কিশোর-কিশোরী দম্পতি, অনিশ্চিত গন্তব্যে জীবন!

কিশোর-কিশোরী দম্পতি ইলিয়াস-নিপাকলাপাড়া (পটুয়াখালী) : গর্ভের অনাগত সন্তানের শারীরিক স্পর্শ বোঝার অনুভূতি নেই। অথচ তিন কি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অনুমান করে জানালো। এমন সরল উক্তি নিপার। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এবছর সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। কিন্তু সে তো দুরের কথা। এখন ঘর-সংসারের চাকা ঠেলছে। করছে সংসারের যুদ্ধ। তাও কম নয়। একটি বছর গত হয়েছে। বয়স হয়নি, তাই বিয়ে হলেও কাবিন করতে পারেনি। রেজিস্ট্রিবিহীন বিয়ে। স্বামী ইলিয়াস হোসেন। আরেক কিশোর। বয়স আনুমানিক ১৬/১৭ বছর। পেশা, যখন যে কাজ পায় তাই করছে। এখন মাটি কাটা শ্রমিক। শ্বশুর পাঁচপঞ্চাশোর্ধ রফেজ খান ও শাশুড়ি প্রায় তিন মাস অসুখে শয্যাশায়ী শাহীনুর বেগমকে নিয়ে কিশোরী বধু নিপার সংসার।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার বালিয়াতলী ইউনিয়নের আইয়ুম পাড়া গ্রামে বাড়ি। সংসারের ধকল বইয়ে বেড়ানো এ কিশোরী বধুর নিজের চাওয়া-পাওয়ার কোন হিসেব তার জানা নেই। বিয়ের এক বছরে অলঙ্কার বলতে একটি নাকফুল। কানে একটি এমিটেশন। এ নিয়েও নিপার সুখ-দুঃখের কোন অভিব্যাক্তি নেই। নেই কোন বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু মুখাবয়বে ভেসে আসছে স্বামী-সংসারের ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার স্পষ্ট ছাপ।

এক বছর আগে পাশের লালুয়া ইউনিয়নের মঞ্জুপাড়া গ্রামের জেলে লোকমান মৃধার চার সন্তানের মেঝো নিপার সঙ্গে বিয়ে হয় ইলিয়াসের। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতেই লেখাপড়ার পাঠ চুকে গেছে। নিজের অজান্তেই সহপাঠীদের কথা মনে জাগে তার। এখনও বই-খাতার ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায় এমন একজন ফাহিমার কথা মনে আছে জানায়- এ কিশোরী বধু। কথাবার্তায় অসম্ভব বুদ্ধিমত্তার ছাপ নিপার। কাঁথা সেলাই করে। রান্নার কাজ সামাল দেয়। করছে অসুস্থ শাশুড়ির সেবা, দেখাশোনা। কিশোরী এ বধুর উপর রয়েছে শ্বশুর-শাশুড়ির নিরেট আদর। করছেন সোহাগ, স্নেহের পরশ মাখা হাতে।

অকপটেই কিশোর স্বামী ইলিয়াস জানায়, বছরে ছিট কাপড়ের দু’টি সেলোয়ার কামিজ কিংবা একটি ভাল স্যান্ডেল দেয়ার সঙ্গতি নেই তার। নিজের অক্ষমতার জন্য নিজেকেই দায়ী করল এ কিশোর ইলিয়াস। ভারি একটি বোঝা মাথায় নেয়ার সময় মেরুদন্ডে আঘাত পায়। এখনও কঁকিয়ে ওঠে কাজ করতে গেলে। বছরখানেক আগে তার এমন দশা হয়েছে। মাটি কাটার কাজ করতেও সমস্যা হয়। ছেড়া, রংচটা একটি শার্ট গায়ে জড়িয়ে নিপার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। বিয়ের পরে স্বামী-স্ত্রীর সুখের জীবন কী। কী জীবনের চাওয়া-পাওয়া। কী তাদের পরিকল্পনা। কী-ই বা করণীয়। কোন কী এর উত্তর এ দম্পতির কারও জানা নেই। পা পিছলে নিপার ডান পায়ে আঘাত পেয়েছে।

রাতে রাতে জ্বরও হয় এ কারণে বাড়ির অদুরে তাদের কাছে অতি স্বজ্জন, পল্লী চিকিৎসক নুরুল কবিরের কাছে যায় এ দম্পতি। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পরের ঘটনা। তখন তার প্রশ্নের শিকার হয় গর্ভবতী কি না। তখন থেকই এ দম্পতির নতুন দুশ্চিন্তার ভাবনা তাড়া দেয়। নিপার ভাবনায় ধরা দেয় নতুন সন্তান আসবে কোলজুড়ে। এ খবরটি তাদের কাছে যতোটা না আনন্দের; তার চেয়ে বেশি দুর্ভাবনার। মা হওয়া, কিন্তু সন্তান ধারনের শারীরিক সক্ষমতা আছে কি না তাও এ কিশোরীর জানা নেই। যেন নিজের অজান্তেই শরীরে সন্তান ধারনের শারীরিক অনুভূতি এখন নিপার কাছে ভাবনার। ভাবনায় ফেলেছে প্রিয় মানুষ তার স্বামী ইলিয়াসকে। এসব জানার সময় যেন আরও দুর্ভাবনায় পড়ল এ দম্পতি।

গল্পের ছলেই নিপার ভাষ্য ছিল, ‘ মুই বুজমু ক্যামনে। মাস তিনেক আগে বমি আইছে কয়দিন। হ্যারপর আর কিচ্ছু বুঝি নাই। ডাক্তারের ধারে যাইয়া বুইজ্যা গ্যাছি। বয়স তিন/চাইর মাস অইতে পারে’- বলেই নিচু মুখে পায়ের বুড়ো আঙুলে মাটি ঘষা।

সব যেন অধরা এ কিশোর-কিশোরী দম্পতির। স্বাস্থ্য কর্মী বলতে কাউকে এরা চেনে না। জানে না তাদের কী কর্মকান্ড। এমন কারও পদচারনা তারা কখনও বাড়ি চারপাশে দেখেন নি। অথচ সরকারিভাবে মাতৃত্বকাল ভাতা দেয়ার কার্যক্রম চালু রয়েছে। রয়েছে মাতৃস্বাস্থ্য সেবা ভাউচার স্কীমের সরকারি সহায়তা। এতো গেল স্বাস্থ্য সহায়তার বেহাল চিত্র। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কিংবা এসময় পুস্টিকর খাবার খাওয়ার প্রয়োজন তাও জানে না এরা। আর জানলেও কীই বা করার আছে। তিন বেলা পেটপুরে খাওয়ার মতো সঙ্গতি নেই।

অথচ, কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মো. গোলাম ফরহাদ জানালেন, এসময় এ মায়ের স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি আয়রণ সমৃদ্ধ খাবার বেশি প্রয়োজন। প্রয়োজন মাছ মাংস খাওয়ার। এছাড়া প্রথমেই আলট্রাসনোগ্রাফি করে গর্ভের সন্তানের বয়স নির্ধারন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রক্ত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। কারণ একেতো কিশোরী বয়সে নিজেই মা হয়ে যাচ্ছে, তার ঝুকিও বেশি থাকছে। কিন্তু এসব কীভাবে মেটাবে এ দম্পতি। এদের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় প্রতিদিন। মাছ নেই, আকাল। মাংস কবে খেয়েছে নিজেদের কারও জানা নেই। অবস্থা এমন হয়েছে যে, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ছাউনির এক কোনেও এ পরিবারের কারও একটু আশ্রয় জোটেনি। জনপ্রতিনিধিরা দেয়নি একটু নজড়।

ফলে অনাগত সন্তানসহ এ কিশোরী মায়ের ভবিষ্যত পরিনতি কী হবে তাও জানা নেই তাদের।
শুধুই হতাশা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে না জানা গন্তব্যে এগিয়ে চলছে এ দম্পতি। নেই জানা এদের কাছে মাতৃত্বের ঝুঁকি। তাদেও চাওয়া-পাওয়ার কোন সুচিন্তিত মতামতও নেই। শুধুমাত্র চিকিৎসা সমস্যাটি এখন সবচেয়ে প্রধান সমস্যা চিহ্নিত ইলিয়াস-নিপা দম্পতির।

নিপার শ্বশুর রফেজ খান জানান, দাদার আমলে এই গ্রামে বসবাস করছি। ভাইয়েরা ভাগাভাগি করতে করতে এখন আমার বাড়িঘরের জায়গা ছাড়া চাষের কোন জমি নেই। ঘর-দুয়ার বিয়ে দেয়া মেয়েরা ঠিক করে দিয়েছে। নইলে আকাশের নিচে থাকতে হতো। তিনি আরও জানান, নিজের স্ত্রী রোগে শয্যাশায়ী অর্থাভাবে চিকিৎসা চলে না।  বয়সের ভারে নিজের কাজ-কর্ম নেই। প্রচন্ড ক্ষুব্ধ জনপ্রনিধির ওপর এ মানুষটি। কোন ধরনের সহায়তার তাদের ভাগ্যে জোটেনি।

যখন ফিরছিলাম নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করছিলাম, কেনই বা দম্পতির এসব নিয়ে লিখছি। পারব কি তাদের স্বাস্থ্যসেবাসহ কোন সহায়তার হাত বাড়াতে? কেনইবা নিপা আজ কিশোরী মা! কী দোষ বা ইলিয়াসের! ওদের চাহনিতে মনে হয়েছে অনেক কিছু পাবে তারা, এমন প্রত্যাশার অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে কথা বলার সময়। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময়ও ওরা দুটি কচি মুখ প্রত্যাশার চাহনিতে তাকিয়ে রইল। রাষ্ট্র কিংবা সরকার কেউ কি এদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসবে নিজের কাছেই এমন প্রশ্ন জেগে উঠল বার বার, অসংখ্যবার। এক সময় সব যেন মিইয়ে গেল।

//মেজবাহউদ্দিন মাননু/ উপকূল বাংলাদেশ/কলাপাড়া-পটুয়াখালী/১৪০৫২০১৫//

রফিকুল ইসলাম মন্টু

রফিকুল ইসলাম মন্টু

উপকূল অনুসন্ধানী সাংবাদিক। বাংলাদেশের সমগ্র উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার জুড়ে তার পদচারণা। উপকূলীয় ১৬ জেলার প্রান্তিক জনপদ ঘুরে প্রতিবেদন লিখেন। পেশাগত কাজে স্বীকৃতি হিসাবে পেয়েছেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেকগুলো পুরস্কার।
পাঠকের মন্তব্য