হারিয়ে যাচ্ছে কালিজিরা ধান
- ১২:৪০
- পরিবেশ প্রতিবেশ, সর্বশেষ
- ২৪৪
মাহবুবুর রহমান সুমন, চাঁদপুর।। ‘পোলাও ধানের চালের ভাত রান্না করলে মৌ মৌ গন্ধে চাইর দিক ভইরা যাইত। এই ভাত এমনি এমনিই খাওয়া যাইত। কালিজিরা ধান চালের ভাতের স্বাদের কথা জীবনেও ভুলতে পারতাম না।’এভাবেই ‘কালিজিরা’ ধানের চালের স্বাদ ও সুগন্ধের কথা বলছিলেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার পূর্ব নাউরী গ্রামের কৃষক ফয়েজ আহমদ।
আবহমান বাংলার ঐতিহ্য অনুযায়ী বাড়িতে জামাই এলেই চিকন চালের ভাত রান্না হতো, খোশ মেজাজে খাওয়ানো হতো জামাইকে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত অথবা গরিব হলেই কী? দিনে একবেলা অবশ্যই এ আয়োজন থাকতো। আর ধান কাটার সময় গ্রামবাংলা মেতে উঠত নবান্নের উৎসবে। সেসব এখন বুড়োদের মুখে আর শিশু-কিশোরদের কানে; গল্প।
এক সময় এ উপজেলার কৃষকদের মধ্যে চিকন ও সুগন্ধির জন্য দারুন জনপ্রিয় ছিল কালিজিরা ধান। ৩০ বছরের ব্যবধানে এ ধানের জায়গা দখল করে নিয়েছে উফশী ও উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান। শুধু কালিজিরা নয়, ক্রমবর্ধমান খাদ্যের চাহিদা মিটাতে সারা দেশ থেকেই হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতিবান্ধব হাজারও জাতের দেশি ধানের জাত।
কালিজিরা, কাশিয়াবিন্নি, সরুসহ নানা জাতের সুগন্ধি চালের নাম শুনলে রসনায় কার না জল আসে। এসব সুগন্ধি চিকন চাল দিয়ে তৈরি হয় পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, ক্ষির-পায়েস, ফিরনি ও জর্দাসহ আরও মুখরোচক নানা খাবার। কিন্তু এসবই এখন কালের স্মৃতি, হাঁড়িতে ভরা; সুগন্ধি বেরুয় না বাতাসে। হাট বাজারে এখন আর এ চাল তেমন পাওয়া যায় না। বিলুপ্তের পথে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এ সুগন্ধি ধান।
বীজের অভাব, সার, ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিসহ নানা কারণে হারিয়ে গেছে-যাচ্ছে এসব সুগন্ধি ধানের চাষাবাদ। তবে সুখের কথা, বিলুপ্তপ্রায় সুগন্ধি জাতের দু’একটি ধান উপজেলায় ইদানীং বিচ্ছিন্নভাবে চাষ হতে দেখা যাচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন গ্রামে ওইসব জাতের ধান আবাদকারী কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ জাতের ধানের ফলন হয় কম। বিঘাপ্রতি অন্য জাতের ধান যেখানে ১৫ থেকে ২০ মণ উৎপন্ন হয় সেখানে এ জাতের ফলন হয় আট মণ পর্যন্ত। তবে বাজারে দাম পাওয়া যায় দ্বিগুণ। সার, সেচ ও পরিচর্যাও লাগে কম। সে হিসেবে আবাদে লোকসান হয় না বললেই চলে। প্রতি কেজি এ জাতের ধানের চাল বিক্রি হয় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। তবে এ চাল সচরাচর সবখানে পাওয়া যায় না। এখনও গ্রামের গৃহস্ত পরিবারের কাছে এ ধানের কদর যথেষ্ট।
কৃষি অফিসের তথ্য মতে, এ জাতের ধান আগে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আবাদ হতো। কিন্তু এসব ধানের উৎপাদন কম হওয়ায় কৃষকরা বীজ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এর ফলে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের জনপ্রিয় কালজিরা, কাশিয়াবিন্নি, সরু, বেগুনবিচি, জামাইভোগ, দাদখানি ও খৈয়া মটরসহ নানা জাতের সুগন্ধি দেশি জাতের ধান।
