জীবনের শেষ বেলায় সুইমাচিং একা বড় একা

রাখাইন বৃদ্ধা সুইমাচিংকুয়াকাটা : ‘‘জঙ্গলে যাইতে পারে না ঔষা (ঔষধ) আনতেও পারেনা। দাখানের (দোকানের) ঔষা খাইতে ভাল লাগেনা। ঘোরে একা একা ভাল লাগনা। ভাল অইলে নাটি ( নাতি) তোমরা দিকে পিডা ( পিঠা) খাওয়াইবে।’’

কথাগুলো রাখাইন বৃদ্ধা সুইমাচিংয়ের। কাউকে ভাল লাগলে নাতি বলে ডেকে পিঠা খাওয়ানো আর রোগের কথা বললে জঙ্গলে ছুটে গিয়ে বনের গাছ গাছরা দিয়ে ঔষধ বানিয়ে দেয়া যার কাজ, জঙ্গলের ভয়ংকার জীব জন্তুর সাথে লড়াই করে যার জীবন চলছিল, এক সময়ের কুয়াকাটা কেরানীপাড়ার প্রভাবশালী রাখাইন কনজা মাদবরের স্ত্রী সেই সুইমাচিং এখন অসহায় একাকি জীবন কাটাচ্ছেন।

একা থাকতে ভাল লাগেনা তবুও তার থাকতে হয়। এক সময় পাড়ায় ঢুকলেই সুইমাচিং আছে এমনটা টের পাওয়া গেলেও এখন আর সাড়া মেলেনা তার ঘরেও। পাড়া মাতানো সবার প্রিয় সুইমাচের এখন শব্দহীন জীবন যাপন। একটি ঘরে একা একা থেকে জীবনের শেষ বেলায় এসে ঘরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা আর অতীত জীবনের সুন্দর সময়গুলো মনে করা সুইমাচের এখন প্রতিদিনের কাজ।

কেরানীপাড়ার কনজার সাথে বিয়ের পরে স্বামীর সংসারে কুয়াকাটায় জীবনের অনেকগুলো বছর পাড় করে আশির কোটায় এসে বয়সের ভারে গত দু’বছর আগে পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পায় সুইমাচে । সে থেকেই বিছানায় এই রাখাইন বৃদ্ধা।
ডাক চিৎকার করে কথা বলতে না পারলেও কাছে বসলে তার ছোট ছোট কথা গুলো বোজা যায়। পূর্বের পরিচিত কেউ হলে কাছে এলে সে এখনো চিনতে পারে। কিন্তু তার কাছে কেউ যেতে চায়না। দীর্ঘদিন যত্নহীন থাকায় তার শরীর থেকে একটু গন্ধ আশায় এখন আর তার পাশে কাউকে দেখা যায়না। খাবার দাবার ঔষধপত্র ছেলে মেয়েরা চালিয়ে আসলেও তার পাশে কেউ থাকেনা। রাতের বেলাও তার থাকতে হয় একা । তাইতো সে বড় একা।
সুইমাচের দুই মেয়ে তিন ছেলের সবার বিয়ে সংসার হয়েছে। বড় মেয়ে মাচিউ স্বামীর সাথে বার্মা থাকেন। মেজ মেয়ে লাচিমা কুয়াকাটায় একই পাড়ায় স্বামীর সংসারে। ছেলে চোচিমং, চোচিলা, মংসেচিন যে যার মত আলাদা সংসার নিয়ে ব্যস্ত। স্বামী কনজা মাদবর বছর পনের আগে মারা গেলে সে থেকেই একাকি জীবনে চালাতে শুরু করেন সুইমাচিং। পরিশ্রমি এই রাখাইন নারী কারো কাছে হাত পেতে নিজেকে ছোট করা পছন্দ করতো না। তাই স্বামীর মৃত্যুর পরে ছেলে মেয়েদের তেমন আগ্রহ না থাকায় একা একাই বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।

বহুদিন বাসা থেকে বের হননা ,তাই তার খোঁজে একাকি থাকা বাসাটিতে সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতেই তার সাথে দেখা । কাঠের মেজেতে বসে আছেন বৃদ্ধা সুইমাচিং। কাছে গিয়ে বসলে কতক্ষন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে একটু পরেই বলে ওঠে নাটি (নাতি)। জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছেন ? ভালনা । কেন ? পায়ে বেটা । নিজের নামটা মনে আছে ? সুইমাচে । স্বামীর নামটা ? কোনজা । বাইরে যেতে ইচ্ছে করেনা ? কেমনে যাইবে ? ঔষধ খান ? জঙ্গলে যাইতে পারেনা তাই ্ঔষা অনতে পারেনা। দাখানের ঔষা ভাল লাগেনা।
ভাল ঠাকলে তোমরা দিগে পিডা খাওয়াইটে। আপনার হাতের অনেক পিঠা আমরা খেয়েছি আর লাগবেনা। আপনি সুস্থ হন। সুইমাচে বির বির করে বলে উঠলো আর সুস্থ্য হইবেনা। কথাটি বলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে একটি নিঃশ্বাস ছাড়লো।
নানি আপনার স্বামীর কথা মনে পড়ে ? হ পড়ে। কেমন আছিল নানা ? খুব ভাল। বাবার বাড়ি কোথায় ছিল ? তালতলী কাজী পাড়া । বাবার নাম মনে আছে ? মাথা ঝুলিয়ে — রজাউউ। নানাকে আপনি পছন্দ করছিলেন না বাবা মা ? পারিবার দিগে (পরিবারের লোকজন)। বিয়ের পরে এখানে এসে কেমন দেখলেন ? উহ জাঙ্গা (জঙ্গল)। থাকতে কোন সমস্য হয়নি ? উহ গেটরা বাঘা ( গ্যাতরা বাঘ) । আপনি ভয় পেতেননা ? আমরা দেখিলে দৌ ( আমারে দেখিলে দৌড় দিত। সেই দিনগুলোর কথা এখন মনে পড়ে ? কোন শব্দ নেই শুধু একটু পরে মাথা নেড়ে হ্যা।
সরকারী ভাবে কোন সাহায্য পান ? একবার দশ কেজি চাউ পাইছে । বয়স্ক ভাতা ? বুজতে না পেরে তাকিয়ে থাকেন ্। বুড়া হইলে সরকার যে টাকা দেয় । উত্তরে ন । এখন কোন কিছু খেতে ইচ্ছে করে ? টংগা (টাকা) নাই । কি খেতে ইচ্ছে করে ? চিনি ভাত । পাশের দোকান থেকে চিনি কিনে এনে হাতে দিলে ছল ছল চোখে কতক্ষন তাকিয়ে থাকেন সুইমাচে। ভাল হয়ে যাবেন, আবার হাটতে পারবেন, ফারাতারার (ইশ্বর) কাছে প্রার্থনা করেন। মাথা ঝুলিয়ে হ্যা বলেন।

চোখে পানি এসে ছল ছল করছে। সুইমাচের কাছ থেকে যখন চলে আসছিলাম সিঁড়ির গোড়ায় এসে আবার যখন তাকালাম তখনো তাকিয়ে আছে সুইমাচে। শব্দহীন ভাবে যেন বলছেন কেউ তো আসেনা নাটি তুমি আবার এসো।

//রুমান ইমতিয়াজ তুষার/উপকূল বাংলাদেশ/কুয়াকাটা/১৫১০২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য