উপকূলকে কেন্দ্রে যুক্ত করতে পারে কমিউনিটি রেডিও

এএইচএম বজলুর রহমানদেশে অনেকগুলো কমিউনিটি রেডিও স্টেশন রয়েছে। দীর্ঘদিনের অান্দোলনের ফসল এই রেডিওগুলো। অান্দোলন করে যিনি স্বপ্ন সফল করেছেন, প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে তিনি হলেন এএইচএম বজলুর রহমান

এএইচএম বজলুর রহমান বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের (বিএনএনঅারসি) প্রধান নির্বাহী। এই প্রতিষ্ঠানে কাজই হলো কমিউনিটি রেডিও নিয়ে। পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন কমিউনিটি রেডিও একাডেমি। তিনি একজন শৌখিন হ্যামও।

এএইচএম বজলুর রহমান এখন স্বপ্ন দেখেন কমিউনিটি টেলিভিশনের। যে টিভি স্টেশনে প্রান্তিক মানুষের হাসি-কান্না-অানন্দ-বেদনার কাব্যর ‘ভিজুয়াল’ প্রচারিত হবে। সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন সেইসব স্বপ্নের কথা। তিনি বলেছেন উপকূলকে কেন্দ্রে সংযুক্ত করতে পারে কমিউনিটি রেডিও। বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে হিটলার এ. হালিম-এর নেয়া সাক্ষাতকারটি এখানে তুলে ধরা হল। 

আপনি দীর্ঘদিন কমিউনিটি রেডিও নিয়ে আন্দোলন করছেন, এই আন্দোলনটা কেন?

এএইচএম বজলুর রহমান: কমিউনিটি রেডিওর এই আন্দোলনটা আমরা বাংলাদেশে শুরু করি ২০০০ সাল থেকে। আমরা লক্ষ করেছি বাংলাদেশে যে প্রধান প্রধান মিডিয়া রয়েছে যেমন, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, রেডিও- এগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হওয়ার কারণে তাদের কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব মিডিয়ায় আমাদের পল্লী অঞ্চলের জনসাধারণের অংশগ্রহণ পুরপুরি নিশ্চিত করতে পারে না। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কথাগুলো আড়ালেই থাকে যায়।

এটাকে আমরা বলে থাকি ‘ভয়েস পোভার্টি’ বা কন্ঠস্বরের দরিদ্রতা। কমিউনিটি রেডিও এমন একটা মিডিয়া যার মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করা যায় এবং ভয়েস পোভার্টি দূর করা যায়। এই মিডিয়ার মাধ্যমে আঞ্চলিক ভাষায় তারা তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারে এবং এর মাধ্যমে তারা অনেক সমাধানও পেয়ে যায়। এই পদ্ধতি আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিক্রমায় বড় পরিবর্তন আনছে। আমাদের মনে হয়েছে এটা একটা তৃণমূলের মানুষের অধিকার। তাদের মিডিয়া পরিচালনা ও অংশগ্রহণের অধিকার। এই অধিকার বাস্তবায়নের ফলে তারা মূল উন্নয়নের স্রোতে নিজেকে যুক্ত করতে পারে, তাদের আশা আকাঙ্খার কথা মিডিয়ার মাধ্যমে সরকারকে জানাতে পারে। আমরা মনে করি, এগুলোর সবকিছুই কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে সম্ভব। এই কারণেই আমরা ২০০০ সাল থেকে আন্দোলনটা শুরু করি।

এটি একটি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে, আমাদের স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তৃণমূলের মানুষরা ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ার স্বাদ গ্রহণ করতে পারেনি। ২০০০ সাল থেকে আমরা এই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করি। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয় কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা ঘোষণা করে। উক্ত নীতিমালার আলোকে সরকার প্রথমবারের মত দেশে ১৪টি কমিউনিটি রেডিওর অনুমোদন দেয়। এরপর ২০১০-১১ সালের মধ্যে আমাদের রেডিওগুলো চালু হয়ে যায়।

কমিউনিটি রেডিওর উপকারিতা কী?

এএইচএম বজলুর রহমান: এর উপকারিতার কথা বলতে গেলে, বর্তমানে তৃণমূলের এক হাজারের বেশি যুব ও যুব নারী পল্লী সম্প্রচারকারী হিসেবে প্রশিক্ষিত হয়েছে। পল্লী সম্প্রচারকারী বলতে একজন যুব অথবা যুব নারী যিনি মিক্সার মেশিন ব্যবহার করতে পারেন, সফটওয়্যারের ব্যবহার জানেন, তিনি উপস্থাপনা করতে পারেন, ফোন-ইন অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারেন এবং তিনি স্ক্রিপ্ট লিখতে পারেন। এসব স্কিল থাকলেই আমরা তাকে পল্লী সম্প্রচারকারী হিসেবে বলে থাকি। যদি কমিউনিটি রেডির ফলাফলের কথা বলি,

প্রথমত, এই কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে এক হাজার যুব এবং যুব নারী পল্লী সম্প্রচারকারী হিসবে কাজ করছে। এর ফলে কর্মসংস্থান হয়েছে। এসব সম্প্রচারকারীদের মধ্যে অনেকেই আবার ঢাকার দিকে চলে আসছে। বিভিন্ন বড় মিডিয়া হাউসে কাজ পাচ্ছে তারা।

দ্বিতীয়ত, আমাদের যে ১৪টি রেডিও স্টেশন রয়েছে। সেগুলোর কর্ম এলাকায় রয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ জনগোষ্ঠী। যারা এই রেডিও অনুষ্ঠানের আওতায় এসেছে। কমবেশি সবাই শুনছে। এই ৫৫ লাখ লোক যারা এর আগে নিজেদের কথাগুলো মিডিয়ায় জানাতে পারেনি তারা সরাসরি কমিউনিটি রেডিওতে নিজেদের কথাগুলো বলছে। তাদের অংশগ্রহণে প্রতি সপ্তাহে ৮২১ ঘণ্টার প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়। প্রতি সপ্তাহে ৪৭৩টি প্রোগ্রাম তৈরি হচ্ছে। এই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আওতায়। এসব অনুষ্ঠানের কোনও পর্যায়েই কিন্তু ঢাকার তথা মূল ধারার মিডিয়ার লোকজন নেই। সবই পল্লী অঞ্চলের লোকরাই তৈরি করছে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে পশ্চাৎপদ ও দলিত সম্প্রদায়ের লোকজন যেমন মুচি, মেথর, কুলিরা সবসময় বঞ্চিতই থেকেছে। কমিউনিটি রেডিও তাদের জন্য জায়গা করে দিয়েছে। এখানে তারা নিজদের জন্যই প্রোগ্রাম তৈরি করছে সপ্তাহে সাড়ে ৭ ঘণ্টা। আমরা তাদেরকে প্রশিক্ষিত করেছি। এর মধ্যে কয়েকজন প্রডিউসার হিসেবে বিভিন্ন কমিউনিটি রেডিও স্টেশনে কাজ করছে।

চতুর্থত, আমাদের চলমান ফেলোশিপ প্রজেক্টের মাধ্যমে ‘রুরাল রেডিও সাংবাদিক’ তৈরি করছি। ইতিমধ্যে ২৪ জন নারী রেডিও সাংবাদিকতায় দক্ষ হয়েছে। যারা এখন রেডিও স্টেশনগুলোতে কাজ করছে। এখন আমরা আবার ৪০ জনকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এর মধ্যে ২০ জনই হচ্ছে পশ্চাদপদ কমিউনিটি এবং দলিত সম্প্রদায়ের।

পঞ্চমত, এই রেডিও স্টেশনের মাধ্যমে আমরা পল্লী অঞ্চলে এক ধরণের সংলাপ এবং সামাজিক বিতর্কের অবতারণা করতে পেরেছি। এটাকে আমরা টক শো বলিনা, আমরা বলি আলাপচারিতা। যেখানে সমাধানের উদ্দেশ্যে কথা হয়। যেখানে স্থানীয় ও জাতীয় সরকারের প্রতিনিধিরা থাকেন। ওই অনুষ্ঠানে কেউ সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলো তুলে ধরলে সমাধানও সেখানেই হয়ে যায়। যেমন ধরা যাক, বাল্যবিবাহ, এই বিষয়ে আমাদের রেডিওতে অনেকগুলো অনুষ্ঠান হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা এর সমাধান দেন।

ষষ্ঠত, আরেকটি উপকার রয়েছে, নবম ও দশম শ্রেণীতে প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষার ওপর একটা কোর্স আছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা ওই অংশটুকু পড়ান না। বলেন যে তোমরা এটা পড়ে নিও। এটা জানতে পেরে আমরা রেডিওতে নিয়ে আসি। রেডিওর মাধ্যমে আমরা এখন প্রচার করছি। এর ফলে আমরা শিক্ষক, ছাত্র, প্রশাসন সবার কাছ থেকেই ধন্যবাদ পেয়েছি। ওই অনুষ্ঠানের সময়ে প্রচুর ফোন আসে, মেসেজ আসে। সবাই এটাকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। শিক্ষকরা আমাদের বলেছে যে আমাদের যে লজ্জা ছিলো আপনারা তা দূর করে দিয়েছেন।

সপ্তমত, আমরা দৈনিক ১২৫ ঘণ্টার অনুষ্ঠান প্রচার করি। যা স্থানীয় কমিউনিটির সহায়তা ছাড়া সম্ভব না। এই অনুষ্ঠানগুলোকে যদি আমরা চার ভাগে ভাগ করি, শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, তথ্যমূলক অনুষ্ঠান, বিনোদন ও উন্নয়নের জন্য উৎসাহ। বিনোদনের ক্ষেত্রে আমাদের নিয়মিত গান, কবিতার আসর হয়। নাটক প্রচারও আমরা শুরু করেছি। উপজেলা পর্যায়ে পল্লী এলাকার মানুষকে লক্ষ্য করে বাংলাদেশ সরকারের অনেকগুলো ভাতা রয়েছে, যেমন, মাতৃত্বভাতা, শিক্ষা ভাতা, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা, বয়স্কভাতা ইত্যাদি এগুলো আমরা রেডিও স্টেশনের মাধ্যমে প্রচার করে থাকি। যার ফলে পল্লী এলাকার লোকজন এই সুবিধাগুলো সম্পর্কে অবহিত হয় এবং অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।

আমাদের স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তৃণমূলের মানুষরা ইলেক্ট্রনিকস মিডিয়ার স্বাদ গ্রহণ করতে পারেনি। ২০০০ সাল থেকে আমরা এই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করি। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয় কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা ঘোষণা করে। উক্ত নীতিমালার আলোকে সরকার প্রথমবারের মত দেশে ১৪টি কমিউনিটি রেডিওর অনুমোদন দেয়।

বর্তমানে যে কমিউনিটি রেডিওগুলো চালু রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।

এএইচএম বজলুর রহমান: যেকোনও রেডিওতে এফএম ব্যান্ড থাকলেই তারা আমাদের রেডিওগুলো শুনতে পারে। আমাদের ফ্রিকোয়েন্সি হলো তিনটি। ৯৮.৮, ৯৯.০০, ৯৯.২। এই তিনটি স্পকেক্ট্রামের মাধ্যমে আমাদের শুনতে পারেন। জনগণ কয়েকভাবে আমাদের শুনতে পারেন। একটি হচ্ছে ফিক্সড রেডিওতে (এফএম), মোবাইলে, আরেকটি হচ্ছে শ্রোতাসংঘের মাধ্যমে।

আমাদের শ্রোতারা মূলত স্থানীয় দোকানপাটে, ঘরে, কর্মক্ষেত্রে কমিউনিটি রেডিও শুনে। নারীরা কাজ করার সময় কোমরে ক্লিপ দিয়ে রেডিও লাগিয়ে আমাদের অনুষ্ঠান শোনে। এর মূল শ্রোতা শ্রেণি হচ্ছে, যুব ও যুব নারী, শ্রমিক, কিশোর-কিশোরী, প্রতিবন্ধী, জেলে, রিক্সা চালক, চা বিক্রেতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।

নতুন যে রেডিওগুলো আসছে সেগুলোর অবস্থা কী? অাপনাদের হেল্প ডেস্ক কীভাবে নতুনদের সহযোগিতা করে?

এএইচএম বজলুর রহমান: সরকার ইতিমধ্যে আরও ১৬টি রেডিওর অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমানে আমাদের রেডিওর সংখ্যা ৩২টি। এর মধ্যে ১৬টি বেতার তরঙ্গ পেয়েছে। ১৫টি চালু আছে। সর্বশেষ ভোলা জেলায় চালু হয়েছে কমিউনিটি রেডিও মেঘনা। আরেকটি চালু হতে যাচ্ছে। এটি হাতিয়ার দিকে চালু হবে। নাম হবে ‘সাগরদিঘি’। বাকি ১৬টি রেডিও চলতি ডিসেম্বরের মধ্যে চালু হয়ে যাবে। তারা এখন তাদের নিজস্ব প্রশিক্ষণ, বেতার তরঙ্গ, অনুষঙ্গিক প্রয়জনীয় বিষয়াদির সুরাহা করছে।

আমরা ইতোমধ্যেই তাদের দুই-তিন ধাপে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর আমরা তাদের পর্যবেক্ষণ করে থাকি। দক্ষতার ঘাটতি হলে আমরা তা পূরণে সহায়তা করি।

আর কতগুলো কমিউনিটি রেডিও সেন্টার চালু হলে আপনার আন্দোলন শেষ হবে।

এএইচএম বজলুর রহমান: এটা অবিরাম। কারণ কমিউনিটি রেডিও বাংলাদেশে একটা ফ্যাক্টর হিসেবে দাঁড়াতে যাচ্ছে। কমিউনিটি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার তিনটা কম্পোনেন্ট; রেডিও, টেলিভিশন ও ফিল্ম। আমরা বর্তমানে প্রথম ধাপে অবস্থান করছি।

বর্তমানে চালুরত রেডিও স্টেশনগুলর বাইরেও আরও ৪০টি ভ্যাকুয়াম স্থান আমরা নির্দিষ্ট করতে পেরেছি। এগুলোর তালিকা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি এই বছরে আমরা আরও ৩০টি নতুন রেডিওর অনুমোদন পাবো। আমরা চাই ২০১৬ সালের মধ্যে প্রতি জেলায় অন্তত একটি করে কমিউনিটি রেডিও থাকুক। ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে প্রতি উপজেলায় একটি করে কমিউনিটি রেডিও চালু করা।

কমিউনিটি রেডিও একাডেমি সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?

এএইচএম বজলুর রহমান: কমিউনিটি রেডিও একাডেমি মূলত করা হয়েছে কমিউনিটি মিডিয়া কর্মীদের সার্বক্ষণিক দক্ষতা বিনির্মাণ করার লক্ষ্যে। আমরা ইতিমধ্যে ১০টি কারিকুলাম প্রণয়ন করেছি। প্রতি বছর ২০০ যুব ও যুব নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। আমাদের কারিকুলামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কীভাবে কমিউনিটি মিডিয়া চালাতে হয়, কীভাবে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হয়, এর সঙ্গে মূল উন্নয়নের সম্পর্ক কী, কীভাবে এটাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।

প্রতি বছর আমরা তিন ধরণের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। এক, ঢাকায় ডেকে এনে প্রশিক্ষণ হয়, ক্লাসের মাধ্যমে। দুই, এলাকাভিত্তিক প্রশিক্ষণ। তিন, সরাসরি রিসোর্স পার্সনের মাধ্যমে স্টেশনের কর্মীদের প্রশিক্ষণ। অাগের আমাদের বাইরে থেকে রিসোর্স পার্সন আনতে হতো তবে বর্তমানে আমাদের মধ্যেই তৈরি হয়েছে। যারা এখন আমাদের নতুন রেডিও স্টেশনগুলোতে নতুনদের দক্ষতা বিনির্মাণে কাজ করছে।

অাপনি একজন শৌখিন হ্যাম। এই রেডিও ব্যবহারের ভাবনাটা কীভাবে এলো?

এএইচএম বজলুর রহমান: আমার জন্ম ভোলায়। এলাকাটা দুর্যোগপূর্ণ। ঝড়-ঝঞ্জা লেগেই থাকে। সব সময়ই দেখেছি যখনই সাইক্লোন বা টাইফুন আঘাত হানে তখনই টেলকমিউনিকেশন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভোলা দ্বীপ তখন সব ধরণের যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমার লক্ষ্য ছিলো, কীভাবে দুর্যোগকালীন সময়ে যোগাযোগ সেবা প্রদান করা যায়। ওই লক্ষ্য থেকেই আমরা হ্যাম বা অ্যামেচার রেডিও চালু করেছিলাম।

এখনও বাংলাদেশে আমরাই হ্যাম রেডিও অপারেট করি। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন নিয়ন্ত্রণ কমিশন একটি হ্যাম রেডিও নীতিমালা তৈরি করেছে। আশা করছি, শিগগিরই এটা প্রকাশ হবে। আমার প্রত্যাশা ওই নীতিমালার আলোকে আরও বেশি হ্যাম রেডিও বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত হবে।

নানা ধরণের সমস্যার কারণে এই ধারণাটিকে আমরা বাংলাদেশে ওইভাবে প্রমোট করতে পারিনি। তবে আমরা আশা করছি যে নতুন নীতিমালাটি এলে উপকুলীয় এলাকাগুলোতে কীভাবে হ্যাম রেডিও চালু হবে।

আমাদের নীতিনির্ধারকরা মনে করেছেন আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আসার ফলে আমাদের ট্রাডিশনাল যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলোর আর কোনও দরকার নেই। সিডরের কথা যদি মনে করুন, সিডরের ফলে উপকূল এলাকায় সাড়ে ৭০০ মোবাইল টাওয়ার বিধ্বস্ত হয়। ফলে মোবাইল টাওয়ার যোগাযোগের স্থায়ী সমাধান নয়। যেকোনও সময় যেকোনও টর্নেডো বা সাইক্লোন যদি উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত করে তাহলে প্রথমেই জীবন বাঁচানোর যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যায়। হ্যাম রেডিও মূলত ওয়্যারলেস টু ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন করে। যখন কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থা কাজ করে না তখন কয়েক মিনিটের মধ্যে হ্যাম রেডিও স্থাপন করা যায়।

এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন দেশে হ্যাম রেডিও জনপ্রিয়তা পেল না? লোকচক্ষুর অাড়ালেই কেন রয়ে গেল?

এএইচএম বজলুর রহমান: এ জন্য আমি সরকারকে দায়ি করতে চাই না। ‘সবকিছুর জন্য সরকার দায়ি’ এমন ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এর জন্য আমরা নিজেরাই দায়ি। কারণ বাংলাদেশে যারা হ্যাম রেডিও অপারেট করে তাদের মধ্যেই নানা সমস্যা বিরাজমান। আমরা একত্রিত হতে পারিনি। আমাদের একটা অ্যাসোসিয়েশন থাকলেও তা ততটা কার্যকর নয়। ওদিকে আপনি যদি ভারতের দিকেও তাকান তাহলে সেখানেও হ্যামের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। জাপানে তো এই সংখ্যা ৩০ লাখ!

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পুলিশ অফিসের মধ্যে একটি বিভাগ রয়েছে যারা হ্যাম ববহার করে। তারা তাদের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি ট্র্যাডিশনাল প্রযুক্তিগুলোও রেখেছে। যাতে মানুষের জীবন রক্ষায় কাজে আসে।

বাংলাদেশে আমাদের নিজেদের মধ্যে অনৈক্য, সংকীর্ণতার কারণে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা আশা করছি যে হয়তো আগামীতে আবার কাজ শুরু হবে। ইতিমধ্যে অ্যাসোসিয়েশনে নতুন কমিটি তৈরি হয়েছে। তারা নতুনভাবে কাজ শুরু করবে। সেটা তাদের ব্যপার। নতুন নীতিমালা এলে আমরাও আমাদের কাজ শুরু করব।

হ্যাম রেডিও দিয়ে কী ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব? উপকারিতাই বা কী?

এএইচএম বজলুর রহমান: আমাদের নীতিনির্ধারকরা মনে করেছেন আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আসার ফলে আমাদের ট্রাডিশনাল যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলোর আর কোনও দরকার নেই। সিডরের কথা যদি মনে করুন, সিডরের ফলে উপকূল এলাকায় সাড়ে ৭০০ মোবাইল টাওয়ার বিধ্বস্ত হয়। ফলে মোবাইল টাওয়ার যোগাযোগের স্থায়ী সমাধান নয়। যেকোনও সময় যেকোনও টর্নেডো বা সাইক্লোন যদি উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত করে তাহলে প্রথমেই জীবন বাঁচানোর যোগাযোগ নষ্ট হয়ে যায়। হ্যাম রেডিও মূলত ওয়্যারলেস টু ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন করে। যখন কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থা কাজ করে না তখন কয়েক মিনিটের মধ্যে হ্যাম রেডিও স্থাপন করা যায়।

রাজধানীর সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে হ্যাম রেডিও চালু করা যায়। এর জন্য কোনও টাওয়ার লাগে না। এটা মনিটরিং এর ব্যবস্থা আছে। বিটিআরসি মনিটর করে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মনিটরিং সেল এটা মনিটর করতে পারে।

আমাদের টেলিকম কোম্পানিগুলো যে সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড (এসওএফ) সরকারকে দিয়ে থাকে বাংলাদেশের প্রযুক্তি সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলগুলোতে মানুষকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত করার জন্য। এই অর্থটার যথাযথ ব্যবহার দরকার। আর্থিক কারণে ডিজিটাল বৈষম্যের শিকার লোকগুলোকে ‘অ্যাড্রেস’ করে ইউনিয়নে ইউনিয়নে তাদের যদি সংযুক্ত করা যায়, যেমন আমাদের ধাত্রী, ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার, দফাদার তাদের আমরা মোবাইল দিতে পারি। এরকম করেও আমরা বেশ বড় একটা কমিউনিটিকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় সংযুক্ত করতে পারি।

কবে নাগাদ অামাদের দেশ থেকে ডিজিটাল বৈষম্য দূর হবে?

এএইচএম বজলুর রহমান: ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণে ২০০৩ ও ২০০৫ সালে ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটিতে (ডাব্লিউএসঅাইএস) যে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হয়েছিল (১-১১টি প্ল্যান) সেগুলো বাংলাদেশ কমবেশি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। তবে এই বৈষম্য পুরোপুরি দূর হবে না। এটিকে কাঙ্খিত মাত্রায় কমানো সম্ভব। যেমন আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার ১২ কোটির বেশি মানুষের কাছে মোবাইল গেছে। আগামী বছর নাগাদ দেড় থেকে ২০০ রেডিও স্টেশন হয়ে যাচ্ছে। প্রাইভেট এফএম আছে ২৮টি। তারা আরও ৯টি স্থাপন করে তাহলেও সংখ্যাটি অনেক বড় হয়ে যায়। কমিউনিটি রেডিও হয়ে যাবে ৬০টি। এটা কিন্তু ডিজিটাল বৈষম্য দূর করছে। সরকার যে ডিজিটাল সেন্টারগুলো বসিয়েছে এটাও এক ধরণের অবদান। পল্লী এলাকায় ইন্টারনেট ঠিকমত কাজ করছে না। তবে সরকারের প্ল্যানগুলো ঠিকমত বাস্তবায়ন হলে সেটিও দূর হয়ে যাবে।

তবে আমাদের টেলিকম কোম্পানিগুলো যে সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড (এসওএফ) সরকারকে দিয়ে থাকে বাংলাদেশের প্রযুক্তি সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলগুলোতে মানুষকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত করার জন্য। এই অর্থটার যথাযথ ব্যবহার দরকার। আর্থিক কারণে ডিজিটাল বৈষম্যের শিকার লোকগুলোকে ‘অ্যাড্রেস’ করে ইউনিয়নে ইউনিয়নে তাদের যদি সংযুক্ত করা যায়, যেমন আমাদের ধাত্রী, ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার, দফাদার তাদের আমরা মোবাইল দিতে পারি। এরকম করেও আমরা বেশ বড় একটা কমিউনিটিকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় সংযুক্ত করতে পারি। একবার ভেবে দেখুন, আমাদের দলিত সম্প্রদায়ের লোকরা যদি সেবা বন্ধ করে দেয় তাহলে আমাদের কী হবে? ফলে তাদের কিন্তু একটা হক রয়েছে। ডিজিটার ডিভাইড দূরীকরণে আপনি কোনও পদক্ষেপ নিলে প্রথম হকদার তারা। তাদের যদি আমরা সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ডের আওতায় যুক্ত করতে পারতাম তাহলে এই ডিজিটাল বৈষম্য দূরীকরণের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করা যায়।

কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন?

এএইচএম বজলুর রহমান: আমি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যে বাংলাদেশে শহর এবং গ্রামের মধ্যে কোনও বৈষম্য থাকবে না। আমি ওই স্বপ্ন তাড়া করতেই কমিউনিটি মিডিয়ায় যাত্রা শুরু করি। একটা সময় এটা স্বপ্ন ছিল আজ এটা বাস্তবতা। আশা করি, সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন শহর ও গ্রামের মধ্যে জ্ঞানের বৈষম্য থাকবে না।

//ডেস্ক উপকূল বাংলাদেশ/১৯০৫২০১৫//


এ বিভাগের আরো খবর...
উপকূল দিবসের দাবি উপকূল দিবসের দাবি
‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন ‘কুকরির জনারণ্যে সম্প্রীতির সুবাতাস’ -আবুল হাসেম মহাজন
বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক বরগুনায় বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষে লাভবান কৃষক
পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন পাইকগাছার পড়ুয়ারাদের প্রকৃতিপাঠ, সবুজে গড়ছে জীবন
উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প উপকূলের উদীয়মান সংবাদকর্মী ছোটন সাহা’র ছুটে চলার গল্প
কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’ কমলনগরে পড়ুয়াদের সবুজ জগত, অনুপ্রেরণায় ‘সবুজ উপকূল’
শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন শ্যামনগরে পড়ুয়ারা গড়ে তুলেছে পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন
জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল জনতার প্রিয় মানুষ এমপি মুকুল
একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’ একুশে বইমেলায় সাংবাদিক ছোটন সাহার ‘মেঘের আঁধারে’
‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার ‘সমৃদ্ধশালী মডেল ঢালচর গড়তে চাই’ : আবদুস সালাম হাওলাদার

উপকূলকে কেন্দ্রে যুক্ত করতে পারে কমিউনিটি রেডিও
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet

পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)