পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় উৎসবমূখর আয়োজনে উপকূলের পরিবেশ সুরক্ষার আহবান

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছেন কলাপাড়া নির্বাহী অফিসার এ বি এম সাদিকুর রহমান

কলাপাড়া, পটুয়াখালী, ২২ আগস্ট ২০১৬ : স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের সবুজ সুরক্ষার আহবানের মধ্যদিয়ে উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর কলাপাড়ার খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হল ‘ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক সবুজ উপকূল ২০১৬’ কর্মসূচি। সোমবার (২২ আগষ্ট) এ উপলক্ষে বিদ্যালয় মিলনায়তনে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সবুজের আহবানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রচনা লিখন, ছড়া/কবিতা লিখন, পত্র লিখন, সংবাদ লিখন ও ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। প্রত্যেক প্রতিযোগিতা তিনজনকরে বিজয়ী পুরস্কার পায়। এছাড়াও কর্মসূচির আওতায় ছিল আলোচনা সভা, গাছের চারা রোপণ, মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও ‘সবুজ উপকূল’ বিষয়ক একাংকিকা পরিবেশিত হয়।

‘নতুন প্রজন্মের জন্য চাই সবুজ উপকূল’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ বি এম সাদিকুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পটুয়াখালী শাখার দ্বিতীয় কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলাম, কলাপাড়া মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু সাঈদ, কলাপাড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী মো. হুমায়ূন কবির।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচির স্থানীয় বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক মো. আনোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন কলাপাড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচির স্থানীয় বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব মেজবাহউদ্দিন মাননু।

কর্মসূচির প্রেক্ষাপট ও উপকূলের সার্বিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেন, সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচির কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ও উপকূল বিষয়ক ওয়েব জার্নাল উপকূল বাংলাদেশ-এর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মন্টু। অনুষ্ঠানের শুরুতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য তুলে ধরে খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী মেহজাবিন। এছাড়া অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী আল-শেফা পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত, সপ্তম শ্রেণীর নম্রতা মুন পবিত্র গীতা থেকে পাঠ এবং পল্লবী, পুজা, শতাব্দী, তুবা, মুনম নীপা সবমেত জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশ করে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে অতিথিগণ বলেন, শুধু পাঠ্য বইয়ের পড়া মুখস্ত করে পরিক্ষায় ভালো ফলাফল করলেই চলবে না। এর পাশাপাশি চারপাশের জগত সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। উপকূলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। ভালো ফলাফলের সঙ্গে সাধারণ জ্ঞানের সংমিশ্রনই পারে মানুষের মত মানুুষ করে তুলতে। তোমাদেরকে ভালো মানুষ হয়ে প্রদীপের মত আলো জ¦ালাতে হবে, যাতে তোমার আলোতে আরও অনেকজন আলোকিত হতে পারে।

অনুষ্ঠানে দায়িত্বরত ভলান্টিয়ারগণ

আলোচনা সভায় বক্তারা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, উপকূল সুরক্ষায় আগামী প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। উপকূল অঞ্চল বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এ অঞ্চলে প্রতি বছর হানা দেয়। এইসব কারণে আজকের পড়ুয়ারা ঝুঁকির মুখে আছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে নানান সমস্যা। এইসব সমস্যা মোকাবেলায় আগামী প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু গাছ লাগানো নয়, এর পাশাপাশি চারপাশের পরিবেশ রক্ষায় সজাগ হতে হবে। পরিবেশ ও ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। লেখালেখির মধ্যদিয়ে শিক্ষার্থীরা অনেক তথ্য আহরণের পাশাপাশি সচেতন হয়ে উঠতে পারে।

অনুষ্ঠানে বক্তাদের আলোচনা শেষে প্রতিযোগিতার পাঁচটি বিষয়ে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া লেখাপড়ায় অনুপ্রেরণা যোগাতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। কর্মসূচি উপলক্ষে বিদ্যালয়ে ‘বেলাভূমি’ দেয়াল পত্রিকার ১ম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। বিদ্যালয়ের চত্বরে লাগানোর জন্য বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককের কাছে গাছের চারা হস্তান্তর করা হয়।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ‘সবুজ উপকূল’ শিরোনামে একটি একাংকিকা পরিবেশ করে স্থানীয় কচিমুখ নাট্যাঙ্গন। এতে অভিনয় করে শামীম ও মিরাজ। অভিনয়ের মাধ্যমে তারা গাছের চারা রোপণসহ উপকূল সবুজ রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

কর্মসূচির আওতায় ৯ম-১০ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত রচনা লিখন প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর মোসা. রাখি আক্তার, ২য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর মরিয়ম আক্তার, ৩য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের একই শ্রেণীর ফাতেমাতুজ জোহরা। একই শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত কবিতা/ছড়া প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর পল্লবী হালদার, ২য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর হাফিজা আক্তার, ৩য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর আবিদা সুলতানা।

অনুষ্ঠানেে একজন বিজয়ী পুরস্কার গ্রহন করছে প্রধান অতিথির কাছ থেকে

৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত পত্র লিখন প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর রওনক জাহান, ২য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের একই শ্রেণীর নম্রতা মুন, ৩য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের একই ফাবিহা বুশরা। একই শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে খেপুপাড়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর জান্নাতুল ফেরদৌসী দোলা, ২য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের একই শ্রেণীর নূরা ইসলাম অন্তরা, ৩য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের একই শ্রেণীর মাহবুবা জিননুরাইন নাঈমা।

৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংবাদ লিখন প্রতিযোগিতায় ১ম হয়েছে খেপুপাড়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর সাতিয়া মুনতাজা বৈশাখী, ২য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের একই শ্রেণীর জান্নাতুল ইসলাম তুবা, ৩য় হয়েছে একই বিদ্যালয়ের একই শ্রেণীর আতিয়া আমিন অপি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পড়ুয়ারা পরিবেশন করে জাতীয় সঙ্গীত

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় এই কর্মসূচির আয়োজন করেছে উপকূল বাংলাদেশ। এতে মিডিয়া পার্টনার হিসাবে ছিল একুশে টেলিভিশন, দৈনিক ইত্তেফাক, ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, রেডিও ভূমি ও বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম। আইটি পার্টনার ছিল আইটি প্রতিষ্ঠান ডটসিলিকন। আয়োজনে সহযোগিতা করেছে স্কুল পড়ুয়াদের লেখালেখির সংগঠণ আলোকযাত্রা।

কর্মসূচিতে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের পরিবেশ সচেতনতার পাশাপাশি সৃজনশীল মেধা বিকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ইভেন্টে পড়ুয়ারা লেখালেখির মাধ্যমে নিজেদের ভাবনা প্রকাশ করে।

অনুষ্ঠানের শেষে পরিবেশিত হয় একাংকিকা ‘সবুজ উপকূল’

গত বছর সবুজ উপকূল ২০১৫ কর্মসূচির সফল সমাপ্তির ধারাবাহিকতায় এবার সবুজ উপকূল ২০১৬ কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়। এবার কর্মসূচির আওতায় এসেছে উপকূলের ১৪ জেলার ২৫টি উপজেলা। ২৬টি স্থানের ১১৬টি স্কুলের প্রায় ৮০ হাজার শিক্ষার্থী এই কর্মসূচিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিচ্ছে।

এবার স্কুল-ভিত্তিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে ভোলার সদর, তজুমদ্দিন, মনপুরা, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ, পটুয়াখালীর গলাচিপা ও কলাপাড়া, বরগুনার বেতাগী, ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, বাগেরহাটের সদর, শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, সাতক্ষীরার তালা, শ্যামনগর, খুলনার কয়রা, পাইকগাছা, ল²ীপুরের কমলনগরের তোরাবগঞ্জ, হাজীরহাট, নোয়াখালীর হাতিয়া, সুবর্ণচর, ফেনীর সোনাগাজী, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ, বাঁশখালী, এবং কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফ।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/২২০৮২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য