অন্যের গা ঘেঁষে মুক্ত আকাশে ভাসছিল, তখন মনোরম পরিবেশ দেখার জন্য জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার দর্শক। ঘুড়িগুলো দেখতে যেমন বিচিত্র, ঠিক তেমনি নামগুলোও বিচিত্র।
এ উৎসবে সাগরের আকাশ ছেয়ে যায় বেসাতী, ড্রাগন, ডেল্টা, মাছরাঙ্গা, ঈগল, ডলফিন, অক্টোপাস, সাপ, ব্যাঙ, মৌচাক, কামরাঙ্গা, পেঁচা, ফিনিক্স, পালতোলা নৌকা, শুকপাখি, চিল, কাকতাড়-য়া, উড়োজাহাজ, স্যাটেলাইট, পোট্রেট, জেলিফিশ, গরুরগাড়ি, মৎস্যকন্যা, ফিঙে, শালিক, মিকিমাউস, বাঘ, ইলিশ, টাইগার, প্রজাপতিসহ নানা নকশা ও রঙ্গের ঘুড়ি।
সেই সঙ্গে পকেট কাইট, বাজিকর কাইট, ড্রাগন কাইট, সিরিজ কাইট, ট্রেন কাইট উড্ডয়ন এবং এই প্রথম বাংলাদেশের আকাশে উড়েছে মাইক্রোলাইট প্লেন। এ ঘুড়িগুলো দর্শকদের বেশ আনন্দ দেয়।
‘প্রকৃতি পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব সবার-ধর্ম যার যার, উৎসব আনন্দ সবার’ স্লোগানকে ধারণ করে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে শুক্রবার বিকালে দু’দিন ব্যাপী জাতীয় ঘুড়ি উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি।
তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধ কে মানতে হবে আর মুক্তিযুদ্ধ কে যারা মানবে না তারা বাংলাদেশে থাকবে পারবে না। ঘুড়ি যেমন আমরা আকাশে উড়াবো তেমনি আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নকে নিয়ে আকাশে পাড়ি দেবো একটি সমৃদ্ধি, সুন্দর এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য।
এছাড়াও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশস্থ চীনা দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত লি জুন, কক্সবাজার সদর-রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারেশন এর সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান মৃধা বেনু ও ওয়ালটনের উপ-পরিচালক এফ এম ইকবাল বিন আনোয়ার।
সাগরের অক্টোপাস যখন আকাশে উড়ে, তখন মানুষের অবাক হওয়ার-ই কথা। আর সেইসঙ্গে যদি উড়তে থাকে লেজওয়ালা সাপ, ড্রাগন- তাহলে তো কথা নেই। শুক্রবার কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ঘুড়ি উৎসবে আসা মানুষের কাছে এমনটিই মনে হচ্ছিল। সমুদ্র তীরের পুরো আকাশ জুড়েই ছিল রঙের খেলা।
বাংলাদেশ ঘুড়ি ফেডারেশন এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহান মৃধা বেনু রাইজিংবিডিকে জানালেন- আমাদের অন্য অনেক কিছুর মতো ঘুড়ির ঐতিহ্যও হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের মুক্ত মনে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্নটাও। তাই শিশু মনে স্বপ্ন বিকাশের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন। এতে করে বড়রাও আকাশ এবং পরিবেশ নিয়ে ভাবার সুযোগ পাবে।
প্রসঙ্গত, প্রতিবছর পৌষসংক্রান্তির আগের শুক্রবার ও শনিবার এ উৎসবের আয়োজন করা হলেও এবার রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে জাতীয় ঘুড়ি উৎসব বিলম্বে আয়োজন হয়।
