লক্ষ্মীপুরের জেলে পল্লীতে নেই ঈদ আনন্দ

ওদের ঈদের নতুন জামা নেইলক্ষ্মীপুর : নদী মাত্রিক দেশ আমাদের বাংলাদেশ। দেশের পূর্বে উপকূলে অবস্থিত লক্ষ্মীপুর জেলা। এ জেলাকে ঘিরে রেখেছে মেঘনা নদী। নদী থেকে মাছ ধরে জেলেরা জীবিকার্জন করে আবার এ মেঘনার ভাঙনে উপকূলীয় মানুষ নিঃসম্বল হয়ে পড়েছে। মেঘনার ভাঙন ও নদীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ মাছ ধরা না পড়ায় জেলে পল্লীতে ঈদ আনন্দের দেখা মিলছে না। তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে সন্তানদের নতুন জামা কিনে না দিতে পারার হতাশা।

বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টির পানি ও নদীর জোয়ারের পানিতে উপকূলীয় অঞ্চল ক্রমান্নয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে। এতে উপকূলে অবস্থিত মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ঈদকে সামনে রেখে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে সদর, রামগতি ও কমলনগর নদী তীরবর্তী মানুষ। তাঁরা প্রতিনিয়তই নদী গর্ভে তাদের সর্বশ্ব হারিয়ে যাওয়ার আশংকা করছে। তাই তাদের মাঝে ঈদ আসার আনন্দের পরীবর্তে নদীতে সর্বশ্ব হারানোর আতংক দেখা যাচ্ছে। এদিকে জেলেরা নদীতে আশানুরুপ মাছ পাচ্ছে না বলে তাদের আয়-উপার্জন নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় ঈদ আসার খুশিতে আনন্দিত না হয়ে তারা হতাশায় ভেঙ্গে পড়েছেন।

পৃথিবীর সব বাবা-মা যে কোন মূল্যে সন্তানদের মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করে। ঠিক জেলে পল্লীতে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু একদিকে মেঘনার ভাঙন ও অন্যদিকে নদীতে পর্যাপ্ত পরিমান মাছ ধরা না পড়ায় জেলে পল্লীতে হতাশাগ্রস্ত অভিভাবক সমাজ। তাঁরা প্রতিনিয়ত ভেবে চলেছেন কিভাবে তাদের সন্তানদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলবেন, কি করে তাদের হাতে নতুন জামা তুলে দিবেন। তাঁরা এখনও শুধু স্বপ্নই দেখে যাচ্ছেন সন্তানদের হাসিমুখ দেখার জন্য। জেলে পল্লীর লোকজনের ধারণা, প্রকৃতি যেন তাদেরকে প্রতিনিয়ত অভিশাপ দিচ্ছে !

এদিকে জেলে পল্লীর লোকজন অভিযোগ করে জানায়, কেউ তাঁদের এ দুর্দশার খবরও নিতে আসে না। স্থানীয় জন-প্রতিনিধি কিংবা সরকার থেকেও তাঁদের এ বেহাল দশায় একটু সাহায্যের আশ্বাসও দেয়া হয়নি। তাই তাঁরা সবার মতো করে ঈদ আনন্দ ভোগ করতে পারবে না বলে হতাশ হয়ে পড়েছে। ঈদে নতুন জামা তো দূরের কথা সেমাই-চিনি কেনার মতো বাড়তি পয়সাও নেই তাদের কাছে। তারা খুবই অসহায় পড়েছে। তাঁদের ঈদ কাটবে নিত্যদিনের দুঃখ-কষ্টের মাঝে। অভাবেই তাদের ঈদ আনন্দ বিলীন হয়ে যায় প্রতি বছর। মেঘনার ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে তারা আজ খুব অসহায়। এ অসহায়ত্ব মোচনের জন্য কেউ তাদের কাছে কেউ বিন্দু মাত্র সাহয্যের হাত বাড়ায়নি। আর এভাবে দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়েই তাদের ঈদ কাটাতে হবে।

মতিরহাট এলাকার জেলে পল্লীর শিশু সাব্বিরের সাথে কথা বলে জানা যায়, ৮ বছর আগে তার বাবা মারা যায়। এরপর থেকে তার বড়ভাই সংসার খরচ বহন করে। এখন বড় ভাইয়ের সাথে সেও নৌকায় কাজ করে সংসার খরচে সাহায্য করছে।

নিস্প্রান লক্ষ্মীপুরের জেলেপল্লীনতুন জামা কেনার কথা জানতে চাইলে সে আরো জানায়, দুই ভাই নৌকাতে কাজ করে ঠিক মতো সংসার খরচও চালানো যাচ্ছে না। নতুন জামা কেনার মতো বাড়তি পয়সা তাদের কাছে নেই। তাই তাদের কাছে যে জামা আছে সেগুলো দিয়ে তাদের ঈদ কাটাতে হবে।

ঈদের জামা কেনার কথা জিজ্ঞাস করলে একই এলাকার জেলে শিশু তোতা বলে, আঁঙ্গো ঘরে কারোর লাই নোয়া কোর্তা-কাঁড় কিনন অই ন (পরিবারের কারো জন্য নতুন জামা-কাপড় কিনা হয় নাই)। কিনন অঁইবো নি এডাও কাইতাম হাইততাম ন (জামা-কাপড় কেনা হবে কিনা সেটা জানি না)। জানা যায়, তার বাবা একজন দিন মজুর। কখনো কৃষি কাজ, কখনো নৌকায় কাজ করে। বলতে গেলে যখন যে কাজ পায় সেই কাজই করে। আর সে নিজেও মাঝে মাঝে নৌকায় মাছ ধরার কাজ করে।

সদর উপজেলার চররমনী গ্রামের জেলে শাহজাহান মিয়া বলেন, গত কয়েকদিন নদীতে ঠিকমতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আয়-উপর্জন একেবারেই কম হচ্ছে। পরিবারের জন্য নতুন জামা কেনাতো থাক সংসার খরচ ঠিকমতো হচ্ছে না।

নদী তীরবর্তী বুড়ির ঘাট এলাকার বৃদ্ধ গফুর মিয়া বলেন, অ্যাঁই বুড়া অই গেছি, অন অ্যাই অ্যাঁর নোয়া কোত্তা-কাড় দি কি কইররাম (আমি বৃদ্ধ হয়ে গেছি, এখন আর নতুন জামা-কাপড় দিয়ে কি করবো)। অন অ্যার নাই-নাইতকুর নোয়া কোর্তা-কাঁড় হইড়বো (এখন আমার নাতি-নাতনি নতুন জামা-কাপড় পড়বে)। অ্যার কি আর এগিন হড়নের বয়স আছে নি (আমার কি এখন আর এগুলো পড়ার সময় আছে)।

জানতে চাইলে তিনি আরো জানান, একসময় তিনি বুড়িঘাট এলাকার জেলে ছিলেন। দূর নদী থেকে মাছ ধরে এনে বুড়ির ঘাট এলাকায় মাছ বিক্রি করতেন। এখন বুড়িরঘাটটি নদীর গর্ভে হারিয়ে গেছে। সে ঘাটটির মাটিও দেখা যাচ্ছে না।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/০৩০৭২০১৬//


এ বিভাগের আরো খবর...
উপকূল দিবসের দাবি উপকূল দিবসের দাবি
‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন ‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন
বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক
পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন
উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প
কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’ কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’
শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন
জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল
একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’ একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’
‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার ‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার

লক্ষ্মীপুরের জেলে পল্লীতে নেই ঈদ আনন্দ
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)