৭৫ বছর বৈঠা বেয়েও তীরে ভিড়েনি আর্শ্বেদের জীবন তরী!

বৈঠা হাতে আর্শ্বেদ তালুকদারকুয়াকাটা : মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার সাথে খেয়া নৌকার বৈঠা ধরেছেন। এখন ৮৫ বছরের বৃদ্ধ। সে হিসেবে টানা ৭৫ বছর বৈঠা বেয়ে চলছেন। অদ্যবধি তাঁর জীবন তরী কূলে পৌঁছেনি। জীবনের পড়ন্ত বেলায় কূল পাবেন কিনা সে প্রশ্ন থেকেই গেল। তবুও বৈঠা ছাড়ার চিন্তা তাঁর মাথায় কখনও আসেনি। বসত ভিটা ছাড়া সোলানী ফসল ফলে এমন জমি তাঁর নামে নেই। সেই কিশোর বয়স থেকে বৃদ্ধ বয়সে এসেও বৈঠা হাতে সংগ্রাম চলছে অবিরাম। খুব ভোর থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত চলে জীবন যুদ্ধ। বয়স্ক ভাতার খাতায় নামটি তালিকাভূক্ত হয়নি এটাই তাঁর দুঃখ। এতক্ষণ যার কথা বলা হলো, তিনি চার নদীর মোহনার খেয়া নৌকার মাঝি আর্শ্বেদ তালুকদার।
বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার কড়ইবাড়িয়া ইউনিয়নের ঝাড়াখালী গ্রামের একটি অনুষ্ঠানে বেড়াতে যাওয়ার পথে একজন আর্শ্বেদ তালুকদারের দেখা মেলে। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়ন হয়ে যাবার পথে চারটি নদীর মোহনা পাড়ি দিতে হয়। সেখানে ‘আর্শ্বেদের খেয়াঘাট’। নামকরণের রহস্য জানার চেষ্টা করলে শোনা গেল তাঁর নামানুসারে পরিচিতি পেয়েছে খেয়াঘাটটি। অজনা তথ্য জানার আগ্রহ নিয়ে খেয়া নৌকায় উঠে দীর্ঘক্ষণ আলাপ হয় বৃদ্ধ মাঝির সাথে। তিনি বিশ্বাস করেন নি:শ্বাস ত্যাগ করলেও খেয়াঘাট থেকে তাঁর নাম মুছবে না। এটাই আত্মতৃপ্তি।

কলাপাড়া উপজেলার চাকামইয়া এবং তালতলী উপজেলার কড়ইবাড়িয়া ও শারিকখালী তিন ইউনিয়নের সীমানায় চারটি নদী। নদী চারটি চাকামইয়া, বগী, কচুফাতরা ও কড়ইবাড়িয়া নদী নামে পরিচিত। আর্শ্বেদ তালুকদার এ চার নদীর মোহনায় দীর্ঘ বছর খেয়া নৌকার বৈঠা বেয়ে মানুষ পারপার করছেন। এক সময় গ্রামের মানুষ পাড় করে বছর শেষে ধান নিতেন। আর তাতেই সারা বছর গোলায় চাল থাকত। কিন্তু এখন মানুষ ঠিকমত ধান দিচ্ছেন না বিধায় নগদ টাকায় পাড় করেন। কারো কাছে টাকা না থাকলে তাঁর কোন আপত্তি থাকে না। খেয়া ভাড়া নিয়ে দীর্ঘ বছরে কারো সাথে ঝগড়া হয়নি। খেয়াঘাটের আশেপাশের স্থানীয়দের সাথে কথা বলে তাঁর কথার সত্যতা মিলেছে। এমনকি সর্বদা হাসি খুশি এ মানুষটি কখনও কারো সাথে মুখ মলিন কথা বলেন নি।

খেয়ার নৌকায় বসে দীর্ঘক্ষণ আলাপ হয় শোকাবহ আগষ্ট লেখা গেঞ্জি পড়া আর্শ্বেদ তালুকদারের সাথে। তিনি জানালেন, ঝাড়াখালী থেকে চাউলাপাড়া তিন টাকা, নলবুনিয়া তিন টাকা, চাকামইয়া পাঁচ টাকা, চাউলাপাড়া থেকে চাকামইয়া পাঁচ টাকা, নলবুনিয়া পাঁচ টাকা জনপ্রতি ভাড়া নিচ্ছেন। এতে তাঁর দৈনিক দু’শ টাকা থেকে দু’শ পঞ্চাশ টাকা আয় হয়। কোন কোন দিন এর বেশীও হয়। আবার এর চেয়ে কমও হয়। সর্বপরি প্রতি মাসে সাত থেকে আট হাজার টাকা আয় করেন তিনি। বর্তমান উর্ধ্বগতির বাজারে এ আয় দিয়েই চলছে রোগাক্রান্ত স্ত্রী মনোয়ারা খাতুনের চিকিৎসা ও চার সদস্যের পরিবারের সংসার। ৬৬ বছরের বৃদ্ধা স্ত্রী ও ৮৫ বৎসর বয়সের বৃদ্ধ মাঝি বয়স্ক ভাতা পান না। গত বছর তাঁর নিজের নাম নিয়েছে শারিকখালী ইউনিয়ন পরিষদ। তালিকাভূক্ত হয়েছেন কিনা তা জানেন না। তাঁর ভাষায়, মনে হয় এককালীন পেনশন ভাতা নিয়ে যমদূত হাজির হবে।

বয়সের ভারে ক্লান্ত আর্শ্বেদ তালুকদার জানালেন, তাঁর বাড়ি শারিকখালী ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামে। কিশোর বয়সে বাবা আব্দুল গণি তালুকদার ওরফে আরমান তালুকদার সাথে বৈঠায় হাতে খড়ি হয়। সেই থেকে শুরু হয়ে চলছে অদ্যবধি। তাঁর দেখা ছোট ছোট নদীগুলো ভাঙ্গনের কবলে বড় হয়েছে। কালের বিবর্তনে আবার ছোট হয়ে আসছে। কিন্তু তিনি পেশা বদল করেননি। তাঁর ভাগ্যের কোন পরিবর্তনও হয়নি। চার সন্তানের জনক বৃদ্ধ খেয়ার মাঝি। তারমধ্যে দুই সন্তান প্রতিবন্ধী।

বড় মেয়ে হালিমা বেগম (৪০) দিনমজুরের স্ত্রী। মেঝো ছেলে মানিক মিয়া (৩০) রাজধানীতে গাড়ি চালায়। কোনমতো খেয়ে পড়ে চলছে তার সংসার। সেঝো ছেলে মতিউর রহমান (১৮) বাক প্রতিবন্ধী। বৃদ্ধ বাবার কাঁধের বোঝা হয়ে বেঁচে আছে। চার ভাই বোনের সবার ছোট রেখা আক্তার (১৩) আংশিক বাক প্রতিবন্ধী। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী রেখা আক্তার। দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েই তাঁর যত চিন্তা। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তানদ্বয় প্রতিবন্ধী ভাতা পায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আর্শ্বেদ তালুকদার সোজা বললেন,‘চেয়ারম্যান-মেম্বার ভাল না।’

এ বিষয়ে কথা বলার আগ্রহ থেকেই দেখা হয় দক্ষিণ ঝাড়াখালী গ্রামের শতবর্ষী আঃ রশিদ মোল্লার সাথে। তিনি জানালেন, যখন ছোট ছিলেন তখন ব্যারের মতো খাল ছিল। সাগরের সাথে সংযোগ থাকায় খালগুলো আস্তে আস্তে বিশাল বড় বড় নদী হয়ে গেছে। সেই সময় থেকে আর্শ্বেদ তালুকদারের বাবা আরমান তালুকদার খেয়া দিতেন। তখন ‘নাওটানা’ খেয়াঘাট নামে পরিচিত ছিল। তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় আর্শ্বেদ তালুকদার বৈঠা ধরেন। নদীগুলো বাঁধ দেয়ার আবার ছোট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আর্শ্বেদ তালুকদার আজও বৈঠা বেয়েই চলছেন। টিকিয়ে রেখেছেন মরহুম বাবার পেশা।

দীর্ঘ বছরের খেয়ার মাঝি আর্শ্বেদ তালুকদার সব শেষে জানালেন, সাগরের সাথে মিলিত নদীগুলোতে কলকল স্রোত ছিল। হাত বৈঠায় নৌকা বেয়ে মানুষ পাড় করতে অনেক কষ্ট হত। চার নদীর মোহনা বিধায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ পাড় করতেন। বর্ষা মৌসুমে ৫০ থেকে ৬০ হাত পানি থাকতো। বর্তমানে ৩০-৩৫ হাত পানি থাকলেও কোন স্রোত নেই। তাই তাঁর কষ্ট কম হয়। তিনি আরও জানালেন, সকালে ভাত নিজেই নিয়ে আসেন এবং দুপুরের খাবার নৌকায় আসে। চা পানের নেশা আছে আর্শ্বেদ তালুকদারের। তাই তিনি নিজেই ছোট্ট নৌকায় বসে জ্বাল দিয়ে চা করেন।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন ও রোজা রাখেন আর্শ্বেদ তালুকদার। তিনি অসুস্থ হলে পারাপারে মানুষের দুর্ভোগ হয়। তাই স্থানীয় কাউকে দায়িত্ব দিয়ে বিছানায় শুয়ে পরেন। সুস্থ্য হয়ে উঠলেই খেয়াঘাটে চলে আসেন। তিনি জানান, তিনটি ইউনিয়নের মধ্যবর্তী খেয়াঘাট থাকায় খেয়ার ইজারায় বেশি টাকা লাগে না। সরকারি খাতায় জমা দেখানোর জন্য নামে মাত্র টাকা জমা দেন তিনটি ইউনিয়ন পরিষদে।

দীর্ঘক্ষণ আলোচনা শেষে বিদায় নিয়ে চলে আসার সময় পিছন থেকে ডাক দিয়ে আর্শ্বেদ তালুকদার বলেন,‘সাংবাদিক চাচা ভাল করে লেইখ্যা ছাপাইয়া দিয়েন। যেন সরকার মোরে প্যানশন দেয়। বয়স্কভাতা পামু তো চাচা?

//কাজী সাঈদ/ উপকূল বাংলাদেশ/১৬০২২০১৬//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য