ইলিশ নয় সার্ডিন, না চিনলেই ধরা!

ইলিশের রূপে সারডিনলক্ষ্মীপুর : বাজারে ইলিশের দাম বেশ চড়া। বাড়িতে ঝুঁড়ি ভরা ইলিশ নিয়ে ফেরিওয়ালা। দামে সস্তা। কিনে ‘স্বস্তি’। তবে, খেতে গিয়ে অস্বস্তি। স্বাদ গন্ধে সে তো ইলিশে নেই। এ তো অন্য ‘ইলিশ’।
ঠিক ইলিশের মতই দেখতে এ মাছের বৈজ্ঞানিক নাম সার্ডিন (sardine)। এক সময় মেডিটারেনিয়ান দ্বীপ সারডিনিয়া’র চতুর্দিকে এ মাছের প্রাচুর্যতা ছিলো বলে এরা সার্ডিন নামে পরিচিতি পেয়েছেন। জেলেদের কাছে পরিচিতি চন্দনা, যাত্রিক, টাকিয়া, পানসা, খায়রা ও সাগর চাপিলা নামে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সারডিন বা চন্দনা মাছকে- ইলিশ বলেই বিক্রি করছে। ফরমালিন যুক্ত এ মাছ কিনে প্রতারিত হচ্ছে ভোক্তরা।

লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে, হাট-বাজারে এ মাছ বিক্রি হতে দেখা দেখা যায়। পাশ্ববর্তী জেলাগুলোতেও  ইলিশ পরিচয়ে সার্ডিন মাছ বিক্রি করার খবর পাওয়া গেছে।

লক্ষ্মীপুর পৌর সমসেরাবাদ এলাকার গৃহিনী জাহানার বেগম বলেন, অচেনা এক ফেরিওয়ালার কাছ থেকে ইলিশ কিনে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। খাওয়ার সময় তিনি বুঝতে পারেন এ আসল ইলিশ নয়।

কমলনগরের ফলকন গ্রামের মো. হারুন জানান, স্থানীয় হাজিরহাট বাজারে মাঝারি সাইজের প্রতি কেজি ইলিশ ১ হাজার থেকে ১২শ’ টাকা। কিন্তুু আলেকজান্ডার বাজার থেকে ইলিশ কিনলেন ৪শ’ টাকায়। তবে খেতে বসে বিপত্তি। ইলিশের স্বাদ নেই। এভাবেই তার মত ধোকায় পড়ছেন অনেকেই।

ইলিশ গবেষক, চিকিৎসক ও মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, সার্ডিন গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ। এ মাছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টি উপাদান আছে; খেতে বাধা নেই। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক। দেশে সার্ডিনের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গবেষণা চলছে।

সার্ডিন মাছ প্রাচুর্যতার জন্য শ্রীলংকা ও ভারতের উড়িষ্যা অঞ্চলে একক ফিসারি হিসেবে গড়ে উঠে। এ ছাড়া, সোনাদিয়া দ্বীপের দক্ষিণে ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এ মাছ বেশি আহরিত  হয়ে থাকে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার কম লবণাক্ত পানিতে এরা দলবদ্ধভাবে  চলাফেরা করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম হয়ে সার্ডিন মাছ লক্ষ্মীপুরে আসছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা স্থানীয় হাট-বাজার ও বাসা-বাড়িতে গিয়ে ইলিশ পরিচয়ে এ মাছ বিক্রি করছেন। যারা বিষয়টি জানেন না তারা ইলিশ ভেবেই কিনছেন।
স্থানীয় ইলিশ ব্যবসায়ীরা জানায়, অসাধু ব্যবাসয়ীরা চট্টগ্রাম থেকে চন্দনা মাছ এনে বিক্রি করছে। অনেকেই না জেনে কিনছে; এতে ইলিশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।

কমলনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইব্রাহীম হামিদ শাহিন বলেন, সার্ডিন মাছের প্রাপ্তি বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে বেশি। এ মাছ দেখতে ইলিশের মতো হওয়ায়; ইলিশ পরিচয়ে বাজারে বিক্রি হয়।

লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকমর্তা আলেকুজ্জামান বলেন, ইলিশ ও সার্ডিন যেনো সহজে চেনা যায় সে জন্য হ্যান্ডবিল ও পোস্টারের মাধ্যমে মানুষদের সচেতন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট চাঁদপুর কেন্দ্রের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান (০১৭১১ ৪৫৮৫২০) বলেন, সার্ডিন সামুদ্রিক মাছ। তবে ইলিশ পরিচয় বিক্রি করা প্রতারণা। এ মাছ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ। এতে প্রচুর পরিমাণে উন্নতমানের পুষ্টি উপাদন আছে। এছাড়াও এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। আমাদের দেশে সার্ডিন (চন্দনা ইলিশ) উৎপাদন বৃদ্ধিতে গবেষণা চলছে। এতে ইলিশের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। খেতে খেতে অভ্যস্ত হলে এটিও স্বাদের মাছ হয়ে উঠবে।

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. বাসেদ মাহমুদ বলেন, সার্ডিন মাছ খেতে বাঁধা নেই। এতে ভিটামিন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম আয়রন ও সেলেনিয়াম এর গৌন খনিজ লবণ আছে। সার্ডিন হলো সামুদ্রিক ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের প্রাকৃতিক উৎস্য যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। তবে ফরমালিন যুক্ত যে কোনো খাদ্য মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও হুমকি স্বরূপ।

ইলিশের দেশে সার্ডিন মাছ। এমন পরিস্থিতিতে ইলিশ খেতে সচেতন হতে হবে। জেনে শুনে ও চিনে ইলিশ কিনতে হবে। তবে সারডিন খেতেও বাধা নেই।

//সাজ্জাদুর রহমান/ উপকূল বাংলাদেশ/লক্ষ্মীপুর/১২০৭২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য