পিরোজপুরে ঝিমিয়ে থাকা ক্রীড়াঙ্গনে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে

পিরোজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহায়তায় জেলা স্টেডিয়ামে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত শেখ কামাল নিটোল টাটা ফুটবল লীগের মাঠের একটি দৃশ্যপিরোজপুর : সুন্দরবনের কোলঘেঁষা প্রাকৃতিক সবুজের লীলাভূমি নামে পরিচিত পিরোজপুরের ক্রীড়াঙ্গন এখন সরগরম। দীর্গদিন ঝিমিয়ে থাকার পর এ অঙ্গনে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য। টানা ১৮ বছর পর এখানে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো ফুটবল লীগ। ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেটও অবদান রাখছে জেলা ক্রীড়া সংস্থা। সাম্প্রতিকালে অনেকটা সাফল্য এসেছে স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে। এর সবটুকু প্রশংসার দাবি রাখেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়ানুরাগি এবং ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য কর্মকর্তারা।
কোন জাতির শারীরিক ও মানুসিক উৎকর্ষ সাধন তথা জীবন গঠনের ক্ষেত্রে খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অবদান রাখে। খেলাধুলাই পারে অকাল বার্ধক্যের নৈরাশ, জড়তা ও অবসন্নতার মাঝে তারুণ্যের জোয়ার বহাতে। পারে যুব সমাজকে মাদকের কড়ালগ্রাস থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই পিরোজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার বর্তমান কার্যনির্বাহী পরিষদ গত বেশ কয়েক বচর ধরে আয়োজন করছে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লীগ, ফুটবল লীগ, কাবাডি লীগসহ বিভিন্ন খেলাধুলার। প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছে কয়েকেবার। ফুটবল লীগে অংশগ্রহণকারিদের জার্সি ও বুট বিতরণ এমনকি নাস্তা ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করেছে জেলা ক্রীড়া সংস্থা।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এর দায়িত্বে এখন মো. গোলাম মাওলা নকীব। ২০০৭ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর ক্রিকেট লীগ নিয়মিত আয়োজন করছেন তিনি এবং তার সহকর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল স্থানীয়ভাবে লিগ হওয়ার পাশাপাশি কাবাডি, ফুটবল আর ভলিবলে এ্যাথলেটিক্স গত পাঁচ বছরে কিছু সাফল্য পেয়েছে পিরোজপুরে। আঞ্চলিক পর্যায়ে ফুটবল আর কাবাডিতে দুবার ও ভলিবলে শিরোপা জিতেছে একবার। অনূর্ধ্ব-১৮ আর প্রমীলা ক্রিকেটের আঞ্চলিক ফাইনালেও গিয়েছিল একবার। ভলিবলে বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাটা আসে ২০১২ সালে। ২০০৯ সালের পর ২০১০ সালেও পিরোজপুর জেলা কাবাডি দল জেতে আঞ্চলিক শিরোপা। ফুটবলের আঞ্চলিক দুটো শিরোপা আসে ২০০৯ ও ২০১৪ সালে। বিভাগীয় কমিশনার গোল্ডকাপ নামের টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতে তারা। এছাড়া এসময়ের মধ্যে তারা আঞ্চলিক পর্যায়ে দুই দুইবার এ্যাথলেটিক্সে রানার-আপ হয়েছে। তারা প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ নিয়মিত করার পাশাপাশি দুবার করেছিল টি-টোয়েন্টি লিগও। বর্তমানে পিরোজপুর ক্রিকেট লিগের দল ১৮টা। প্রথম বিভাগটা হয় ছয় দল নিয়ে। আর দ্বিতীয় বিভাগের দল ১২টি।

পিরোজপুর স্টেডিয়ামে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহায়তায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নিটোল টাটা ফুটবল লীগের ফাইনাল খেলায় চ্যাম্পিয়ন দলকে পুরস্কৃত করছেন পুরস্কৃত করছেন সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালঅনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেট দল ২০০৭-০৮ ও ২০১৩-১৪ মৌসুমে পৌঁছেছিল বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক ফাইনালে। প্রমীলা ক্রিকেট দল রানার্সআপ হয় ২০১১-১২ মৌসুমে। এই কৃতিত্বটা নিতেই পারেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম মাওলা নকীব এবং তার কার্যনির্বাহী পরিষদ। এ প্রসঙ্গে বিসিবির নিয়োগ দেওয়া কোচ লিমন দে সঞ্জিত বলেন, খেলোয়াড়দের ব্যাট, প্যাড, বলসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে জেলা ক্রীড়া সংস্থার ভূমিকা অপরিসীম।

দেড় যুগ আগে খেলায় মুখরিত থাকত ক্রীড়াঙ্গন। স্থানীয় ফুটবল লিগে আবাহনী, মোহামেডান, ব্রাদার্সের মতো দলগুলো জাতীয় তারকাদের পাশাপাশি নিয়ে আসত বিদেশিদেরও। সর্বশেষ ১৮ বছর আগে অনুষ্ঠিত লিগে আবাহনী এনেছিল প্রেমলাল, পাকির আলীর মতো ফুটবলার। এই জেলারই পাঁচ ভাই জাহিদ হাসান এমিলি, ফয়সাল আহমেদ এমেকা, শাকিল আহমেদ, সাব্বির খান ও লিটন খান খেলেছেন ঢাকার ফুটবলে। তাদের দু’জন জাতীয় দল আরেকজন মাতিয়েছেন বয়সভিত্তিক জাতীয় দল। সেই জেলায় ১৮ বছর অনুষ্ঠিত হলো ফুটবল লিগ। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহায়তায় আয়োজন করে এ লীগের। ১৮ বছর লিগ না হলেও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু টুর্নামেন্ট হয় পিরোজপুরে। জেলা প্রশাসক আন্ত-উপজেলা ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন অব্যাহত রয়েছে।

২০০৭ থেকে নিয়মিত ক্রিকেট করার পাশাপাশি স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে জেলা ক্রীড়া সংস্থা আয়োজন করছে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিভাগ বিভাগ সাঁতার, কাবাডি, টেবিল টেনিস ও দাবা।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা নকীব বলেন, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব প্রকট এই জেলায়। যার কারণে বিভিন্ন লীগ ও টুর্নামেন্ট সম্পন্ন করতে বেগ পেতে হয়। তবে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ক্রীড়াঙ্গনে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগে। সহযোগিতার হাত বাড়ান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব এ কে এম এ আউয়াল, পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র আলহাজ মো. হাবিবুর রহমান মালেক, সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলহাজ মুজিবুর রহমান খালেক এবং জেলা বাস ও মিনি বাস মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ মশিউর রহমান মহারাজ।

তিনি আরও বলেন, পিরোজপুর জেলা স্টেডিয়ামটি অনেক আগের হলেও এর পূর্ণাঙ্গ উদ্বোধন হয় ১৯৯৮ সালের ৫ এপ্রিল। তখনকার যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উদ্বোধন করেন সোয়া ১০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত স্টেডিয়ামটি। সময়ের পরিক্রমায় সেই স্টেডিয়ামটির সংস্কারে ৯৮ লাখ টাকার টেন্ডারের কাজ দ্রুত গতীতে এগিয়ে চলছে।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম এ মান্নান বলেন, ২০০৭ সালের পর থেকে পিরোজপুর ক্রীড়াঙ্গনে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। গত বেশ কয়েক বছর ধরে বর্তমান কার্যনির্বাহী পরিষদ আয়োজন করছে ক্রিকেট লীগ, ফুটবল লীগ সহ বিভিন্ন খেলাধুলার। তিনি আরও বলেন, যুব সমাজকে মাদকের কড়ালগ্রাস থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে খেলাধুলার কোন বিকল্প নেই। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জেলা ক্রীড়া সংস্থার বর্তমান কার্যকরি পরিষদের ভূমিকা খুবই সন্তোষজনক।

তবে ক্রীড়া সংগঠক ও প্রাক্তন খেলোয়ারদের অভিমত, খেলাধুলার মানোন্নয়ন ও প্রসারের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা ও পদ্ধতিগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন সেগুলোর অভাবের কারণে পিরোজপুর জেলা ক্রীড়াঙ্গনের ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে আছে। প্রত্যেকটি খেলার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ মাধ্যমে খেলোয়ার তৈরী করা। এ ক্ষেত্রে অর্থ একটি মূল সমস্যা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে যে অনুদান দেয়া হয় তা দিয়ে প্রশাসনিক ব্যয় মিটিয়ে একটি সিনিয়র লীগ খেলা কোনমতে সম্পন্ন করা যায়। স্থানীয়ভাবে কোন আয় ও অনুদানের ব্যবস্থা করা না হলে পিরোজপুরের ক্রীড়াঙ্গনকে কতদিন সচল রাখা যাবে তা বলা কষ্টকর।

//এ কে আজাদ/ উপকূল বাংলাদেশ/পিরোজপুর/০৫০৮২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য