কলাপাড়ার আলোকিত চাষি হানিফ
- ২০:১৭
- কৃষি ও কৃষক, জীবনধারা, প্রধান প্রতিবেদন, ফিচার
- ৩৩৭
মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া, পটুয়াখালী।। এক সময়ের হাইলা-কামলা শ্রেণীর হানিফ আকন এখন সফল কৃষি উৎপাদকে পরিণত হয়েছেন। ধুসর, বিবর্ণ, স্বপ্নহীন মানুষটির জীবনে এখন বইছে সোনালী দিন। নিজেকে পরিণত করেছেন সম্পদশালী গেরস্ত পরিবারে। ফি-বছর কৃষিতে এখন পুঁজি খাটাচ্ছেন অন্তত পাঁচ লাখ টাকা। আবার তেমনি ঘরে ফেরত নিচ্ছেন ফলন বিক্রির দ্বিগুন টাকা।
কৃষিতে আলোকিত এ মানুষটির তামাটে বর্ণের শরীর বদলায়নি, কিন্তু ভাগ্যের চাকার গতি এখন আকাশ ছু’তে চায়। অন্যের সঙ্গে কামলা দিয়ে কোন পুঁিজ গড়তে ভাবনা-চিন্তায় কাহিল হয়ে পড়ত। ভাবতে হতো সন্তানদের স্কুলের টাকার যোগান দেয়ার কথা। এখন মানুষটি যেন প্রাপ্তির ঢেকুর গিলছেন। প্রাপ্তির সঙ্গে প্রত্যাশার যোগসুত্র রয়েছে শতভাগ।
কলাপাড়ার আলোকিত সফল কৃষি উৎপাদক হানিফ আকন। হাইলা-কামলার জীবন থেকে অবস্থাপন্ন গেরস্ত পরিবারের প্রধান তিনি। সংসার জীবনে বইছে সোনালী সময়। এই সফল চাষির সফলতা নিয়ে দুই পর্বের ধারাবাহিকের প্রথম পর্ব আজ
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের ছইলা বুনিয়া গ্রামের সবার কাছে হানিফ এখন নিজের নামে পরিচিত নয়। তার নামটির শেষে যোগ হয়েছে সফলতার বিশ্লেষণ। যে চারাই কেনা হোক তা যেন হবে হানিফের চারা। নিজে এখনও ঝুড়িতে করে বিভিন্ন হাট-বাজারে গিয়ে চারা বিক্রি করছেন। তবে ধান চাষে তার আগ্রহ নেই। শুধু বছরের খোরাকি সংগ্রহে যে ক’মণ ধানের দরকার তা আবাদ করছেন। বিভিন্ন ধরনের রবিশস্যসহ সবজির লাখ লাখ চারার উৎপাদন করছেন। বিক্রি করছেন ধুমধামের সঙ্গে। করলা, শসা, লাউ, কপি, বেগুন, মরিচ, টমেটো, পেঁয়াজসহ সব ধরনের রবিশস্যের চারার আবাদ করে এখন শতভাগ স্বাবলম্বী। এছাড়া ফি বছর অন্তত ৩০ বিঘা জমিতে রবিশস্যের আবাদ করছেন।
ঘরে সৌর বিদ্যুতের আলোয় একমাত্র ছেলে রিয়াদের সঙ্গে লেখাপড়া চলছে ছোট্ট মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী আছিয়ার। এ বছর রিয়াদ অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। পঞ্চম শ্রেণীতে জিপিএ ৫ পেয়েছে। বড় মেয়ে রিমিকে এসএসসি, মেজ ডলিকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ করে বিয়ে দিয়েছেন। সন্তানদের ভবিষ্যত আরও শাণিত করতে কলাপাড়া পৌর শহরে আড়াই লাখ টাকায় জায়গা কিনেছেন।
শুধুমাত্র অদম্য উৎসাহ আর ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে দৃঢ়চেতার এ মানুষটি বাড়ির একটি ভিটিতে কাঠ জাতীয় গাছের নার্সারির মাধ্যমে শুরু করেন ভাগ্য বদলানোর লড়াই। ওই চারা বিক্রি করে লাভের মুখ প্রথম বছরে দেখতে পারেন নি। হতাশ না হয়ে এলাকার আরেক শিক্ষিত, সচেতন উদ্যমি মানুষ হালিম প্যাদার পরামর্শে কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে সবজির চারা করতে শুরু করেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ছাড়া যেন একটি পা সামনে এগোয় না এ মানুষটি। ওই এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জানালেন, হানিফ আকন খুব সচেতন। সমস্যা হলেই ফোনে যোগাযোগ করে। তার ক্ষেত-খামার প্রতি সপ্তাহে পরিদর্শন না করলে অতৃপ্তি থেকে যায়। এ কর্মকর্তা জানালেন, হানিফ আকন কৃষি বিভাগের আইএপিপি প্রকল্পের কৃষক মাঠ স্কুলের একজন সদস্য। অসংখ্য প্রশিক্ষণ নিয়েছেন রবিশস্যসহ সবজি আবাদারে ওপরে।
অত্যন্ত প্রখর ও মেধাবী কৃষক হানিফ আকন জানালেন, সময়মতো সিদ্ধান্ত নেয়াটাই আসল কাজ। যখন যে সবজির বাজারদর ভালো থাকবে তাই করতে হবে। উৎপাদন খরচ কম করতে হবে, ভাল বীজ ব্যবহার করা, একবার চাষ করা জমিতে একই সঙ্গে দু’তিন ধরনের রবিশস্য ও শাকসবজির আবাদ যেন এ মানুষটি সফলতার অন্যতম সোপান। সবাই যখন শুরু করেন তখন হানিফার সবজি বাজারে। নিজস্ব মেধাকে শতভাগ সফলতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে শুধু নিজে আলোকিত করেন নি। গ্রামের নামটি পর্যন্ত তার কারণে প্রতিদিন মনে করতে হচ্ছে কৃষি বিভাগ থেকে যে কোন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। মাত্র দেড় যুগে হানিফার ভাগ্য বদলের লড়াই কাহিনী ভাল না লাগে এমন মানুষ খুজে পাওয়া যাবে না।
