কাউখালীতে আমড়ার ফলন ভাল হলেও মিলছে না ন্যায্য মূল্য

বাজারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত কাউখালীর আমড়াকাউখালী (পিরোজপুর) : পুষ্টিকর ফল আমড়ার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। মৌসুমে বাজার ছাড়াও পথে পথে প্রচুর বিক্রি হয় এই আমড়া। এটি একটি অর্থকরী ফল হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে। ফলে বেড়ে গেছে আমড়ার চাষ ও উৎপাদন। বিশেষ করে দেশের যেসব অঞ্চলে এই ফলটি ভালো জন্মায়, সেসব স্থান এর চাষ বেশি হচ্ছে। এমনই একটি অঞ্চল হচ্ছে পিরোজপুর। এই জেলার কাউখালী ,নাজিরপুর ও স্বরূপকাঠীতে উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে আমড়া উৎপাদন হয়।

চলতি মৌসুমেও এসব এলাকায় আমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে যা গত ১০ বছরের তুলায় অনেক বেশী বলে দাবী করেছেন চাষীরা। প্রচুর ভিটামিন সি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের আর একটি অর্থকারী মৌসুমী ফলের নাম আমড়া যার ইংরেজী নাম গোল্ডেন আ্যপেল। বিভিন্ন লঞ্চঘাট, ফেরীঘাট, বাসে আর রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কের সর্বত্রই প্রতিনিয়ত হকারদের ডাক শোনাযায় লাগবে স্যার বরিশালের আমড়া।

বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় এর ফলন বেশী বিধায় বরিশালের আমড়া বলে সকলের কাছে পরিচিত। বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার কাউখালী উপজেলায় আমাড়ার আবাদ অনেক বেশী। ওইখানে আড়ার চাষ হয় ব্যবসায়ীক ভিত্তিতে।

ওই এলাকার এমন কোন বাড়ী পাওয়া যাবেনা যে বাড়ীতে কম করে হলেও একটি আমড়া গাছ নেই। ছোট-বড় রাস্তার পাশে বাড়ীর উঠোনে একটি আমড়া গাছ লাগানো যেন প্রতিটি মানুষের নেশায় পরিনত হয়েছে। বহু মানুষ পতিত জমি কেটে আইল তৈরি করে আবার কেউ কেউ ফসলী জমিতে বড় বড় বগান সৃষ্টি করেছেন। কোন কোন চাষীর বাগান থেকে বছরে লাখ লাখ টাকা আয় হয়।

শ্রাবন ভাদ্র মাসে পরিপক্ক আমড়া পাওয়া যায়। গ্রামের বেশীর ভাগ এলাকায় আমড়া কেনা বেচার বেপারী রয়েছে। তারা ফালগুন চৈত্র মাসে কুড়ি দেখেই আগাম টাকা দিয়ে বাগান কিনে ফেলে। আবার অনেক চাষী নিজেরাই ভরা মৌসুমে বিক্রি করেন। আষাঢ় মাস থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত গাছ থেকে আমড়া পেড়ে বাজারে নিয়ে বিভিন্ন আড়তে বিক্রি করা হয়। এজন্য বিভিন্ন বাজারে রয়েছে অসংখ্য আমড়ার আড়ৎ।

কাউখালী উপজেলার প্রধান বন্দর লঞ্চঘাট, দক্ষিন বাজার, চৌরাস্তা পাঙ্গাশিয়াসহ বিভিন্ন বড় বাজারে রয়েছে অসংখ্য আমড়ার আড়ৎ। ওইসব আড়তে বেপারীদের কাছ থেকে আমড়া কিনে ঢাকা, চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, মেঘনাঘাট, এলাকায় আমড়া চালান করা হয়। সেখানের আড়তদাররা বিভিন্ন মোকামের খুচড়া বিক্রেতা ও পাইকারদের কাছে আমড়া বিক্রি করে খুচড়া বিক্রেতা ও হকারদের হাত হয়ে আমড়া সাধারন ক্রেতার কাছে পৌছায়।

জানা গেছে, পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আমড়া কেনাবেচার জন্য রয়েছে একদল বেপারী। তারা চৈত্র-বৈশাখ মাসে গৃহস্তদের অগ্রিম টাকা দিয়ে আমড়ার গাছ কিনে থাকেন। এরপর শ্রাবণ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত তারা পর্যায়ক্রমে গাছ থেকে আমড়া সংগ্রহ করেন। পরে বস্তায় ভরে বস্তা হিসেবে তারা পিরোজপুর জেলায় আমড়া কেনাবেচার সবচেয়ে বড় মোকাম কাউখালীতে বিক্রি করেন। সেখান থেকে লঞ্চে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আমড়ার চালান পাঠিয়ে দেয়া হয়। পিরোজপুর জেলার আমড়া আকারে বড় এবং সুস্বাদু হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে এর চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক।

কাউখালী এলাকার আমড়া চাষী মহিদুল  জানান, মধ্য সত্বভোগীদের অধিক মুনাফার কারণে আমড়া উৎপাদনকারী গৃহস্তরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বেপারীরা গৃহস্তদের কাছ থেকে এক বস্তা আমড়া ৮/ ৯শ’ টাকায় কিনে কাউখালী মোকামে বিক্রি করে থাকেন১৮’শ থেকে ১৯’শ টাকা করে।

কাউখালীর ব্যাবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, একটি আড়ৎ থেকে ঢাকা, চাঁদপুর বা মুন্সিগঞ্জ এক বস্তা আমড়া পৌছাতে খরচ হয় ২১০ থেকে ২১৫ টাকা। এরপর আড়তে  বিক্রয় মূল্যের শতকরা ১০ ভাগ আড়তদারী দিতে হয়। প্রতিটি বস্তয় বর্তমানে ১৫০০ আমড়া বোঝাই করা হয়। বর্তমানে কাউখালীতে এক বস্তা আমড়ার দাম ১৫শত থেকে ১৬ শত টাকা। ঢাকায় বিক্রি হয় ১৮’শ  থেকে ২ হাজার টাকায়।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে আমড়া বাংলাদেশের একটি সু-পরিচিত ফল। এটি ছেলে মেয়েদের অতি প্রিয়। আমড়ায় পর্যাপ্ত পরিমানে ভিটামিন এ, বি, সি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ইত্যাদি অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে।

খাদ্যপোযোগী প্রতি ১০০গ্রাম আমড়ায় রয়েছে ১.১গ্রাম প্রোটিন, ১৫গ্রাম শ্বেতসার, ০.১ গ্রাম স্নেহ, ০.২৮ মিঃ গ্রামঃ ভিটামিন এ, ০.০৪ মিঃ গ্রাম ভিটামিন বি, ৯২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৫৫ মিঃ গ্রাম ক্যালসিয়াম, ৩.৯ মিঃ গ্রাম লৌহ এবং ৮০০ মাইক্রোগ্রম ক্যারোটিন রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি আমড়ায় ৬৬ কিঃ গ্রাম খাদ্য শক্তি রয়েছে। এসব পুষ্টি উপাদান আমাদের সু-স্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজন। ফলে একদিকে ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করছে এবং অন্যদিকে বাম্পার ফলনে আর্থিক লাভবান হওয়া যায়।

এ বিষয়ে কাউখালী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা অপূর্ব লাল সরকার জানান, নিঃসন্দেহে আমড়া একটি গুরুত্বপূর্ন অর্থকারী ফসল। এ বছর কাউখালীতে  কয়েক বছরের তুলনায় আমড়ার ফলন ভাল হয়েছে। এর বাগান করা বা চাষ করা খুই সহজ। রোদেল স্থানে উচু আইল করে সারিবদ্ধ ভাবে চারা রোপন করার ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে ফসল ওঠে। লাভ জনক চাষ বিধায় এ দিকে চাষীদের নজর বেশী। রোগবালাই কম তবে চারা রোপনের সময় গর্তের মধ্যে কিছু দানাদার কীটনাশক প্রয়োগ করলে গাছ মরা রোগ হয়না। এ অঞ্চলের মাটি এবং আবহাওয়া আমড়া চাষের জন্য খুবই উপযোগী।

তিনি জানান, আমড়ার চারা লাগানোর জন্য উৎসাহিত করা এবং ফলন বৃদ্ধি ও রোগ-বালাই দমনের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর এখানে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকে।

//রবিউল হাসান রবিন/ উপকূল বাংলাদেশ/কাউখালী-পিরোজপুর/০৪০৮২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য