শাহপরীর দ্বীপ কী হারিয়ে যাবে?

শাহপরীর দ্বীপের সংস্কারবিহিন সড়কটেকনাফ (কক্সবাজার) :স্বাধীনতার আগে শাহপরীর দ্বীপের দৈর্ঘ্য ছিল ১৫ কিলোমিটার আর প্রস্থ ছিল ১০ কিলোমিটার। বর্তমানে তা ছোট হয়ে দৈর্ঘ্য ৩ কিলোমিটার ও প্রস্থ ২ কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এ ছোট্ট হওয়ার নেপথ্যে টানা ৪ বছরের ভোগান্তির কথা বলেছেন শাহপরীর দ্বীপের মানুষ।

দেশের সর্বদক্ষিণে সীমান্তের নাম ছিল শাহপরীরদ্বীপ। নামে দ্বীপ হলেও এটি টেকনাফের মুল ভূ-খন্ডের সাথে সংযুক্ত ছিল। কিন্তু এখন আর তার অস্তিত্ব নেই। ওটি বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ রূপে নামের সার্থকতায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। একই সঙ্গে সাগরের আগ্রাসনের কবলে দ্বীপটি পাঁচ-চর্তুাংশ বিলীন হয়ে একটি অংশ ঠিকে আছে কোন রকম।

চার বছরের টানা ভোগান্তির কারণে এ শাহপরীরদ্বীপের মানুষ মনে করছেন তারা অভিশপ্ত মানুষ। তাদের কোন অভিভাবক নেই। তাদের অনেকেই প্রশ্ন করেন তারা বাংলাদেশের নাগরিক কিনা? টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপের এক পাশে নাফ নদী। নদীর ঐ পারে মিয়ানমার।

ইতিহাস বিশ্লেষনে দেখা যায়, সমরাট শাহ সুজা তাঁর স্ত্রী পরী বানুকে কোন এক সময় অবস্থান নিয়েছিলেন ওই এলাকায়। এরপর শাহ সুজার শাহ এবং পরী বানুর ‘পরী’ মিলিয়ে নামকরণ হয় এই দ্বীপের। আবার এ মতে ভিন্নমতও রয়েছে। এতে বলা হয়েছে অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি সা’বারিদ খাঁ’র ‘হানিফা ও কয়রাপরী’ কাব্য গ্রন্থের অন্যতম চরিত্র ‘শাহপরী’। রোখাম রাজ্যের রাণী কয়রাপরীর মেয়ে শাহপরীর নামেই দ্বীপের নামকরণ হয়েছে।

শাহপরীর দ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান স্কুল শিক্ষক কলিম উল্লাহ জানান, ৪ বছর আগে শাহপরীরদ্বীপের পশ্চিম অংশে বেঁড়িবাধের সামান্য অংশ সাগরে ঢেউতে ভেঙ্গে যায়। আর ওই ছোট্ট অংশ সংস্কার না করায় এখন দ্বীপটি মুল-ভূখন্ডের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এখন দ্বীপটিতে বেড়িবাঁধের অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। জোয়ার মানেই পানি-পানিতে সয়লার পুরো দ্বীপ। দ্বীপের গ্রাম সংখ্যা ছিল ১৩ টি তা এখন দাড়ায় ১০টি গ্রামে ৩টি গ্রাম সাগরে তলিয়ে যায় বাকি ১০ গ্রামের  ৪০ হাজার মানুষ থাকেন পানি বন্দি। অথচ এ শাহপরীরদ্বীপে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ছিল। এখন ওই সড়কটি জোয়ারের সময় দেখা যাবে না। ভাটা হলে জরাজীর্ণ সড়কের দেখা মিলে।শাহপরীর দ্বীপের ঐতিহ্য ও আয় সম্পর্কে এ প্রবীণ শিক্ষক জানান, লবণ, চিংড়ির জন্য আলোচিত এ দ্বীপে এখন আর নেই কোন চিংড়ি ঘের। লবণের মাঠ মানে তো সমুদ্র। উত্তর পাড়া এলাকার আবদুল করিম নামের এ প্রবীণ ব্যক্তি জানান, টানা ৪ বছর ধরে জনপ্রতিনিধিদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন দ্বীপের মানুষ। হয়নি বেড়িবাঁধ আর হয়নি সড়কের সংস্কারও।

তিনি অভিমত দেন যে সড়কটি রয়েছে ওই সড়কটি যদি কয়েক ফুট  উচু করে সংস্কার করা হতো তবে তাদের ভোগান্তি কমতো। এখন জোয়ারের সময় ছোট্ট বোট, ডিঙ্গি নৌকায় টেকনাফের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। আর ভাটা মানে ৩ কিলোমিটার কাদা ও জরাজীর্ণ সড়কে পায়ে হাঁটার ভোগান্তি। মোহাম্মদ আলম নামের এক ব্যবসায়ী জানান ভোগান্তি চরম কথা।

তার হিসেব মতে, গত ৬ মাসে তিনটি শিশুকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে কাদা ও জরাজীর্ণ সড়কটি অতিক্রম করতে পারিনি। মৃত সন্তান নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়েছে পিতা মাতাকে। তবু যেন কারো দৃষ্টি পাওয়া যাচ্ছে না। কাদা ও জরাজীর্ণ সড়ক অতিক্রম করা কালে দেখা মিলে মিস্ত্রী পাড়ার কুলসুমা নামের এক নারীর। তিনি বলেন, তারা সম্ভবত অভিশপ্ত মানুষ। তাদের বোমা মেরে হত্যা করা যেতে পারে। এতে দ্বীপের মানুষের ভোগান্তি কমবে। তাদের কাছে বেঁচে থাকা মানেই ভোগান্তি।

নবনিবাচিত মেম্বার ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা রেজাউল করিম রেজু এ ভোগান্তি দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আর্কষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, দ্বীপটি অস্থিত্ব সংকট চরমে। আগামী বষা আগে বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করলে দ্বীপটি অস্থিত্ব ও না থাকতে পারে, এ পরিস্থিতিতে জরুরীভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণ জরুরী।

আবদু শুকুর নামের ডেইল পাড়ার এক বাসিন্দা প্রশ্ন করেন তিনি কোন রাষ্ট্রের বাসিন্দা। আর বাংলাদেশের বাসিন্দা হলে ৪ বছরেও তাদের র্দূভোগ নিয়ন্ত্রণে কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হল না কেন। অথচ জনপ্রতিনিধিরা তো কোন না কোনভাবে ওখানে গেছেন এবং তাদের রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ৪ বছরেও কেউ তো কথা রাখলো না।

শাহপরীরদ্বীপের জেটিঘাট এলাকায় এ গরুর ব্যবসায়ী প্রতিবেদক বলেন, ‘বাবা একটু বেশি করে লেখ, এ দ্বীপের ক্ষতি যাওয়া হওয়া হয়ে গেছে। আর একটু বেশি হলে দ্বীপটি আর দেখা যাবে না।’

৭ নং ওয়াড়ে মেম্বার নুরুল আমিন বলেন গত ২ বছর ধরে রিং বাধের জন্য সরকারি ভাবে  প্রচুর বরাদ্দ দিলে ও কাজ শেষ হবার এক সপ্তাহ আগে টাকা শেষ হয়ে যায় অল্প কাজের জন্য রিং বাধের পুরাতন কাজ নতুন হয়ে দাড়ায়।অথচ কেবল আশার কথাই শুনা গেল সংশ্লিষ্ট কৃর্তপক্ষের।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের টেকনাফের দায়িত্বরত উপ-সহকারি প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন জানান, টেকনাফের ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধের জন্য ১০৬ কোটি টাকার চেয়ে মন্ত্রণালয়ের পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে বাঁধ নিমার্ণ করা হবে।

//প্রতিবেদন/উপকূল বাংলাদেশ/০৩০৫২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য