ওয়াপদার বাঁধ ভাঙ্গলে কপাল ভাঙ্গে ভাগ্যহত মানুষের

রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী ।।
ওয়াদার বাঁধ ভাঙ্গলে, কপাল ভাঙ্গে উপকূলবর্তী নদীর পাড়ের ভাগ্যাহত সাধারণ মানুষের। আর কপাল খুলে যায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের গুটি কয়েক প্রকৌশলী ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের। সরকার কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালে, কিন্তু বাঁধ সংস্কার হয়না। এ টাকা কোথায় যায়? সিডর, আইলা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে সংগ্রাম করা উপকূলের মানুষের খোজ কেউ রাখে না। প্রতি বছর দুর্যোগের সাথে সংগ্রাম করতে গিয়ে উপকূলবর্তী জনপদের লাখ লাখ মানুষ নিঃস্ব হয়ে গেছে। বৈষিক উষ্ণতার প্রভাব ইতমধ্যেই উপকূলীয় অঞ্চলে অনুভূত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। উপকূলের নদনদী গভীরতা পলি জমে কমতেও শুরম্ন করেছে। উপকূলের মানুষের যে কোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষার একমাত্র মাধ্যম হল পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ। কিন্তু এই বেড়িবাঁধ সংস্কার ও সংরক্ষন নিয়ে রয়েছে নানা কথা। যার কারনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হয় না।

সিডরের ক্ষত না শুকাতেই ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে উপকূলবর্তী জনপদে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে  পস্ন্লাবিত হয় খুলনা ও সাতক্ষীরার উপকূলবর্তী জনপদের গ্রামের পর গ্রাম। আইলার জলোচ্ছ্বাসের ১৭ মাস পরও হাজার হাজার মানুষ লবনাক্ত পানিতে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রম্নতির পরও কয়রা ও শ্যামনগরের ভেঙ্গে যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ভাটার বাঁধ জোয়ারেই ভেঙ্গে যায়। আশা ভঙ্গ হয় মানুষের। আবারও তারা বাঁচার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু প্রকৃতির বৈরিতা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের অর্থ-লিপ্সার কারনে উপকূলের মানুষের সংগ্রাম যেন শেষ হয় না।

সমপ্রতি শ্যামনগর উপজেলার আইলা দুর্গত জনপদ ঘুরে দেখা গেছে, লবনাক্ত পানির প্রবাহে তালগাছ, নারিকেল গাছ সহ ফলজ বৃক্ষের পাতাগুলো পুড়ে আঙ্গার হয়ে গেছে। এখনও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভাঙ্গন পয়েন্ট দিয়ে কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর জোয়ারের পানিতে ডুবছে একের পর এক জনপদ। আবার ভাটায় গ্রামুগলো জেগে উঠছে।

আইলা দুর্গত পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস’ ঝাপার ভাঙ্গন পয়েন্টের পাশে দাঁড়িয়ে এ প্রশ্ন করছিলেন সনজিত, আছাদুল, রনজিৎ ও তারামন বিবিসহ অনেকেই। ঝাপার ভেঙ্গে যাওয়া ওয়াপদার বাঁধ সংস্কারের জন্য কয়েকদিন আগে বাঁশ, বল্লি ও বসত্মা এনে রেখে গেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এরপর ওই ঠিকাদারের আর খোঁজ নেই। কয়েক মাস আগে খাদ্য মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক আইলা দুর্গত এলাকা পরির্দশনে এসেছিলেন। তাকে বলেছি ‘হয় বাঁধ বেঁধে দিয়ে যান নইলে আমাদের গুলি করে মেরে রেখে যান।’ কেমন আছেন জানতেই ভাদ্রম্নবিবি আঙ্গুল উচিয়ে বললেন - ‘ঐ দেখেন আমাদের বাড়িঘর পানিতে ভাসছে।’ বাঁশ খুঁটির উপর ভাঙ্গচোরা চাল জানান দিচ্ছে এখানেই ছিল ভাদ্রম্নর বসত ভিটে। নয় মাস আগে আইলার জলোচ্ছ্বাসে পৈত্রিক ভিটে মাটি হারিয়ে লাখো মানুষ এখন সর্ব শানত্ম। প্রকৌশল জ্ঞান না থাকলেও উপকূলের অনেকেই জানেন ওয়াপদার পক্ষে এই বাঁধ সহসাই সংস্কার করা সম্ভব হবে না। তাই উপকূলবর্তী কয়েক হাজার দুর্গত মানুষ ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করে দেশের অন্য কোথাও স্থানানত্মরিত হয়েছে। যারা এখনো  ক্ষতিগ্রস্থ ওয়াপদা বাঁধের উপর সরকারি তাঁবুর নিচে নয় মাস ধরে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে, তারা বাড়ি ঘরে ফিরতে চায়। কিন্তু ওয়াপদার বাঁধ সংস্কার করা না হলে তারা বাড়ি ফিরবে কিভাবে? কারণ আইলা দুর্গত খুলনার কয়রা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের লাখো মানুষের বাসত্মভিটেয় দিন দুবার জোয়ার ভাটা বয়ে যাচ্ছে। সরকার এসব ভাঙ্গন মেরামতের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর আগে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জিআর, কাবিখা, টিআর ও অতি দরিদ্র কর্মসৃজন প্রকল্পের আওতায় বাঁধ সংস্কারের কাজ করা হয়েছে। কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হয়নি আজও। খাদ্য মন্ত্রী ডঃ আব্দুর রাজ্জাক সরেজমিনে দুর্গত এলাকা পরিদর্শনকালে গৃহহারা লোকজনের মুখ থেকে শুনে গেছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে এক বছরের অধিক সময় পরও ভেঙ্গে যাওয়া বাঁধ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। গাবুরা দ্বীপের বাসিন্দা মানিক বললেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ হয় যেমন তেমন। নামকাওয়াসেত্ম কাজ করে ষোল আনা বিল তুলে নেয় ঠিকাদার। আর কাগজে কলমে দেখানো হয় মাটির কাজ জোয়ারে ভেসে গেছে। আর এই পুকুর চুরির সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের কেউ কেউ জড়িত। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক আব্দুস সামাদ একই আশংকার কথা জানিয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কোটি টাকার কাজে আশি লাখ টাকা লাভ হয়। ঠিকাদারদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। বিলম্বে কাজ শুরম্ন করায় এখন জোয়ারের চাপ বেড়ে গেছে। তিনি সন্দিহান অল্প সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হবে কিনা। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মজিবর রহমান জানান, আইলা দুর্গত এলাকার ৬টি পয়েন্টে বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে। সরকারের নির্দেশনা ও ফান্ড পাওয়ার পর কাজ শুরম্ন হয়েছে। এখনও ঠিকাদের দের বিল দেওয়া হয়নি। কাজে অনিয়মের অভিযোগ সঠিক না। এদিকে গত দুইদিনে খোলপেটুয়া নদীর জোয়ারের চাপে আশাশুনি উপজেলার পুই জালার ওয়াপদার বাঁধ ভেঙ্গে দুই গ্রাম পস্ন্লাবিত হয়েছে। কিছু কিছু কাঁচা বাড়িঘর ও ধ্বসে গেছে। পুই জালার আজাহার ও লতিফ মোল্লা জানাল, পৈত্রিক ভিটেমাটি রক্ষার জন্য স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ সংস্কারের কাজ করছি। ওয়াপদা আমাদের কিছু করে দেবে না। সরকারি টাকা ওরা লুটপাট করে খাবে।

সিডরের জলোচ্ছ্বাসে সাতক্ষীরা উপকূলবর্তী জনপদে তেমন কিছু না হলেও ঘুর্ণিঝড় আইলার এ অঞ্চলের ধনী-গরীবকে এক কাতারে এনে দিয়েছে। ত্রাণের উপর নির্ভরশীল এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবী তোমরা আমাদের বাঁধ বেধে দিয়ে যাও। কথা হয় এক ঠিকাদারের সাথে। তিনি বললেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য যে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয় তার এক তৃতীয়াংশ কাজ হয়, এক তৃতীয়াংশ প্রকৌশলীদের পকেটে ও এক তৃতীয়াংশ লাভ হয়। ঘূর্ণিঝড় আইলার কয়েকদিন আগেও শ্যামনগর উপজেলার উপকূলবর্তী জনপদের বাঁধ সংস্কারের জন্য প্রায় ১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু কাজ শুরম্ন করার কয়েকদিন পর আইলার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলবর্তী অঞ্চল লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দাতাসংস্থা জ্যাইকার কনসালটেন্ট ও পাউবোর প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করে নামমাত্র কাজ করে সমুদয় টাকা উঠিয়ে নিয়েছিলেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আইলার জলোচ্ছ্বাসে সাতক্ষীরার উপকূলবর্তী অঞ্চলের ৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে  ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ২৫৬ দশমিক ৫২ কিলোমিটার বাঁধ। কিন্তু প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধগুলো সংস্কার করা সম্ভব হয়নি।

রামকৃষ্ণ চক্রবর্তী
নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক কালের কণ্ঠ, সাতক্ষীরা

উপকূল বাংলাদেশ

উপকূল বাংলাদেশ

পাঠকের মন্তব্য